শেষের কবিতা – অধ্যায় ০১
১
অমিত- চরিত
অমিত রায় ব্যারিষ্টার। ইংরেজি ছাঁদে রায় পদবী “রয়” ও “রে” রূপান-র যখন ধারণ করলে তখন তার শ্রী গেল ঘুচে কিন’ সংখ্যা হল বৃদ্ধি। এই কারণে, নামের অসামন্যতা কামনা করে অমিত এমন একটি বানান বানালে যাতে ইংরেজ বন্ধু ও বন্ধুনীদের মুখে তার উচ্চারণ দাঁড়িয়ে গেল-অমিট রায়ে।অমিত- চরিত
অমিতর বাপ ছিলেন দিগ্বিজয়ী ব্যারিষ্টার। যে পরিমাণ টাকা তিনি জমিয়ে গেছেন সেটা অধনস্ত তিন পুরুষকে অধঃপাতে দেবার পক্ষে যথেষ্ট। কিন’ পৈতৃক সম্পত্তির সাংঘাতিক সংঘাতেও অমিত বিনা বিপত্তিতে এ যাত্রা টিকে গেল।
কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বি.এ’র কোঠায় পা দেবার পূর্বেই অমিত অক্সফোর্ডে ভর্তি হয়; যেখানে পরীক্ষা দিতে দিতে এবং না দিতে দিতে ওর সাত বছর গেল কেটে। বুদ্ধি বেশি থাকাতে পড়াশুনো বেশি করে নি, অথচ বিদ্যেতে কমতি আছে বলে ঠাহর হয় না। ওর বাপ ওর কাছ থেকে অসাধারণ কিছু প্রত্যাশা করেন নি। তাঁর ইচ্ছে ছিল, তাঁর একমাত্র ছেলের মনে অক্স্ফোর্ডের রঙ এমন পাকা করে ধরে যাতে দেশে এসেও ধোপ সয়।
অমিতকে আমি পছন্দ করি। খাসা ছেলে। আমি নবীন লেখক, সংখ্যায় আমার পাঠক স্বল্প, যোগ্যতায় তাদের সকলের সেরা অমিত। আমার লেখার ঠাট-ঠমকটা ওর চোখে খুব লেগেছে। ওর বিশ্বাস, আমাদের দেশের সাহিত্যবাজারে যাদের নাম আছে তাদের স্টাইল নেই। জীবসৃষ্টিতে উট জনত্তটা যেমন, এই লেখকদের রচনাও তেমনি ঘাড়ে-গর্দানে সামনে-পিছনে পিঠে-পেটে বেখাপ, চালটা ঢিলে নড়বড়ে, বাংলা-সাহিত্যের মতো ন্যাড়া ফ্যাকাশে মরুভূমিতেই তার চলন। সমালোচকদের কাছে সময় থাকতে বলে রাখা ভালো, মতটা আমার নয়।
অমিত বলে, ফ্যাশানটা হল মুখোশ, স্টাইলটা হল মুখশ্রী। ওর মতে যারা সাহিত্যের ওমরাও দলের, যারা নিজের মন রেখে চলে, স্টাইল তাদেরই। আর যারা আমলা-দলের, দশেল মন রাখা যাদের ব্যবসা, ফ্যাশান তাদেরই। বঙ্কিমি স্টাইল লেখা “বিষবৃক্ষে” বঙ্কিম তাতে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন; বঙ্কিমি ফ্যাশান নসিরামের লেখা ‘‘মনোমোহনের মোহনবাগানে”, নসিরাম তাতে বঙ্কিমকে দিয়েছে মাটি করে। বারোয়ারি তাঁবুর কানাতের নীচে ব্যাবসাদার নাচওয়ালির দর্শন মেলে, কিন’ শুভদৃষ্টিকালে বধূর মুখ দেখবার বেলার বেনারসি ওড়নার ঘোমটা চাই। কাতান হল ফ্যাশানের, আর বেনারসি হল স্টাইলের, বিশেষের মুখ বিশেষ রঙের ছায়ায় দেখবার জন্যে। অমিত বলে, হাটের লোকের পায়ে-চলা রাস্তার বাইরে আমাদের পা সরতে ভরসা পায় না বলেই আমাদের দেশে স্টাইলের এত অনাদর। দক্ষযজ্ঞের গল্পে এই কথাটির পৌরাণিক ব্যাখ্যা মেলে। ইন্দ্র চন্দ্র বরুণ একেবারে স্বর্গের ফ্যাশানদুরস- দেবতা, যাজ্ঞিকমহলে তাঁদের নিমন্ত্রনও জুটত। শিবের ছিল স্টাইল, এত ওরিজিন্যাল যে, মন্ত্রপড়া যজমানেরা তাঁকে হব্যকব্য দেওয়াটা বেদস-র বলে জানত। অক্সফোর্ডের বি এ’র এ-সব কথা শুনতে আমার ভালো লাগে। কেননা, আমার বিশ্বাস, আমার লেখার ষ্টাইল আছে– সেইজন্যেই আমার সকল বইয়েরই এক সংস্করণেই কৈবল্যপ্রাপ্তি, তারা “ন পুনরাবর্তনে-”।
আমার শ্যালক নবকৃষ্ণ অমিতর এ-সব কথা একেবারে সইতে পারত না- বলত, “রেখে দাও তোমার অক্সফোর্ডের পাস।” সে ছিল ইংরেজি সাহিত্যে রোমহর্ষক এম,এ ; তাকে পড়তে হয়েছে বিস-র, বুঝতে হয়েছে অল্প। সেদিন সে আমাকে বললে, অমিত কেবলই ছোটো লেখককে বড়ো করে বড়ো লেখককে খাটো করবার জন্যেই। অবজ্ঞার ঢাক পিটোবার কাজে তার শখ, তোমাকে সে করেছে তার ঢাকের কাঠি।” দুঃখের বিষয়, এই আলোচনাস’লে উপসি’ত ছিলেন আমার স্ত্রী, স্বয়ং ওর সহোদরা। কিন্তু পরম সন্তোষের বিষয় এই যে, আমার শ্যালকের কথা তাঁর একটুও ভালো লাগে নি। দেখলুম, অমিতর সঙ্গেই তাঁর রুচির মিল, অথচ পড়াশুনো বেশি করেন নি। স্ত্রীলোকের আশ্চর্য স্বাভাবিক বুদ্ধি।
অনেক সময় আমার মনেও খটকা লাগে যখন দেখি, কত কত নামজাদা ইংরেজ লেখকদেকেও নগণ্য করতে অমিতর বুক দমে না। তারা হল, যাদের বলা যেতে পারে বহুবাজারে চলতি লেখক, বড়োবাজারের ছাপ-মারা; প্রশংসা করবার জন্যে যাদের লেখা পড়ে দেখবার দরকারই হয় না, চোখ বুজে গুণগান করলেই পাসমার্ক পাওয়া যায়। অমিতর পক্ষেও এদের লেখা পড়ে দেখা অনাবশ্যক, চোখ বুজে নিন্দে করতে ওর বাধে না। আসলে যারা নামজাদা তারা ওর কাছে বড়ো বেশি সরকারি বর্ধমানের ওয়েটিংরুমের মতো; আর যাদেরকে ও নিজে আবিষ্কার করেছে তাদের উপর ওর খাসদখল, যেন স্পেশাল ট্রেনের সেলুন কামরা।
অমিতর নেশাই হল স্টাইলে। কেবল সাহিত্য-বাছাই কাজে নয়, বেশে ভূষার ব্যবহারে। ওর চেহারাতেই একটা বিশেষ ছাঁদে আছে। পাঁচজনে মধ্যে ও যে-কোনো একজন মাত্র নয়, ও হল একেবারে পঞ্চম। অন্যকে বাদ দিয়ে চোখে পড়ে। দাড়িগোঁফ- কামানো চাঁচা মাজা চিকন শ্যামবর্ন পরিপুষ্ট মুখ, স্ফূর্তি ভরা ভাবটা, চোখ চঞ্চল, হাসি চঞ্চল, নড়াচড়া চলাফেরা চঞ্চল, কথার জবাব দিতে একটুও দেরি হয় না; মনটা এমন এক রকমের চকমকি যে, ঠুন করে একটু ঠুকলেই স্ফুলিঙ্গ ছিটকে পড়ে। দেশী কাপড় প্রায়ই পরে, কেননা ওর দলের লোক সেটা পরে না। ধুতি সাদা থানের যত্নে কোঁচানো, কেননা ওর বয়সে এরকম ধুতি চলতি নয়। পাঞ্জাবি পরে, তরে বাঁ কাঁধ থেকে বোতাম ডানে দিকের কোমর অবধি, আসি-নের সামনের দিকটা কনুই পর্যন- দু-ভাগ করা; কোমরে ধুতিটাকে ঘিরে একটা জরি-দেওয়া চওড়া খয়েরি রঙের ফিতে, তারাই বাঁ দিকে ঝুলছে বৃন্দাবনী ছিটের এক ছোটা থলি, তার মধ্যে ওর ট্যাঁকঘড়ি, পায়ে সাদা চামড়ার উপর লাল চামড়ার কাজ-করা কটকি জুতো। বাইরে যখন যায় একটা পাট-করা পাড়ওয়ালা মাদ্রাজি চাদর বাঁ কাঁধ থেকে হাঁটু অবধি ঝুলতে থাকে; বন্ধুমহলে যখন নিমন্ত্রন থাকে মাথায় চড়ায় এক মুসলমানি লক্ষ্মেী টুপি, সাদার উপর সাদা কাজ-করা। একে ঠিক সাজ বলব না, এ হচ্ছে ওর এক রকমের উচ্চ হাসি। ওর বিলিতি সাজের মর্ম আমি বুঝি নে, যারা বোঝে তারা বলে– কিছু আলুথালু গোছের বটে, কিন’ ইংরেজিতে যাকে বলে ডিস্টিঙ্গুইশ্ড্। নিজেকে অপরূপ করবার শখ ওর নেই। কিন’ ফ্যাশানকে বিদ্রূপ করবার কৌতুক ওর অপর্যাপ্ত। কোনামতে বয়স মিলিয়ে যারা কুষ্ঠির প্রমাণে যুবক তাদের দর্শন মেলে পথে ঘাটে; অমিতর দুর্লভ যুবকত্ব নির্জলা যৌবনের জোরেই, একেবারে বেহিসেবি, উড়নচন্ডী, বান ডেকে ছুটে চলেছে বাইরের দিকে, সমস- নিয়ে চলেছে ভাসিয়ে, হাতে কিছুই রাখে না।
এ দিকে ওর দুই বোন, যাদের ডাকনাম সিসি এবং লিসি, যেন নতুন বাজারে অত্যন- হালের আমদানি– ফ্যাশানের পসরায় আপাদমস-ক যত্নে মোড়ক করা পয়লা নম্বরের প্যাকেট-বিশেষ। উচুঁ খুরওয়ালা জুতো, লেসওয়ালা বুক-কাটা জ্যাকেটের ফাঁকে অ্যাম্বারে মেশানো মালা, শাড়িটা গায়ে তির্যগ্ভঙ্গিতে আঁট করে ল্যাপ্টানো। এরা খুট খুট করে দ্রুত লয়ে চলে; উচ্চেৎ স্বরে বলে; স-রে স-রে তোলে সূক্ষাগ্র হাসি; মুখ ঈষৎ বেঁকিয়ে স্মিতহাস্যে উঁচু কটাক্ষে চায়, জানে কাকে বলে ভাবগর্ভ চাউনি; গোলাপি রেশমের পাখা ক্ষণে ক্ষণে গালের কাছে ফুর ফুর করে সঞ্চালন করে, এবং পুরুষন্ধুর চৌকির হাতার উপরে বসে সেই পাখার আঘাতে তারে কৃত্রিম স্পর্ধার প্রতি কৃত্রিম তর্জন প্রকাশ করে থাকে।
আপন দলের মেয়েদের সঙ্গে অমিতর ব্যবহার দেখে তার দলের পুরুষদের মনে ঈর্ষার উদয় হয়। নির্বিশেষে ভাবে মেয়েদের প্রতি অমিতর ঔদাসীন নেই, বিশেষ ভাবে কারো প্রতি আসক্তিও দেখা যায় সম্বন্ধে ওর আগ্রহ নেই, উৎসাহ আছে। অমিত পার্টিতেও যায়, তাসও খেলে, ইচ্ছে করেই বাজিতে হারে, যে রমনীর গলা বেসুরা তাকে দ্বিতীয়বার গাইতে পীড়াপীড়ি করে, কাউকে বদ-রঙের কাপড় পরতে দেখলে জিজ্ঞাসা করে কাপড়টা কোন দোকানে কিনতে পাওয়া যায়। যে-কোনো আলাপিতার সঙ্গেই কথা ব‘লে বিশেষ পক্ষপাতের সুর লাগায়; অথচ সবাই জানে, পক্ষপাতটা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ। যে মানুষ অনেক দেবতার পূজারি, আড়ালে সব দেবতাকেই সে সব দেবতার চেয়ে বড়ো বলে স-ব করে; দেবতাদের বুঝতে বাকি থাকে না, অথচ খুশিও হন। কন্যার মাতাদের আশা কিছুতেই কমে না, কিন’ কন্যারা বুঝে নিয়েছে, অমিত সোনার রঙের দিগন-রেখা, ধরা দিয়েই আছে তবু কিছুতেই ধরা দেবে না। মেয়েদের সম্বন্ধে ওর মন তর্কই করে, মীমাংসা আসে না। সেইজন্যেই গম্যবিহীন আলাপের পথে ওর এত দুঃসাহস। তাই অতি সহজেই সকলের সঙ্গে ও ভাব করতে পারে, নিকটে দাহ্যবস’ থাকলেও ওর তরফে আগ্নেয়তা নিরাপদে সুরক্ষিত।
সেদিন পিকনিকে গঙ্গার ধারে যখন ও পারের ঘন কালো পুঞ্জীভূত স-ব্ধতার উপরে চাঁদ উঠল, ওর পাশে ছিল লিলি গাঙ্গুলি। তাকে ও মৃদুস-রে বললে, “গঙ্গার ও পারে ঐ নতুন চাঁদ, আর এ পারে তুমি আর আমি, এমন সমাবেশটি অনন-কালের মধ্যে কোনাদিনই আর হবে না”।
প্রথমটা লিলি গাঙ্গুলির মন এক মুহূর্তে ছল্ছলিয়ে উঠেছিল; কিন’ সে জানত, এ কথাটায় যতখানি সত্য সে কেবল ঐ বলার কায়দাটুকুর মধ্যেই। তার বেশি দাবি করতে গেলে বুদবুদের উপরকার বর্নচ্ছটাকে দাবি করা হয়। তাই নিজেকে ক্ষণকালের ঘোর-লাগা থেকে ঠেলা দিয়ে লিলি হেসে উঠল, বললে, “অমিট, তুমি যা বললে সেটা এত বেশি সত্য যে, না বললেও চলত। এই মাত্র যে ব্যাঙটা টপ করে জলে লাফিয়ে পড়ল এটাও তো অনন-কালের মধ্যে আর কোনাদিন ঘটবে না”।
অমিত হেসে উঠে বললে, “তফাত আছে, একেবারে অসীম তফাত। আজকের সন্ধ্যাবেলায় ঐ ব্যাঙের লাফানোটা একটা খাপছাড়া ছেঁড়া জিনিস। কিন’ তোমাতে আমাতে চাঁদেতে, গঙ্গার ধারায়, আকাশের তারায়, একটা সম্পূর্ণ ঐকতানিক সৃষ্টি–বেটোফেনের চন্দ্রালোক-গীতিকা। আমার মনে হয় যেন বিশ্বকর্মার কারখানায় একটা পাগলা স্বর্গীয় স্যাকরা আছে; সে যেমনি একটি নিখুঁত সুগোল সোনার চক্রে নীলার সঙ্গে হীরে এবং হীরের সঙ্গে পান্না লাগিয়ে এক প্রহরের আঙটি সম্পূর্ণ করলে আমনি দিলে সেটা সমুদ্রের জলে ফেলে, আর তাকে খুঁজে পাবে না কেউ”।
“ভালোই হল, তোমার ভাবনা রইল না, অমিট, বিশ্বকর্মার স্যাকরার বিল তোমাকে শুধতে হবে না”।
“কিন’ লিল, কোটি কোটি যুগের পর যদি দৈবাৎ তোমাতে আমাতে মঙ্গলগ্রহের লাল অরন্যের ছায়ায় তার কোনো-একটা হাজার-ক্রোশী খালের ধারে মুখোমুখি দেকা হয়, আর যদি শকুন-লার সেই জেলেটা বোয়াল মাছের পেট চিরে আজকের এই অপরূপ সোনার মূহূর্তটিকে আমাদের সামনে এনে ধরে, চমকে উঠে মুখ-চাওয়া-চাউয়ি করব, তার পরে কী হবে ভেবে দেখো”।
লিলি অমিতকে পাখার বাড়ি তাড়না করে বললে, “তার পরে সোনার মুহূর্তটি অন্যমনে খসে পড়বে সমুদ্রের জলে। আর তাকে পাওয়া যাবে না। পাগলা স্যাকরার গড়া এমন তোমার কত মূহুূর্ত খসে পড়ে গেছে, ভুলে গেছ বলে তার হিসেব নেই”।
এই বলে লিলি তাড়াতাড়ি উঠে তার সখীদের সঙ্গে গিয়ে যোগ দিলে। অনেক ঘটনার মধ্যে এই একটা ঘটনার নমুনা দেওয়া গেল।
অমিতর বোন সিসি-লিসিরা ওকে বলে, “আমি তুমি বিয়ে কর না কেন?”
অমিত বলে, “বিয়ে ব্যাপারটায় সকলের চেয়ে জরুরি হচ্ছে পাত্রী, তার নীচেই পাত্র”।
সিসি বলে, “অবাক করলে, মেয়ে এত আছে”।
অমিত বলে, “মেয়ে বিয়ে করত সেই পুরাকালে লক্ষণ মিলিয়ে। আমি চাই পাত্রী আপন পরিচয়েই যার পরিচয়, জগতে যে অদ্বিতীয়।”
সি সি বলে, “তোমার ঘরে এলেই তুমি হবে প্রথম, সে হবে দ্বিতীয়, তোমার পরিচয়েই হবে তার পরিচয়”।
অমিত বলে, “আমি মনে মনে যে মেয়ের ব্যর্থ প্রত্যাশায় ঘটকালি করি সে গরঠিকানা মেয়ে। প্রায়ই সে ঘর পর্যন- এসে পৌঁছয় না। সে আকাশ থেকে পড়ন- তারা, হৃদয়ের বায়ুমন্ডল ছুঁতে-না-ছুঁতেই জ্বলে ওঠে, বাতাসে যায় মিলিয়ে, বাস’ঘরের মাটি পর্যন- আসা ঘটেই ওঠে না।”
সিসি বলে, “অর্থাৎ সে তোমার বোনেদের মতো একটুও না”।
অমিত বলে, “অর্থাৎ, সে ঘরে এসে কেবল ঘরের লোকেরই সংখ্যা বৃদ্ধি করে না।”
লিসি বলে, “আচ্ছা ভাই সিসি, বিমি বোস তো অমির জন্যে পথ চেয়ে তাকিয়ে আছে, ইশারা করলেই ছুটে এসে পড়ে, তাকে ওর পছন্দ নয় কেন? বলে, তার কালচার নেই। কেন ভাই, সে তো এম,এ-তে বটানিতে ফারস্ট্। বিদ্যেকেই তো বলে কালচার।”
অমিত বলে, “কমল-হীরের পাথরটাকেই বলে বিদ্যে, আর ওর থেকে যে আলো ঠিকরে পড়ে তাকেই বলে কালচার। পাথরের ভার আছে, আলোর আছে দীপ্তি।”
লিসি রেগে উঠে বলে, “ইস, বিমি বোসের আদর নেই ওর কাছে! উনি নিজেই নাকি তার যোগ্য! অমি যদি বিমি বোসকে বিয়ে করতে পাগল হয়েও ওঠে আমি তাকে সাবধান করে দেব, সে যেন ওর দিকে ফিরেও না তাকায়।”
অমিত বললে, “পাগল না হলে বিমি বোসকে বিয়ে করতে চাইবই বা কেন? সে সময়ে আমার বিয়ের কথা না ভেবে উপযু্ক্ত চিকিৎসার কথা ভেবো।”
আত্নীয়স্বজন অমিতর বিয়ের আশা ছেড়েই দিয়েছে। তারা ঠিক করেছে, বিয়ের দায়িত্ব নেবার যোগ্যতা ওর নেই, তাই ও কেবল অসম্ববের স্বপ্ন দেখে আর উলটো কথা বলে মানুষকে চমক লাগিয়ে বেড়ায়। ওর মনটা আলেয়ার আলো, মাঠে বাটে ধাঁধা লাগাতেই আছে, ঘরের মধ্যে তাকে ধরে আনবার জো নেই।
ইতিমধ্যে অমিত যেখানে সেখানে হো হো করে বেড়াচ্ছে- ফিরপোর দোকানে যাক তাকে চা খাওয়াচ্ছে; যখন তখন মোটরে চড়িয়ে বন্ধুদের অনাবশ্যক ঘুরিয়ে নিয়ে আসছে; এখান ওখান থেকে যা তা কিনছে আর একে ওকে বিলিয়ে দিচ্ছে; ইংরেজি বই সদ্য কিনে এ বাড়িতে ও বাড়িতে ফেলে আসছে, আর ফিরিয়ে আনছে না।
ওর বোনেরা ওর যে অভ্যাসটা নিয়ে ভারি বিরক্ত সে হচ্ছে ওর উলটো কথা বলা। সজ্জনসভায় যা-কিছু সর্বজনের অনুমোদিত ও তার বিপরীত কিছু-একটা বলে বসবেই।
একদা কোন-একজন রাষ্ট্রতাত্ত্বিক ডিমোক্রাসির গুণ বর্ণনা করছিল; ও বলে উঠল, ‘বিষ্ণু যখন সতীর মৃতদের খন্ড খন্ড করলেন তখন দেশ জুড়ে যেখানে সেখানে তাঁর একশোর অধিক পীঠস্থান তৈরি হয়ে গেল। ডিমোক্রসি আজ যেখানে সেখানে যত টুকরো অ্যারিস্টক্রেসির পুজো বসিয়েছে- খুদে খুদে অ্যারিষ্টক্রাটে পৃথিবী ছেয়ে গেল, কেউ পলিটিক্সে, কেউ সাহিত্যে, কেউ সমাজে। তাদের কারো গাম্ভীর্য নেই, কেননা তাদের নিজের পরে বিম্বাস নেই।’
একদা মেয়েদের পরে পুরুষের আধিপত্যের অত্যাচার নিয়ে কোনো সমাজহিতৈষী অবলাবান্ধব নিন্দা করছিল পুরুষদের। অমিত মুখ থেকে সিগারেটা নামিয়ে ফস্ করে বললে, পুরুষ আধিপত্য ছেড়ে দিলেই মেয়ে আধিপত্য শুরু করবে। দুর্বলের আধিপত্য অতি ভয়ংকর।’
সভাস’ অবলা ও অন্বান্ধবেরা চটে উঠে বললে, ‘মানে কী হল’? করতে আসবে, তাই করতে গিয়েই তার হবে মরণ। তার পরে কিছুদিন যেতেই কিস্কিন্ধ্যা জেগে উঠবে, কোন হনুমান হঠাৎ লাফিয়ে পড়ে লঙ্কায় আগুন লাগিয়ে মনটাকে পূর্বস্থানে ফিরিয়ে নিয়ে আসবার ব্যবসা করবে। তখন আবার হবে টেনিসনের সঙ্গে পুনর্মিলন, বায়রনের গলা জড়িয়ে করব অশ্রুবর্ষণ, ডিকেনসকে বলব, মাপ করো, মোহ থেকে আরোগ্যলাভের জন্যে তোমাকে গাল দিয়েছি।…. মোগল বাদশাদের কাল থেকে আজ পর্যন- দেশের যত মুগ্ধ মিস্ত্রি মিলে যদি যেখানে সেখানে ভারত জুড়ে কেবলই গম্বুজওয়ালা পাথরের বুদ্বুদ্ বানিয়ে চলত তা হলে ভদ্রলোক মাত্রই যেদিন বিশ বছর বয়স পেরোত সেইদিনই বানপ্রস’ নিতে দেরি করত না। তাজমহলকে ভালো লাগাবার জন্যেই তাজমহালে নেশা ছুটিয়ে দেওয়া দরকার।
(এইখানে বলে রাখা দরকার, কথার তোড় সামলাতে না পেরে সভার রিপোর্টারের মাথা ঘুরে গিয়েছিল, সে যা রিপোর্ট লিখেছিল সেটা অমিতর বক্তৃতার চেয়েও অবোধ্য হয়ে উঠেছিল। তারই থেকে য-কটা টুকবো উদ্ধার করতে পারলম তাই আমার উপরে সাজিয়ে দিয়েছি।।
তাজমহলের পুনরাবৃত্তির প্রসঙ্গে রবি ঠাকুরের ভক্ত আরক্ত-মুখে বলে উঠল, ভালো জিনিস যত বেশি হয় ততই ভালো’।
অমিত বললে, ‘ঠিক তার উল্টো। বিধাতার রাজ্যে ভালো জিনিস অল্প হয় বলেই তা ভালো, নইলে সে নিজেরই ভিড়ের ঠেলায় হয়ে যেত মাঝারি।… যে সব কবি ষা্ট-ষত্তর পর্যন- বাঁচতে একটুও লজ্জা করে না তারা নিজেকে শাসি- দেয় নিজেকে সস্তা করে দিয়ে। শেষকালটায় অনুকরণের দল চারি দিকে ব্যুহ বেঁধে তাদেরকে মুখ ভেঙচাতে থাকে। তাদের লেখার চরিত্র বিগড়ে যায়, পূর্বের লেখা থেকে চুরি শুরু করে হয়ে পড়ে পূর্বের লেখার রিসিভর্স্ অফ স্টোল্ন্ প্রপার্টি। সে স’লে লোকহিতের খাতিরে পাঠকদের কর্তব্য হচ্ছে, কিছুতেই এই-সব অতিপ্রবীণ কবিদের বাঁচতে না দেওয়া, শারীরিক বাঁচার কথা বলছি নে, কাব্যিক বাঁচা। এদের পরমায়ু নিয়ে বেঁচে থাক্ প্রবীণ অধ্যাপক, প্রবীণ পোলিটিশন, প্রবীণ সমালোচক।’
সেদিনকার বক্তা বলে উঠল, ‘জানতে পারি কি, কাকে আপনি প্রেসিডেন্ট করতে চান? তার নাম করুন।’
অমিত ফস্ করে বললে, ‘ নিরাবণ চক্রবর্তী’।
সভার নানা চৌকি থেকে বিস্মিত রব উঠল, ‘নিবারণ চক্রবর্তী! সে লোকটা কে?’
‘আজকের দিনে এই-যে প্রশ্নের অঙ্কুর মাত্র, আগামী দিনে এর থেকে উত্তরের বনস্পতি জেগে উঠবে।’
‘ইতিমধ্যে আমরা একটা নমুনা চাই’।
‘তবে শুনুন’।
ব’লে পকেট থেকে একটা সরু লম্বা ক্যাম্বিসে -বাধা খাতা বের করে তার থেকে পড়ে গেল-
আনিলাম
অপরিচিতের নাম
ধরনীতে,
পরিচিত জনতার সরনীতে।
আমি আগনত্তক,
আমি জনগণেশের প্রচন্ড কৌতুক।
খোলো দ্বার,
বার্তা আনিয়াছি বিধাতার।
মহাকালেম্বর
অমিত বললে, ‘যে পক্ষের দখলে শিকল দিয়েই পাখিকে বাঁধে, অর্থাৎ জোর দিয়ে। শিকল নেই যার সে বাঁধে আফিম খাইয়ে, অর্থাৎ মায়া দিয়ে। শিকলওয়ালা বাঁধা বটে কিন’ ভোলায় না, আফিমওয়ালী বাঁধেও বটে ভোলায়ও। মেয়েদের কৌটো আফিমে ভরা, প্রকৃতি-শয়তানী তার জোগান দেয়।’অপরিচিতের নাম
ধরনীতে,
পরিচিত জনতার সরনীতে।
আমি আগনত্তক,
আমি জনগণেশের প্রচন্ড কৌতুক।
খোলো দ্বার,
বার্তা আনিয়াছি বিধাতার।
মহাকালেম্বর
একদিন এওদর বালিগঞ্চের এক সাহিত্যসভায় রবি ঠাকুরের কবিতা ছিল আলোচনার বিষয়। অমিতরা জীবনে এই সে প্রথম সভাপতি হতে রাজি হয়েছিল; গিয়েছিল মনে মনে যুদ্ধসাজ পরে। একজন সেকেলে গোছের অতি ভালোমানুষ ছিল বক্তা। রবি ঠাকুরের কবিতা যে কবিতাই এইটে প্রমাণ করাই তার উদ্দেশ্য। দুই-একজন কলেজের অধ্যাপক ছাড়া অধিকাংশ সভ্যই স্বীকার করলে, প্রমাণটা একরকম সনে-াষজনক।
সভাপতি উঠে বললে, ‘কবিমাত্রের উচিত পঁচিশ থেকে ত্রিশ পর্যন-। এ কথা বলব না যে পরবর্তীদের কাছ থেকে আরো ভালো কিছু চাই, বলব অন্য কিছু চাই। ফজলি আম ফুরালে বলব না, আনো ফজরিতর আম; বলব, নতুন বাজার থেকে বড়ো দেখে আতা নিয়ে এসো তো হে। ডাব-নারকেলের মেয়াদ অল্প, সে রসের মেয়াদ; ঝুনো নারকেলের মেয়াদ বেশি; সে শাঁসের মেয়াদ। কবিরা হল ক্ষণজীবী, ফিলজফরের বয়সের গাছপাথর নেই।… রবি ঠাকুরের বিরুদ্ধে সব চেয়ে বড়ো নালিশ এই যে,বুড়ো ওয়ার্ডস্বার্থের নকল করে ভদ্রলোক অতি অন্যায়রকম বেঁচে আছে। যম বাতি নিবিয়ে দেবার জন্যে থেকে থেকে ফরাশ পাঠায়, তবু লোকটা দাাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চৌকির হাতা আঁকড়িয়ে থাকে। ও যদি মানে মানে নিজেই সরে না পড়ে, আমাদের কর্তব্য ওর সভা ছেড়ে দল বেঁধে উঠে আসা। পরবর্তী যিনি আসবেন তিনিও তাল ঠুকেই গর্জাতে গর্জাতে আসবেন যে, তাঁর রাজত্বের অবসান নেই, অমরা বর্তী বাঁধা থাকবে মর্তে তাঁরই দরজায়। কিছুকাল ভক্তরা দেবে মাল্যচন্দন, খাওয়াবে পেট ভরিয়ে, সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত করবে, তার পরে আসবে তাঁকে বলি দেবার পুন্যদিন-ভক্তিবন্ধন থেকে ভক্তদের পরিত্রাণের শুভলগ্ন। আফ্রিকার চতুষ্পদ দেবতার পুজোর প্রনালী এই রকমই। দ্বিপদী ত্রিপদী চতুষ্পদী চতুর্দশপদী দেবতাদের পুজোও এই নিয়মে। পূজা জিনিসটাকে একঘেয়ে করে তোলার মতো অপবিত্র অধার্মিকতা আর- কিছু হতে পারে না। … ভালো-লাগার এভোল্যুশন আছে। পাঁচ বছর পূর্বেকার ভালো-লাগা পাঁচ বছর পরেও যদি এই জায়গায় খাড়া দাঁড়িয়ে থাকে তা হলে বুঝতে হবে, বেচারা জানতে পারে নি যে সে মরে গেছে। একটু ঠেলা মারলেই তার নিজের কাছে প্রমাণ হবে যে, সেন্টিমেন্টাল আত্মীয়েরা তার অনে-্যষ্টি- সৎকার করতে বিলম্ব করেছিল, বোধ করি উপযুক্ত উত্তরাধিকারীকে চিরকাল ফাঁকি দেবার মতলবে। রবি ঠাকুরের দলের এই অবৈধ ষড়যন্ত্র আমি পাবলিকের কাছে প্রকাশ করব বলে প্রতিজ্ঞা করেছি।’
আমাদের মণিভূষণ চশমার ঝলক লাগিয়ে প্রশ্ন করলে, ‘সাহিত্যে থেকে লয়ালটি উঠিয়ে দিতে চান?’
‘একেবারেই। এখন থেকে কবি প্রেসিডেন্টের দ্রুত-নিঃশেষিত যুগ। রবি ঠাকুর সম্বন্ধে আমার দ্বিতীয় বক্তব্য এই যে, তাঁর রচনারেখা তাঁরই হাতের অক্ষরের মতো-গোল বা তরঙ্গরেখা, গোলাপ বা নারীর মুখ বা চাঁদের ধরনে। ওটা প্রিমিটিভ; প্রকৃতির হাতের অক্ষরের মক্শো-করা। নতুন প্রেসিডেন্টের কাছে চাই কড়া লাইনের, খাড়া লাইনের রচনা-তীরের মতো, বর্শার ফলার মতো, কাঁটার মতো; ফুলের মতো নয়; বিদ্যুতের রেখার মতো, ন্যুরাল্জিয়ার ব্যথার মতো- খোঁচাওয়ালা, কোণওয়ালা, গথিক গির্জের ছাঁদে; মন্দিরের মন্ডপের ছাঁদে নয়; এমন কি, যদি চটকল পাটকল অথবা সেক্রেটারিয়েট- বিল্ডিঙের আদলে হয়, ক্ষতি নেই।… এখন থেকে ফেলে দাও মন ভোলাবার ছলাকলা ছন্দোবন্ধ, মন কেড়ে নিতে হবে যেমন রাবন সীতাকে কেড়ে নিয়ে গিয়েছিল। মন যদি কাঁদতে কাঁদতে আপত্তি করতে করতে যায় তবুও তাকে যেতেই হবে- অতিবৃদ্ধ জটায়ুটা বারণ
পাঠায়েছে দুর্লক্ষ্য অক্ষর,
বল্ দুৎসাহসী কে কে
মৃত্যু পণ রেখে
দিবি তার দুরূহ উত্তর।
শুনিবে না।
মুঢ়তার সেনা
করে পথরোধ।
ব্যর্ত ক্রোধ
হুংকারিয়া পড়ে বুকে-
তরঙ্গের নিষ্ফলতা
নিত্য যথা
মরে মাথা ঠুকে
শৈলতট-পরে
আত্মঘাতী দম্ভভরে।
পুষ্পমাল্য নাহি মোর, রিক্ত বক্ষতল,
নাহি বর্ম অঙ্গদ কুন্ডল।
শূন্য এ ললাটপটে লিখা
গুঢ় জয়টিকা।
ছিন্নকস’া দরিদ্রের বেশ।
করিব নিঃশেষ
তোমার ভান্ডার।
খোলা খোলা দ্বার।
অকস্মাৎ
বাড়ায়েছি হাত,
যা দিবার দাও অচিরাৎ!
বক্ষ তব কেঁপে ওঠে, কম্পিত অর্গল,
পৃথ্বী টলমল।
ভয়ে আর্ত উঠিছে চীৎকারি
দিগন- বিদারি-
‘ফিরে যা এখনি,
রে দুর্দান- দুরন- ভিখারি,
তোর কন্ঠধ্বনি
ঘুরি ঘুরি
নিশীথনিদ্রার বক্ষে হানে তীব্র ছুরি।’
অস্ত্র আনো।
ঝঞ্চ্র নিয়া আমার পঞ্জরে হানো।
মৃত্যুরে মারুক মৃত্যু, অক্ষয় এ প্রাণ
করি যাব দান।
শৃঙ্খল জড়াও তবে,
বাঁধো মোরে, খন্ড খন্ড হবে
মুহূর্তে চকিতে-
মুক্তি তব আমারি মুক্তিতে।
শাস্ত্র আনো।
হানো মোরে, হানো।
পন্ডিতে পন্ডিতে
ঊর্ধ্ব স্বরে চাহিবে খন্ডিতে
দিব্য বানী।
জানি জানি,
তর্কবাণ
হয়ে যাবে খান-খান।
মুক্ত হবে জীর্ণ বাক্যে আচ্ছন্ন দু চোখ,
হেরিবে আলোক।
অগ্নি জ্বালো।
আজিকার যাহা ভালো
কল্য যদি হয় তাহা কালো,
যদি তাহা ভস্ম হয়
বিশ্বময়,
ভস্ম হোক।
দুর করো শোক।
মোর অগ্নিপরীক্ষায়
ধন্য হোক বিশ্বলোক অপূর্ব দীক্ষায়।
আমার দুর্বোধ বানী
বিরুদ্ধ বুদ্ধির পরে মুষ্টি হানি
করিবে তাহারে উচ্চকিত,
আতঙ্কিত।
উন্মাদ আমার ছন্দ
দিবে ধন্দ
শানি-লুব্ধ মুমুক্ষুরে,
ভিক্ষাজীর্ণ বুভুক্ষুরে।
শিরে হস- হেনে
একে একে নিবে মেনে
ক্রোধে ক্ষোভ ভয়ে
লোকালয়ে
অপরিচিতের জয়,
অপরিচিতের পরিচয়-
যে অপরিচিত
বৈশাখের রুদ্র ঝড়ে বসুন্ধরা করে আন্দোলিত,
হানি বজ্রমুঠি
মেঘের কার্পন্য টুটি
সংগোপন বর্ষনসঞ্চয়
ছিন্ন করে, মুক্ত করে সর্বজগন্ময়।।
রবি ঠাকুরের দল সেদিন চুপ করে গেল। শাসিয়ে গেল, লিখে জবাব দেবে।বল্ দুৎসাহসী কে কে
মৃত্যু পণ রেখে
দিবি তার দুরূহ উত্তর।
শুনিবে না।
মুঢ়তার সেনা
করে পথরোধ।
ব্যর্ত ক্রোধ
হুংকারিয়া পড়ে বুকে-
তরঙ্গের নিষ্ফলতা
নিত্য যথা
মরে মাথা ঠুকে
শৈলতট-পরে
আত্মঘাতী দম্ভভরে।
পুষ্পমাল্য নাহি মোর, রিক্ত বক্ষতল,
নাহি বর্ম অঙ্গদ কুন্ডল।
শূন্য এ ললাটপটে লিখা
গুঢ় জয়টিকা।
ছিন্নকস’া দরিদ্রের বেশ।
করিব নিঃশেষ
তোমার ভান্ডার।
খোলা খোলা দ্বার।
অকস্মাৎ
বাড়ায়েছি হাত,
যা দিবার দাও অচিরাৎ!
বক্ষ তব কেঁপে ওঠে, কম্পিত অর্গল,
পৃথ্বী টলমল।
ভয়ে আর্ত উঠিছে চীৎকারি
দিগন- বিদারি-
‘ফিরে যা এখনি,
রে দুর্দান- দুরন- ভিখারি,
তোর কন্ঠধ্বনি
ঘুরি ঘুরি
নিশীথনিদ্রার বক্ষে হানে তীব্র ছুরি।’
অস্ত্র আনো।
ঝঞ্চ্র নিয়া আমার পঞ্জরে হানো।
মৃত্যুরে মারুক মৃত্যু, অক্ষয় এ প্রাণ
করি যাব দান।
শৃঙ্খল জড়াও তবে,
বাঁধো মোরে, খন্ড খন্ড হবে
মুহূর্তে চকিতে-
মুক্তি তব আমারি মুক্তিতে।
শাস্ত্র আনো।
হানো মোরে, হানো।
পন্ডিতে পন্ডিতে
ঊর্ধ্ব স্বরে চাহিবে খন্ডিতে
দিব্য বানী।
জানি জানি,
তর্কবাণ
হয়ে যাবে খান-খান।
মুক্ত হবে জীর্ণ বাক্যে আচ্ছন্ন দু চোখ,
হেরিবে আলোক।
অগ্নি জ্বালো।
আজিকার যাহা ভালো
কল্য যদি হয় তাহা কালো,
যদি তাহা ভস্ম হয়
বিশ্বময়,
ভস্ম হোক।
দুর করো শোক।
মোর অগ্নিপরীক্ষায়
ধন্য হোক বিশ্বলোক অপূর্ব দীক্ষায়।
আমার দুর্বোধ বানী
বিরুদ্ধ বুদ্ধির পরে মুষ্টি হানি
করিবে তাহারে উচ্চকিত,
আতঙ্কিত।
উন্মাদ আমার ছন্দ
দিবে ধন্দ
শানি-লুব্ধ মুমুক্ষুরে,
ভিক্ষাজীর্ণ বুভুক্ষুরে।
শিরে হস- হেনে
একে একে নিবে মেনে
ক্রোধে ক্ষোভ ভয়ে
লোকালয়ে
অপরিচিতের জয়,
অপরিচিতের পরিচয়-
যে অপরিচিত
বৈশাখের রুদ্র ঝড়ে বসুন্ধরা করে আন্দোলিত,
হানি বজ্রমুঠি
মেঘের কার্পন্য টুটি
সংগোপন বর্ষনসঞ্চয়
ছিন্ন করে, মুক্ত করে সর্বজগন্ময়।।
সভাটাকে হতবুদ্ধি করে দিয়ে মোটরে করে অমিত যখন বাড়ি আসছিল সিসি তাকে বললে,‘একখানা আন- নিবারণ চক্রবর্তী তুমি নিশ্চয় আগে থাকতে গড়ে তুলে পকেটে করে নিয়ে এসেছ, কেবলমাত্র ভালোমানুষদের বোকা বানাবার জন্যে।’
অমিত বললে, ‘অনাগতকে যে মানুষ এগিয়ে নিয়ে আসে তাকেই বলে অনাগতবিধাতা। আমি তাই। নিবারণ চক্রবর্তী আজ মর্তে এসে পড়ল, কেউ তাকে আর ঠেকাতে পারবে না।’
সিসি অমিতকে নিয়ে মনে মনে খুব একটা গর্ব বোধ করে।
সে বললে, ‘আচ্ছা অমিত, তুমি কি সকালবেলা উঠেই সেদিনকার মতো তোমার যত শানিয়ে- বলা কথা বানিয়ে রেখে যাও?’
অমিত বললে, সম্ববপরের জন্যে সব সময়ে প্রসত্তত থাকাই সভ্যতা; বর্বরতা পৃথিবীতে সকল বিষয়েই অপ্রসত্তত। এ কথাটাও আমার নোটবইয়ে লেখা আছে।’
‘কিন’ তোমার নিজের মত বলে কোনো পদার্থই নেই; যখন যেটা বেশ ভালো শোনায় সেইটেই তুমি বলে বস।’
‘আমার মনটা আয়না, নিজের বাঁধা মতগুলো নিয়েই চিরদিনের মতো যদি তাকে আগাগোড়া লেপে রেখে দিতুম তা হলে তার উপরে প্রত্যেক চলতি মূহূর্তের প্রতিবিম্ব পড়ত না।’
সিসি বললে,‘আমি, প্রতিবিম্ব নিয়েই তোমার জীবন কাটবে।’
শেষের কবিতা – অধ্যায় ০২
২
সংঘাত
অমিত বেছে বেছে শিলঙ পাহাড়ে গেল। তার কারণ, সেখানে ওর দলের লোক কেই যায় না। আরো একটা কারণ, ওখানে কণ্যাদায়ের বন্যা তেমন প্রবল নয়। অমিতর হৃদয়টার ‘পরে যে দেবতা সর্বদা শরসন্ধান করে ফেরেন তাঁর আনাগোনা ফ্যাশানেবল পাড়ায়। দেশের পাহাড়-পর্বতে যত বিলাসী বসতি আছে তার মধ্যে শিলঙে এদের মহলে তাঁর টার্গেট-প্রাকটিসের জায়গা সব চেয়ে সংকীর্ণ। বোনোর মাথা ঝাঁকানি দিয়ে বললে,‘যেতে হয় একলা যাও আমরা যাচ্ছি নে।’সংঘাত
বাঁ হাতে হাল কায়দার বেঁটে ছাতা, ডান হাতে টেনিস ব্যাট, গায়ে নকল পারসিক শালের ক্লোক পরে বোনরা গেল চলে দার্জিলিঙে। বিমি বোস আগেভাগেই সেখানে গিয়েছে। যখন ভাইকে বাদ দিয়ে বোনদের সমাগম হল তখন সে চার দিকে চেয়ে আবিষ্কার করলে, দার্জিলিঙে জনতা আছে, মানুষ নেই।
অমিত সবাইকে বলে গিয়েছিল সে শিলঙে যাচ্ছে নির্জনতা ভোগের জন্যে; দুদিন না যেতেই বুঝলে জনতা না থাকলে নির্জনতার স্বাদ মরে যায়। ক্যামেরা হাতে দৃশ্য দেখে বেড়াবার শখ অমিতর নেই। সে বলে, আমি টুরিষ্ট না; মন দিয়ে চেখে খাবার ধাত আমার, চোখ দিয়ে দিলে খাবার ধাত একেবারেই নয়।
কিছুদিন ওর কাটল পাহাড়ের ঢালুতে দেওয়ার গাছের ছায়ায় বই পড়ে পড়ে। গল্পের বই ছুলে না, কেননা, ছুটিতে গল্পের বই পড়া সাধারণের দস-র। ও পড়তে লাগল সুনীতি চাটুজ্জের বাংলা ভাষার শব্দতত্ত্ব, লেখকের সঙ্গে মতান-র ঘটবে এই একান- আশা মনে নিয়ে। এখানকার পাহাড় পর্বত অরণ্য ওর শব্দতত্ত্ব এবং আলস্যজড়তার ফাঁকে ফাঁকে হঠাৎ সুন্দর ঠেকে, কিন’ সেটা মনের মধ্যে পুরোপুরি ঘনিয়ে ওঠে না; যেন কোনো রাগিনীর একেঘেয়ে আলাপের মতো-ধুয়ো নেই, তাল নেই, সম নেই। অর্থাৎ, ওর মধ্যে বিস-র আছে, কিন’ এক নেই-তাই এলানো জিনিস ছড়িয়ে পড়ে, জমা হয় না। অমিতর আপন নিখিলের মাঝখানে একের অভাবে ও যে কেবলই চঞ্চলভাবে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ছে সে দুঃখ ওর এখানেও যেমন শহরেও তেমনি। কিন’ শহরে সেই চাঞ্চল্যটাকে সে নানাপ্রকারে ক্ষয় করে ফেলে, এখানে চাঞ্চল্যটাই সি’র হয়ে জমে জমে ওঠে-ঝর্ণা বাধা পেয়ে যেমন সরোবর হয়ে দাঁড়ায়। তাই ও যখন ভাবছে, পালাই পাহাড় বেয়ে নেমে গিয়ে পায়ে হেঁটে সিলেট-শিলচরের ভিতর দিয়ে যেখানে খুশি এমন সময়ে আষাঢ় এল পাহাড়ে পাহাড়ে বনে বনে তার সজল ঘনচ্ছায়ার চাদর লুটিয়ে। খবর পাওয়া গেল চেরাপুঞ্জির গিরিশৃঙ্গ নব-বর্ষার মেঘদলের পুঞ্জিত আক্রমণ আপন বুক দিয়ে ঠেকিয়েছে; একবার ঘন বর্ষণে গিরিনির্ঝরিনীগুলোকে ক্ষেপিয়ে কুলছাড়া করবে। সি’র করলে এই সময়টাতে কিছুদিনের জন্যে চেরাপুঞ্জির ডাকবাংলায় এমন মেঘদুত জমিয়ে তুলবে যার অলক্ষ্য অলকার নায়িকা অশরীরী বিদ্যুতের মতো,চিত্ত-আকাশে ক্ষণে ক্ষণে চমক দেয়, নাম লেখে না, ঠিকানা রেখে যায় না।
সে দিন সে পরল হাইলাগুারি মোটা কম্বলের মোজা, পুরু সুকতলাওয়ালা মজবুত চামড়ার জুতো, খাকি নর্ফোক কোর্তা হাঁটু পর্যন- হ্রস্ব অধোবাস, মাথায় সোলা-টুপি। অবনী ঠাকুরের আঁকা যক্ষের মতো দেখতে হল না, মনে হতে পারত রাস-া তদার করতে বেরিয়েছে ডিসস্ট্রিকট্ এঞ্জিনিয়ার। কিন’ পকেটে ছিল গোটা পাঁচ-সাত পাতলা এডিশনের নানা ভাষার কাব্যের বই।
আঁকাবাঁকা সরু রাস-া ডান দিকে জঙ্গল ঢাকা খদ। এ রাস-ার শেষ লক্ষ্য অমিতর বাসা। সেখানে যাত্রী-সম্ভাবনা নেই, তাই সে আওয়াজ না করে অসতর্কভাবে গাড়ি হাঁকিয়ে চলেছে। ঠিক সেই সময়টা ভাবছিল আধুনিক কালে দূরবর্তিনী প্রেয়সীর জন্যে মোটর-দুতটাই প্রশস- তার মধ্যে ধূমজ্যোতিঃসলিলমরুতাং সন্নিপাতঃ বেশ ঠিক পরিমাণেই আছে, আর চালকের হাতে একখানি ঠিঠি দিলে কিছুই অস্পষ্ট থাকে না। ও ঠিক করে নিলে, আগামী বঃসরে আষাঢ়ের প্রথম দিনেই মেঘদূতবর্ণিত রাস-া দিয়েই মোটরে করে যাত্রা করবে, হয়তো বা অদৃষ্ট ওর পথ চেয়ে দেহলীদত্তপুষ্পা যে পথিকবধূকে এতকাল বসিয়ে রেখেছে সেই অবনি-কা হোক বা মালবিকাই হোক, বা হিমালয়ের কোনো দেবদারুনচারিনীই হোক, ওকে হয়তো কোনো একটা অভাবনীয় উপলক্ষে দেখা দিতেও পারে। এমন সময়ে হঠাৎ একটা বাঁকের মুখে এসেই দেখলে, আর-একটা গাড়ি উপরে উঠে আসছে। পাশ কাটাবার জায়গা নেই। ব্রেক কষতে কষতে গিয়ে পড়ল তার উপরে- পরস্পর আঘাত লাগল, কিন’ অপঘাত ঘটল না। অন্য গাড়িটা খানিকটা গড়িয়ে পাহাড়ের গায়ে আটকে থেমে গেল।
একটি মেয়ে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল। সদ্য-মৃত্যু আশঙ্কার কালো পটখানা তার পিছনে, তারই উপরে সে যেন ফুটে উঠল একটি বিদ্যুঃরেখায় আঁকা সুস্পষ্ট ছবি- চারি দিকের সমস- হতে স্বতন্ত্র। মন্দর-পর্বতের নাড়া-খাওয় ফেনিয়ে ওঠা সমুদ্র থেকে এইমাত্র উঠে এলেন লক্ষ্মী সমস- আন্দোলনের উপরে-মাহাসাগরের বুক তখনো ফুলে ফুলে কেঁপে উঠছে। দুর্লভ অবসরে অমিত তাকে দেখলে। ড্রয়িংরুমে এ মেয়ে অন্য পাঁচজনের মাঝখানে পরিপূর্ণ আত্মস্বরূপে দেখা দিত না। পৃথিবীতে হয়তো দেখবার যোগ্য লোক পাওয়া যায়, তাকে দেখবার যোগ্য জায়গাটি পাওয়া যায় না।
মেয়েটির পরনে সরু-পাড়-দেওয়া সাদা আলোয়ানের শাড়ি, সেই আলোয়ানের শাড়ি, সেই আলোয়ানেরই জ্যাকেট, পায়ে সাদা চামড়ার দিশি ছাঁদের জুতো। তনু দীর্ঘ দেহটি, বর্ণ চিকন শ্যাম, টানা চোখ ঘন পক্ষ্মচ্ছায়ায় নিবিড় স্নিগ্ধ, প্রশস- ললাট অবারিত করে পিছু হটিয়ে চুল আঁট করে বাধা, চিবুক ঘিরে সুকুমার মুখের ডৌলটি একটি অনতিপক্ক ফলের মতো রমণীয়। জ্যাকেটের হাত কব্জি পর্যন-, দু হাতে দুটি সরু প্লেন বালা। ব্রোচের-বন্ধন-হীন কাঁধের কাপড় মাথায় উঠেছে, কট্কি কাজ করা রুপোর কাঁটা দিয়ে খোঁপার সঙ্গে বন্ধ।
অমিত গাড়িতে টুপিটা খুলে রেখে তার সা,নে চুপ করে এসে দাঁড়াল। যেন একটা পাওনা শানি-র অপেক্ষায়। তাই দেখে মেয়েটির বুঝি দয়া হল, একটু কৌতুকও বোধ করলে। অমিত মৃদুস্বরে বললে, ‘অপরাধ করেছি।’
মেয়েটি হেসে বলর, ‘‘অপরাধ নয়, ভূল। সেই ভুলের শুরু আমার থেকেই।’’
উৎসজলের যে উচ্ছলতা ফুলে ওঠে মেয়েটির কন্ঠস্বর তারই মতো নিটোল। অল্প বয়সের বালকের গলার মতো মসৃণ এবং প্রশস-। সেদিন ঘরে ফিরে এসে অমিত অনেকক্ষণ ভেবেছিল এর গলার সুরে যে একটি স্বাদ আছে, স্পর্শ আছে, তাকে বর্ণনা করা যায় কী করে। নোট্রইখানা খুলে লিখলে, এ যেন অম্বুরি তামাকের হালকা ধোঁওয়া, জলের ভিতর দিয়ে পাক খেয়ে আসছে- নিকোটিনের ঝাঁঝ নেই, আছে গোলাপজলের স্নিগ্ধ গন্ধ।’
মেয়েটি নিজের ত্রুটি ব্যাখ্যা করে বললে,‘একজন বন্ধু আসার খবর পেয়ে খুঁজতে বেরিয়েছিলুম। এই রাস-ায় খানিকটা উঠতেই শোফার বলেছিল, এ রাস-া হতে পারে না। তখন শেষ পর্যন- না গিয়ে ফেরবার উপায় ছিল না, তাই উপরে চলেছিলেম। এমন সময় উপরওয়ালার ধাক্কা খেতে হল’।
অমিত বললে, ‘উপরওয়ালার উপরেও উপরওয়ালা আছে একটা অতি কুশ্রী কুটিল গ্রহ, এ তারই কু-কীর্তি।’
অপর পক্ষের ড্রাইভার জানালে, ‘লোকসান বেশি হয় নি, কিন’ গাড়ি সেরে নিতে দেরি হবে।’
অমিত বললে, ‘আমার অপরাধী গাড়িটাকে যদি ক্ষমা করেন তবে আপনি যেখানে অনুমতি করবেন সেই খানেই পৌঁছিয়ে দিতে পারি।’
‘দরকার হবে না, পাহাড়ে হেঁটে চলা আমার অভ্যেস।’
‘দরকার আমারই, মাপ করলেন তার প্রমাণ’।
মেয়েটি ঈষৎ দ্বিধায় নীরব রইল। অমিত বললে,‘আমার তরফে আরো একটু কথা আছে। গাড়ি হাঁকাই- বিশেষ একটা মহৎ কর্ম নয়, এ গাড়ি চালিয়ে পস্টারিটি পর্যন- পৌঁছবার পথ নেই। তবু আরম্ভে এই একটিমাত্র পরিচয়ই পেয়েছেন। অথচ এমনি কপাল সেটুকুর মধ্যেও গলদ। উপসংহারে এটুকু দেখাতে দিন যে জগতে অন-ত আপনার শোফারের চেয়ে আমি অযোগ্য নই’।
অপরিচিতের সঙ্গে প্রথম পরিচয়ে অজানা বিপদের আশঙ্কায় মেয়েরা সংকোচ সরাতে চায় না। কিন’ বিপদের এক ধাক্কায় উপক্রমণিকার অনেকখানি বিস-ৃত বেড়া এক দমে গেল ভেঙে। কোন্ দৈব নির্জন পাহাড়ের হথে হঠাৎ মাঝখানে দাঁড় করিয়ে দুজনের মনে দেখাদেখির গাঁঠ ঁেবধে দিলে। সবুর করলে না। আকস্মিকের বিদ্যুৎ-আলোতে এমন করে যা চোখে পড়ল, প্রায় মাঝে মাঝে এ-যে রােত্ের জেগে উঠে অন্ধকারের পটে দেখা যাবে। চৈতন্যের মাঝখানটাতে তার গভীর ছাপ পড়ে গেল, নীল আকাশের উপরে সৃষ্টির কোন্ এক প্রচন্ড ধাক্কায় যেমন সূর্য নক্ষত্রের আগুন জ্বলা ছাপ।
মুখে কথা না বলে মেয়েটি গাড়িতে উঠে বসল। তার নির্দেশমত গাড়ি পৌঁছল যথাস’ানে। মেয়েটি গাড়ি থেকে নেমে বললে,‘কাল যদি আপনার সময় থাকে একবার এখানে আসবেন, আমাদের কর্তামার সঙ্গে আপনার আলাপ করিয়ে দেব।’
অমিতর ইচ্ছে হল বলে, ‘আমার সময়ের অভাব নেই, একনি আসতে পারি। সংকোচ বলতে পারলে না।
বাড়ি ফিরে এসে ওর নোটবই নিয়ে লিখতে লাগল,‘পথ আজ হঠাৎ এ কী পাগলামি করলে। দুজনকে দু জায়গা থেকে ছিড়ে এনে আজ থেকে হয়তো এক রাস-ায় চালান করে দিলে। অ্যাস্ট্রনমার ভুল বলেছে। অজানা আকাশ থেকে চাঁদ এসে পড়েছিল পৃথিবীর কক্ষপথে- লাগল তাদের মোটরে মোটরে ধাক্কা, সেই মরণের তাড়নার পর থেকে যুগে যুগে দুজনে এক সঙ্গেই চলেছে। এর আলো ওর মুখে পড়ে, ওর আলো এর মুখে। চলার বাঁধন আর ছেঁড়ে না। মনের ভিতরটা বলছে, আমাদের শুরু হল যুগল-চলন, আমরা চলার সূত্রে গাঁথব ক্ষণে ক্ষণে কুড়িয়ে পাওয়া উজ্জ্বল নিমেষগুলির মালা। বাঁধা মাইনের বাঁধা খোরাকিতে দ্বারে পড়ে থাকবার জো রইল না; আমাদের দেনাপাওনা সবই হবে হঠাৎ।’
বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। বারান্দায় ঘন ঘন পায়চারি করতে করতে অমিত মনে মনে বলে উঠল, ‘কোথায় আছ নিবারুণ চক্রবর্তী। এইবার ভর করো আমার পরে-বানী দাও, বাণী দাও।’
বেরোল লম্বা সরু খাতাটা, নিবারুণ চক্রবর্তী বলে গেল-
পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রনি’
আমরা দুজন চলতি হাওয়ার পন’ী।
রঙিন নিমেষ ধুলার দুলাল
পরানে ছড়ায় আবীর গুলাল,
ওড়না ওড়ায় বর্ষার মেঘে
দিগঙ্গনার নৃত্য,
হঠাৎ-আলোর ঝলকানি লেগে
ঝলমল করে চিত্ত।
নাই আমাদের কনকচাঁপার কুঞ্জ,
বনবীতিকায় কীর্ণ বকুলপুঞ্জ।
হঠাৎ কখন সন্ধেবেলায়
নামহারা ফুল গন্ধ এলায়,
প্রভাতবেলায় হেলাভরে করে
অরুণ মেঘেরে তুচ্ছ,
উদ্ধত যত শাখার শিখরে
রডোডেন্ড্রন্গুচ্ছ।
নাই আমাদের সঞ্চিত ধনরত্ন,
নাই রে ঘরের লালনললিত যত্ন।
পথপাশে পাখি পুচ্ছ নাচায়,
বন্ধন তারে করি না খাঁচায়,
ডান-মেলে-দেওয়া মুক্তিপ্রিয়ের
কুজনে দুজনে তৃপ্ত।
আমরা চকিত অভাবনীয়ের
ক্বচিৎ-কিরণে দীপ্ত।
এই খানে একবার পিছন ফেরা চাই। পশ্চাতের কথাটা সেরে নিতে পারলে গল্পটার সামনে এগোবার বাধা হবে না।আমরা দুজন চলতি হাওয়ার পন’ী।
রঙিন নিমেষ ধুলার দুলাল
পরানে ছড়ায় আবীর গুলাল,
ওড়না ওড়ায় বর্ষার মেঘে
দিগঙ্গনার নৃত্য,
হঠাৎ-আলোর ঝলকানি লেগে
ঝলমল করে চিত্ত।
নাই আমাদের কনকচাঁপার কুঞ্জ,
বনবীতিকায় কীর্ণ বকুলপুঞ্জ।
হঠাৎ কখন সন্ধেবেলায়
নামহারা ফুল গন্ধ এলায়,
প্রভাতবেলায় হেলাভরে করে
অরুণ মেঘেরে তুচ্ছ,
উদ্ধত যত শাখার শিখরে
রডোডেন্ড্রন্গুচ্ছ।
নাই আমাদের সঞ্চিত ধনরত্ন,
নাই রে ঘরের লালনললিত যত্ন।
পথপাশে পাখি পুচ্ছ নাচায়,
বন্ধন তারে করি না খাঁচায়,
ডান-মেলে-দেওয়া মুক্তিপ্রিয়ের
কুজনে দুজনে তৃপ্ত।
আমরা চকিত অভাবনীয়ের
ক্বচিৎ-কিরণে দীপ্ত।
শেষের কবিতা – অধ্যায় ০৩
৩
পূর্ব ভূমিকা
বাংলাদেশে ইংরেজি শিক্ষায় প্রথম পর্যায়ে চন্ডীমন্ডপের হাওয়ার সঙ্গে স্কুল-কলেজের হাওয়ার তাপের বৈষম্য ঘটাতে সমাজবিদ্রোহের যে ঝড় উঠেছিল সেই ঝড়ের চাঞ্চল্যে ধরা দিয়েছিলেন জ্ঞানদাশংকের। তিনি সেকালের লোক, কিন’ তাঁর তারিখটা হঠাৎ পিছলিয়ে সরে এসেছিল অনেকখানি একালে। তিনি আগাম জন্মেছিলেন। বুদ্ধিতে বাক্যে ব্যবহারে তিনি ছিলেন তাঁর বয়সের লোকদের অসমসাময়িক। সমুদ্রের ঢেউ বিলাসী পাখির মতো লোকনিন্দার ঝাপটা বুক পেতে নিতেই তাঁর আনন্দ ছিল।পূর্ব ভূমিকা
এমন-সকল পিতামহের নাতিরা যখন এইরকম তারিখের বিপর্যয় সংশোধন করতে চেষ্টা করে তখন তারা এক দৌড়ে পৌঁছয় পঞ্জিকার একেবারে উলটো দিকের টার্মিনসে। এ ক্ষেত্রেও তাই ঘটল। জ্ঞানদাশংকের নাতি বরদাশংকর বাপের মৃত্যুর পর যুগ-হিসাবে বাপ-পিতামহের প্রায় আদিম পূর্বপুরুষ হয়ে উঠলেন। মনসাকেও হাতজোড় করেন, শীতলাকেও মা বলে ঠান্ডা করতে চান। মাদুলি ধুয়ে জল খাওয় শুরু হল; সহস্র দুর্গানাম লিখতে লিখতে দিনের পূর্বাহ্ন যায় কেটে; তাঁর এলেকায় যে বৈশ্যদল নিজেদের দ্বিজত্ব প্রমাণ করতে মাথা ঝাঁকা দিয়ে উঠেছিল অন-রে বাহিরে সকল দিক থেকেই তাদের বিচলিত করা হল; হিন্দুত্বরক্ষার উপায়গুলিকে বিজ্ঞানের স্পর্শদোষ থেকে বাঁচাবার উদ্দেশ্যে ভাটপাড়ার সাহায্যে অসংখ্য প্যাম্ফ্লেট ছাপিয়ে আধুনিক বুদ্ধির কপালে বিনা মূল্যে ঋষি-বাক্য-বর্ষণ করতে কার্পণ্য করলেন না। অতি অল্পকালের মধ্যেই ক্রিয়াকর্মে জপে তপে, আসনে আচমনে, ধ্যানে স্মানে, ধূপে ধুনোয়, গোব্রাক্ষ্মণ-সেবায় শুদ্ধাচারের অচল দুর্গ নিশ্চিদ করে বানালেন। অবশেষে গোদান, স্বর্ণদান, ভূমিদান , কন্যাদায়-পিতৃদায়-মাতৃদায়-হরণ প্রভৃতির পরিবর্তে অসংখ্য ব্রাক্ষ্মণের অজস্র আশীর্বাদ বহন করে তিনি লোকান-রে যখন গেলেন তখন তাঁর সাতাশ বছর বয়স।
এঁরই পিতার পরম বন্ধু, তাঁরই সঙ্গে এক কলেজে পড়া একই হোটেলে-চপ-কাটলেট-খাওয়া রামলোচন বাঁড়-জ্জের কন্যা যোগমায়ার সঙ্গে বরদার বিবাহ হয়েছিল। ঠিক সেই সময়ে যোগমায়ার পিতৃকুলের সঙ্গে পতিকুলে ব্যবহারগত বর্ণভেদ ছিল না। এরঁ বাপের ঘরে মেয়েরা পড়াশুনো করেন, বাইরে বেরোন, এমন-কি, তাঁদের কেউ কেউ মাসিকপত্রে সচিত্র ভ্রমণবৃত্তান- লিখেছেন। সেই বাড়ির মেয়ের শুচি সংস্করণে যাতে অনুস্বার-বিসর্গের ভুলচুক না থাকে সেই চেষ্টায় লাগলেন তাঁর স্বামী। সনাতন সীমান-রক্ষানীতির অটল শাসনে যোগমায়ার গতিবিধি বিবিধ পাসপোর্টপ্রানালীর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হল। চোখের উপরে তাঁর ঘোমটা নামল, মনের উপরেও। দেবী সরস্বতী যখন কোনো অবকাশে এঁদের অন-ঃপুরে প্রবেশ করতেন তখন পাহারায় তাঁকেও কাপড়-ঝড়া দিয়ে আসতে হত। তাঁর হাতের ইংরেজি বইগুলো বাইরেই হত বাজেয়াপ্ত-প্রাক্- বঙ্কিম বাংলা সাহিত্যের পরবর্তী রচনা ধরা পড়লে চৌকাঠ পার হতে পেত না। যোগবাশিষ্ঠ রামায়ণের উৎকৃষ্ট বাঁধাই বাংলা অনুবাদ যোগমায়ার শেল্ফে অনেক কাল থেকে অপেক্ষা করে আছে। অবসরবিনোদন উপলক্ষে সেটা তিনি আলোচনা করবেন, এমন একটা আগ্রহ এ বাড়ির কর্তৃপক্ষের মনে অনি-মকাল পর্যন- ছিল। এই পৌরণিক লোহার সিন্দুকের মধ্যে নিজেকে সেফ ডিপজিটের মতো ভাঁজ করে রাখা যোগমায়ার পক্ষে সহজ ছিল না, তবু বিদ্রোহী মনকে শাসনে রেখেছিলেন। এই মানসিক অবরোধের মধ্যে তাঁর একমাত্র আশ্রয় ছিলেন দীনশরণ বেদান-রত্ন, এঁদের সভাপন্ডিত। যোগমায়ার স্বাভাবিক স্বচ্ছ বৃদ্ধি তাঁকে অত্যন- ভালো লেগেছিল। তিনি স্পষ্টই বলতেন, মা এ-সমস- ক্রিয়াকর্মের জঞ্জাল তোমার জন্যে নয়। যারা মূঢ় তারা কেবল যে নিজেদেরকে নিজেরাই ঠকায় তা নয়, পৃথিবীসুদ্ধ সমস–কিছুই তাদের ঠকাতে থাকে। তুমি কি মনে কর, আমরা এ-সমস- বিশ্বাস করি? দেখ নি কি, বিধান দেবার বেলায় আমরা প্রয়োজন বুঝে শাস্ত্রকে ব্যাকরণের প্যাঁচে উলট-পালট করতে দুঃখ বোধ করি না- তার মানে, মনের মধ্যে আমরা বাঁধন মানি নে, বাইরে আমাদের মূঢ় সাজতে হয় মূঢ়দের খাতিরে। তুমি নিজে যখন ভুলতে চাও না তখন তোমাকে ভোলাবার কাজ আমার দ্বারা হবে না। যখন ইচ্ছা করবে, মা, আমাকে ডেকে পাঠিয়ো, আমি যা সত্য বলে জানি তাই তোমাকে শাস্ত্র থেকে শুনিয়ে যাব’।
এক-একদিন তিনি এসে যোগমায়াকে কখনো গীতা কখনো ব্রাক্ষ্মভাষ্য থেকে ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে যেতেন। যোগমায়া তাঁকে এমন বুদ্ধিপূর্বক প্রশ্ন করতেন যে, বেদান-রত্নমশায় পুলকিত হয়ে উঠতেন, এঁর কাছে আলোচনায় তাঁর উৎসাহের অন- থাকত না। বরদাশংকর তাঁর চারি দিকে ছোটো বড়ো যে-সব গুরু ও গুরুতরদের জুটিয়েছিলেন তাদের প্রতি বেদান-রত্নমশায়ের বিপুল অবজ্ঞা ছিল; তিনি যোগমায়াকে বলতেন, মা, সমস- শহরে একমাত্র এই তোমার ঘরে কথা কয়ে আমি সুখ পাই। তুমি আমাকে আত্মধিক্কার থেকে বাঁচিয়েছ।’
এমনি করে কিছুকাল নিরবকাশ ব্রত-উপবাসের মধ্যে পঞ্জিকার শিকলি-বাঁধা দিনগুলো কোনোমতে কেটে গেল। জীবনটা আগাগোড়াই হয়ে উঠল আজকালকার খবরের কাগজি কিম্ভূত ভাষায় যাকে বলে বাধ্যতামূলক।
স্বামীর মৃত্যুর পরেই তার ছেলে যতিশংকর ও মেয়ে সুরমাকে নিয়ে বেরিযে পড়লেন। শীতের সময় থাকেন কলকাতায়, গরমের সময়ে কোনো-একটা পাহাড়ে। যতিশংকর এখন পড়লে কলেজে; কিন’ সুরমাকে পড়াবার মতো কোনো মেয়ে-বিদ্যালয় তাঁর পছন্দ না হওয়াতে বহু সন্ধানে তার শিক্ষার জন্যে লাবণ্যলতাকে পেয়েছেন। তারই সঙ্গে আজ সকালে আচমকা অমিতর দেখা।
শেষের কবিতা – অধ্যায় ০৪
৪
লাবণ্য-পুরাবৃত্ত
লাবণ্যের বাপ অবনীশ দত্ত এক পশ্চিমি কলেজের অধ্যক্ষ। মাতৃহীন মেয়েকে এমন করে মানুষ করেছেন যে, বহু পরীক্ষা পাসের ঘষাঘষিতেও তার বিদ্যাবুদ্ধিতে লোকসান ঘটাতে পারে নি। এমন কি, এখনো তার পাঠানুরাগ রয়েছে প্রবল।লাবণ্য-পুরাবৃত্ত
বাপের একমাত্র শখ ছিল বিদ্যায়। মেয়েটির মধ্যে তাঁর সেই শখটির সম্পূর্ণ পরিতৃপ্তি হয়েছিল। নিজের লাইব্রেরির চেয়েও তাকে ভালোবাসতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, জ্ঞানের চর্চায় যার মনটা নিরেট হয়ে ওঠে, সেখানে উড়ো ভাবনার গ্যাস নীচে থেকে ঠেলে ওঠবার মতো সমস- ফাটল মরে যায়, সে মানুষের পক্ষে বিয়ে করবার দরকার হয় না। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস যে, তাঁর মেয়ের মনে স্বামীসেবা আবাদের যোগ্য যে নরম জমিটুকু বাকি থাকতে পারত সেটা গণিতে ইতিহাসে সিমেন্ট করে গাঁথা হয়েছে- খুব মজবুত পাকা মন যাকে বলা যেতে পারে- বাইরে থেকে আঁচড় লাগলে দাগ পড়ে না। তিনি এত দূর পর্যন- ভেবে রেখেছিল যে, লাবণ্যের নাই-বা হল বিয়ে, পান্ডিত্যের সঙ্গেই চিরদিন নয় গাঁঠ-বাঁধা হয়ে থাকল।
তাঁর আর একটি স্মেহের পাত্র ছিল। তার নাম শোভনলাল। অল্প বয়সে পড়ার প্রতি এত মনোযোগ আর কারো দেখা যায় না। প্রশস- কপালে, চোখের ভাবের স্বচ্ছতায়, ঠোঁটের ভাবের সৌজন্যে, হাসির ভাবের সরলতায়, মুখের ভাবের সৌকুমার্যে তার চেহারাটি দেখবামাত্র মনকে টানে। মানুষটি নেহাত মুখচোরা, তার প্রতি একটু মনোযোগ দিলে ব্যস- হয়ে পড়ে।
গরিবের ছেলে, ছাত্রবৃত্তির সোপানে দুর্গম পরীক্ষার শিখরে শিখরে উত্তীর্ণ হয়ে চলেছে। ভবিষ্যতে শোভন যে নাম করতে পারবে, আর সেই খ্যাতি গড়ে তোলবার প্রধান কারিগরদের ফর্দে অবনীশের নামটা সকলের উপরে থাকবে, এই গর্ব অধ্যাপকের মনে ছিল। শোভন আসত তাঁর বাড়িতে পড়া নিতে, তাঁর লাইব্রেরিতে ছিল তার অবাধ সঞ্চরণ। লাবণ্যকে দেখলে সে সংকোচ নত হয়ে যেত। এই সংকোচর অতিদূরত্ববশত শোভনলালের চেয়ে নিজের মাপটাকে বড়ো করে দেখতে লাবণ্যের বাধা ছিল না। দ্বিধা করে নিজেকে যে পুরুষ যথেষ্ট জোরের সঙ্গে প্রত্যক্ষ না করায় মেয়েরা তাকে যথেষ্ট করে প্রত্যক্ষ করে না।
এমন সময় একদিন শোভনলালের বাপ ননীগোপাল অবনীশের বাড়িতে চড়াও হয়ে তাঁকে খুব একচোট গাল পেড়ে গেল। নালিশ এই যে, অবনীশ এই যে, অবনীশ নিজের ঘরে অধ্যাপনার ছুতোয় বিবাহের ছেলে ধরা ফাঁদ পেতেছেন, বৈদ্যর ছেলে শোভনলালের জাত মেরে সমাজ সংষ্কারের শখ মেটাতে চান। এই অভিযোগের প্রমাণস্বরূপে পেন্সিলে-আঁকা লাবণ্যলতার এক ছবি দাখিল করলে। ছবিটা আবিষ্কৃত হয়েছে শোভনলালের টিনের প্যাঁটরার ভিতর থেকে, গোলাপ-ফুলের পাপড়ি দিয়ে আচ্ছন্ন। ননীগোপালের সন্দেহ ছিল না, এই ছবিটা লাবণ্যেই প্রণয়ের দান। পাত্র হিসাবে শোভনলালের বাজার দর যে কত বেশি এবং আর কিছুদিন সবুর করে থাকলে সে দাম যে কত বেড়ে যাবে, ননীগোপালের হিসাবি বুদ্ধিতে সেটা কড়ায়-গন্ডায় মেলানো ছিল। এমন মূল্যবান জিনিসকে অবনীশ বিনা মূল্যে দখল করবার ফন্দি করছেন, এটাকে সিধ কেটে চুরি ছাড়া আর কী নাম দেওয়া যেতে পারে। টাকা চুরির থেকে এর লেশমাত্র তফাত কোথায়।
এতদিন লাবণ্য জানতেই পারে নি, কোনো প্রচ্ছন্ন বেদীতে শ্রদ্ধহীন লোকচক্ষুর অগোচরে তার মূর্তিপূজা প্রচলিত হয়েছে। অবনীশের লাইব্রেরির এক কোণে নানবিধ প্যাষ্ফ্লেট ম্যাগাজিন প্রভৃতি আবর্জনার মধ্যে লাবণ্যর একটি অযত্নম্লান ফোটোগ্রাফ বৈদাৎ শোভনের হাতে পড়েছিল, সেইটে নিয়ে ওর কোনো আর্টিষ্ট বন্ধুকে দিয়ে ছবি করিয়ে ফোটোগ্রাফটি আবার যথাস’ানে ফিরিয়ে রেখেছে। গোলাপ-ফুলগুলিও ওর তরুণ মনের সলজ্জ গোপন ভালোবাসাই মতো সহজে ফুটেছিল একটি বন্ধুর বাগানে, তার মধ্যে কোনো অনধিকার ঔদ্ধত্যের ইতিহাস নেই। অথচ শানি- পেতে হল। লাজুক ছেলেটি মাথা হেঁট করে, মুখ লাল কারে, মুখ লাল করে, গোপনে চোখের জল মুছে এই বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে গেল। দুর থেকে শোভনলাল তার আত্মনিবেদনের একটি শেষ পরিচয় দিলে, সেই বিবরণটা অন-র্যামী ছাড়া কেউ জানত না। বি.এ. পরীক্ষায় সে যখন পেয়েছিল প্রথম স’ান লাবণ্য পেয়েছিল তৃতীয়। সেটাতে লাবণ্যকে বড়ো বেশি আত্মলাঘবদুঃখ দিয়েছিল। তার দুটো কারণ ছিল, এক হচ্ছে শোভনের বুদ্ধির পরে অবণীশের অত্যন- শ্রদ্ধা নিয়ে লাবণ্যকে অনেক দিন আঘাত করেছে। এই শ্রদ্ধার সঙ্গে অবনীশের বিশেষ স্নেহ মিশে থাকাতে পীড়াটা আরো হয়েছিল বেশি। শোভনকে পরীক্ষার ফলে ছাড়িয়ে যাবার জন্যে সে চেষ্টা করেছিল খুব প্রাণপনেই। তবুই শোভন যখন তাকে ছাড়িয়ে গেল তখন এই স্পধার জন্যে তাকে ক্ষমা করাই শক্ত হয়ে উঠল। তার মনে কেমন একটা সন্দেহ লেগে রইল যে, বাবা তাকে বিশেষভাবে সাহায্য করাতেই উভয় পরীক্ষিতের মধ্যে ফলবৈষম্য ঘটল, অথচ পরীক্ষার পড়া-সম্বন্ধে শোভনলাল কোনোদিন অবনীশের কাছে এগোয় নি। কিছুদিন পর্যন- শোভনলালকে দেখলেই লাবণ্য মুখ ফিরিয়ে চলে যেত। এম.এ পরীক্ষাতেও শোভনের প্রতিযোগিতায় লাবণ্যর জেতবার কোনো সম্ভবনা ছিল না। তবু হল জিত। স্বয়ং অবনীশ আশ্চর্য হয়ে গেলেন। শোভনলাল যদি কবি হত তা হলে হয়তো সে খাতা ভরে কবিতা লিখত- তার বদলে আপন পরীক্ষা পাসের অনেকগুলো মোটা মার্কা লাবণ্যর উদ্দেশে উৎসর্গ হরে দিলে।
তার পরে এদের ছাত্রদশা গেল কেটে। এমন সময় অবনীশ হঠাৎ প্রচন্ড পীড়ায় নিজের মধ্যেই প্রমাণ পেলেন যে, জ্ঞানের চর্চায় মনটা ঠাস-বোঝাই থাকলেও মনসিজ তার মধ্যেই কোথা থেকে বাধা ঠেলে উঠে পড়েন, একটুও স’ানাভাব হয় না। তখন অবনীশ সাতচল্লিশ সে নিরতিশয় দুর্বল নিরুপায় বয়সে একটি বিধবা তাঁর হৃদয়ে প্রবেশ করলে, একেবারে তাঁর লাইব্রেরির গ্রন’ব্যুহ ভেদ করে তাঁর পান্ডিত্যের প্রাকার ডিঙ্গিড়ে। বিবাহে আর কোনো বাধা ছিল না, একমাত্র বাধা লাবণ্যর প্রতি অবনীশের স্নেহ। ইচ্ছার সঙ্গে বিষম লড়াই বাধল। পড়াশুনো করতে যান খুবই জোরের সঙ্গে, কিন’ তার চেয়ে জোর আছে এমন কোনো একটা চমৎকারা চিন-া পড়াশুনোর কাঁধে চেপে বসে। সমালোচনার জন্যে মর্ডান রিভিয়ু থেকে তাঁকে লোভনীয় বই পাঠানো হয় বৌদ্ধধ্বংসাবশেষের পুরাবৃত্ত নিয়ে অনুদ্ঘাটিত বইয়ের সামনে সি’র হয়ে বসে থাকেন এক ভাঙা বৌদ্ধস’ূপেরই মতো, যার উপরে চেপে আছে বহুশত বৎসরের মৌন। সম্পাদক ব্যস- হয়ে ওঠেন, কিন’ জ্ঞানীর স’পাকার জ্ঞান যখন একবার টলে তখন তার দশা এইরকমই হয়ে থাকে। হাতি যখন চোরাবালিতে পা দেয় তখন তার বাঁচবার উপায় কী।
এতদিন পরে অবনীশের মনে একটা পরিতাপ ব্যথা দিতে লাগল। তাঁর মনে হল, তিনি হয়তো পুঁথির পাতা থেকে চোখ তুলে দেখবার অবকাশ না পাওয়াতে দেখেন নি যে শোভনলালকে তার মেয়ে ভালোবেসেছে; কারণ শোভনের মতো ছেলেকে না ভালোবাসাতে পারাটাই অস্বাভাবিক। সাধারণভাবে বাপ-জাতটার পরেই রাগ ধরল-নিজের উপরে, ননীগোপালের পরে।
এমন সময়ে শোভনের কাছ থেকে এক চিঠি এল। প্রেমচাঁদ-রায়চাঁদ বৃত্তির জন্যে গুপ্তরাজবংশের ইতিহাস আশ্রয় করে পরীক্ষার প্রবন্ধ লিখবে বলে সে তাঁর লাইব্রেরি থেকে গুটিকতক বই ধার চায়। তখনি তিনি তাকে বিশেষ আদর করে চিঠি লিখলেন; বললেন, পূর্বের মতোই আমার লাইব্রেরিতে বসেই তুমি কাজ করবে, কিছুমাত্র সংকোচ করবে না।
শোভনলালের মনটা চঞ্চল হয়ে উঠল। সে ধরে নিলে এমন উৎসাহপূর্ণ চিঠির পিছনে হয়তো লাবণ্যর সম্মতি প্রচ্ছন্ন আছে। সে লাইব্রেরিতে আসতে আরম্ভ করলে। ঘরের মধ্যে যাওয়া আসার পথে দৈবাৎ কখনো ক্ষণকালের জন্যে লাবণ্যর সঙ্গে দেখা হয়। তখন শোভন গতিটাকে একটু মন্দ করে আনে। ওর একান- ইচ্ছে, লাবণ্য তাকে একটা কোনো কথা বলে, জিজ্ঞাসা করেৎ,‘কেমন আছ, যে প্রবন্ধ নিয়ে ও ব্যাপৃত সে সম্বন্ধে কিছু কৌতুহল প্রকাশ করে। যদি করত তবে খাতা খুলে এক সময় লাবণ্যর সঙ্গে আলোচনা করতে পারলে ও বেঁচে যেত। ওর কতকগুলি নিজের উদভাবিত বিশেষ মত সম্বন্ধে লাবণ্যর মত কী, জানবার জন্যে ওর অত্যন- ঔৎসুক্য। কিন’ এ পর্যন- কোনো কথাই হল না, গায়ে পড়ে কিছু বলতে পারে এমন সাহসও ওর নেই।
এমন কয়েক দিন যায়। সেদিন রবিবার। শোভনলাল তার খাতাপত্র টেবিলের উপর সাজিয়ে একখানা বই নিয়ে পাতা ওল্টাচ্ছে, মাঝে মাঝে নোট নিচ্ছে। তখন দুপুরবেলা ঘরে কেউ নেই। ছুটির দিনের সুযোগ নিয়ে অবনীশ কোন এক বাড়িতে যাচ্ছেন তার নাম করলেন না- বলে গেলেন, আজ আর চা খেতে আসবেন না।
হঠাৎ এক সময় ভেজানো দরজা জোরে খুলে গেল। শোভনলালের বুকটা ধড়াস করে উঠল কেঁপে। লাবণ্য ঘরে ঢুকল। শোভন শশব্যস- হয়ে উঠে কী করাবে ভেবে পেল না। লাবণ্য অগ্নিমূর্তি ধরে বললে,‘আপনি কেন এ বাড়িতে আসেন?’
শোভনলাল চমকে উঠল, মুখে কোনো উত্তর এল না।
‘আপনি জানেন, এখানে আসা নিয়ে আপনার বাবা কী বলেছেন? আমার অপমান ঘটাতে আপনার সংকোচ নেই?’
শোভনলাল চোখ নিচু করে বললে,‘আমাকে মাপ করবেন, আমি এখনি যাচ্ছি।’
এমন উত্তর পর্যন- দিলে না যে, লাবণ্যর পিতা তাকে স্বয়ং আমন্ত্রণ করে এনেছেন। সে তার খাতাপত্র সমস- সংগ্রহ করে নিলে। হাত থর থর করে কাঁপছে; বোবা একটা ব্যথা বুকের পাঁজরগুলোকে ঠেলা দিয়ে উঠতে চায়, রাস-া পায় না। মাথা হেঁট করে বাড়ি থেকে সে চলে গেল।
যাকে খুবই ভালোবাসা যেতে পারত তাকে ভালোবাসবার অবসর যদি কোনো একটা বাধায় ঠেসে ফসকে যায়, তখন সেটা না ভালোবাসায় দাঁড়ায় না, সেটা দাঁড়ায় একটা অন্ধ বিদ্বেষে ভালোবাসারই উলটো পিঠে। একদিন শোভনলালকে বরদান করবে বলেই বুঝি লাবণ্য নিজের অগোচরেই অপেক্ষা করে বসে ছিল। শোভনলাল তেমন করে ডাক দিলে না। তার পরে যা-কিছু হল সবই গেল তার বিরুদ্ধে। সকলের চেয়ে বেশি আঘাত দিলে এই শেষকালটায়। লাবণ্য মনের ক্ষোভে বাপের প্রতি নিতান- অন্যায় বিচার করলে। তার মনে হল, নিজে নিষকৃতি পাবেন ইচেছ করেই শোভনলালকে তিনি আবার নিজে থেকে ডেকে এনেছেন, ওদের দুজনের মিলন ঘটাবার কামনায়। তাই এমন দারুণ ক্রোধ হল সেই নিরপরাধের উপরে।
তারপর থেকে লাবণ্য ক্রমাগতই জেদ করে অবনীশের বিবাহ ঘটাল। অবনীশ তাঁর সঞ্চিত টাকার প্রায় অর্ধাংশ তাঁর মেয়ের জন্যে স্বতন্ত্র করে রেখেছিলেন। তাঁর বিবাহের পরে লাবণ্য বলে বসল, সে তার পৈতৃক সম্পত্তি কিছুই নেবে না, স্বাধীন উপার্জন করে চালাবে।অ অবনীশ মর্মাহত হয়ে বললেন, ‘আমি তো বিয়ে করতে চাই নি লাবণ্য, তুমিই তো জেদ করে বিয়ে দিইয়েছ। তবে কেন আজ আমাকে তুমি এমন করে ত্যাগ করছ।’
লাবণ্য বললে, ‘আমাদের সম্বন্ধে কোনোকালে যাতে ক্ষুন্ন না হয় সেইজন্যেই আমি এই সংকল্প করেছি। তুমি কিছু ভেবো না বাবা। যে পথে আমি যথার্থ সুখী হব সেই পথে তোমার আশীর্বাদ চিরদনি রেখো।’
কাজ তার জুটে গেল। সুরমাকে পাড়াবার সম্পূর্ণ ভার তার উপরে। যতিকেও অনায়াসে পড়াতে পারত, কিন’ মেয়ে শিক্ষয়িত্রীর কাছে পড়বার অপমান স্বীকার করতে যতি কিছুতেই রাজি হয় না।
প্রতিদিনের বাঁধা কাছে জীবন একরকম চলে যাচ্ছিল। উদ্ব্ত্ত সময়টা ঠাসা ছিল ইংরেজি সাহিত্যে, প্রাচীন কাল থেকে আরম্ভ করে হালের বার্নাড শর আমল পর্যন- এবং বিশেষভাবে গ্রীক ও রোমান যুগের ইতিহাসে- গ্রোট, গিবন ও গিলবার্ট মারের রচনায়। কোনো কোনো অবকাশে একটা চঞ্চল হাওয়া এসে মনের ভিতরটা যে একটু এলোমলো করে যেত না তা বলতে পারি নে, কিন’ হাওয়ার চেয়ে স’ূল ব্যাঘাত হঠাৎ ঢুকে পড়তে পারে ওর জীবনযাত্রার মধ্যে এমন প্রশস- ফাঁক ছিল না। এমন সময় ব্যাঘাত এসে পড়ল মোটরগাড়িতে চড়ে, পথের মাঝখানে, কোনো আওয়াজমাত্র না করে। হঠাৎ গ্রীস রোমের বিরাট ইতিহাসটা হালকা হয়ে গেল, আর সমস- কিছুকে সরিয়ে দিয়ে অত্যন- নিকটের একটা নিবিড় বর্তমান ওকে নাড়া দিয়ে বললে, জাগো। লাবণ্য এক মূহূর্তে জেগে ওঠে এতদিন পরে আপনাকে বাস-বরূপে দেখতে পেলে- জ্ঞানের মধ্যে নয়, বেদনার মধ্যে।
শেষের কবিতা – অধ্যায় ০৫
৫আলাপের আরম্ভ
অতীতের ভগ্নাবশেষ থেকে এবার ফিরে আসা যাক বর্তমানের নতুন সৃষ্টির ক্ষেত্রে। লাবণ্য পড়বার ঘরে অমিতকে বসিয়ে রেখে যোগমায়াকে খবর দিতে গেল। সে ঘরে অমিত বসল যেন পদ্মের মাঝ-খানটাকে ভ্রমরেরমতো। চারিদিকে চায়, সকল জিনিস থেকেই কিসের ছোঁওয়া লাগে, ওর মনটাকে দেয় উদাস করে। শেলফে পড়বার টেবিলে, ইংরেজি সাহিত্যের বই দেখলে; সে বইগুলো যেন বেঁচে উঠেছে। সব লাবন্যর পড়া বই, তার আঙুলে পাতা ওলটানো তার দিনরাত্রির ভাবনা-লাগা, তার উৎসুক দৃষ্টির-পথ-চলা, তার অন্যমনস্ক দিনে কোলের উপর পড়ে থাকা বই। চমকে উঠল যখন টেবিলে দেখতে পেলে ইংরেজ কবি ডান এর কাব্যসংগ্রহ। অকসফোর্ডে থাকতে ডন এবং তাঁর সময়কার কবিদের গীতিকাব্য ছিল অমিতর প্রধান আলোচ্য, এইখানে এই কাব্যের উপর দৈবাৎ দুজনের মন এক জায়গায় এসে পরস্পরকে স্পর্শ করল।
এতদিনকার নিরুৎসুক দিনরাত্রির দাগ লেগে অমিতর জীবনটা ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল, যেন মাস্টারের হাতে ইস্কুলের প্রতি বছরে পড়ানো একটা টিলে মলাটের টেকসট বুক। আগামী দিনটার জন্য কোনো কৌতুহল ছিল না, আর বর্তমান দিনটাকে পুরো মন দিয়ে অভ্যর্থনা করা ওর পক্ষে ছিল অনাবশ্যক। এখন সে এইমাত্র এসে পৌঁছল একটা নতুন গ্রহে; এখানে বস’র ভার কম; পা মাটি ছাড়িয়ে যেন উপর দিয়ে চলে; প্রতি মূহূর্ত ব্যগ্র হয়ে অভাবনীয়ের দিকে এগোতে থাকে; গায়ে হাওয়া লাগে, আর সমস- শরীরটা যেন বাঁশি হয়ে উঠতে ইচ্ছে করে, আকাশের আলো রক্তের মধ্যে প্রবেশ করে, আর ওর অন-রে অন-রে যে উত্তেজনার সঞ্চার হয় সেটা গাছের সর্বাঙ্গপ্রবাহিত রসের মধ্যে ফুল ফোটাবার উত্তেজনার মতো। মনের উপর থেকে কত দিনের ধুলো পড়া পর্দা উঠে গেল, সামান্য জিনিসের থেকে ফুটে উঠছে অসামান্যতা। তাই যোগমায়া যখন ধীরে ধীরে ঘরে এসে প্রবেশ করলেন সেই অতি সহজ ব্যাপারেও আজ অমিতকে বিষ্ময় লাগাল। সে মনে মনে বললে, আহা, এ তো আগমন নয়, এ যে আবিভাব।’
চল্লিশের কাছাকাছি তাঁর বয়স, কিন’ বয়সে তাঁকে শিথিল করে নি, কেবল তাঁকে গম্ভীর শুভ্রতা দিয়েছে। গৌরবর্ণ মুখ টসটস করছে। বৈধব্যরীতিতে চুল ছাঁটা; মাতৃভাবে পূর্ণ প্রসন্ন চোখ; হাসিটি স্নিগ্ধ। মোটা থান চাদরে মাথা বেস্টন করে সমস- দেহ সমবত। পায়ে জুতো নেই, দুটি পা নির্মল সুন্দর। অমিত তার পায়ে হাত দিয়ে যখন প্রণাম করলে ওর শিরে শিরে যেন দেবীর প্রসাদের ধারা বয়ে গেল।
প্রথম পরিচয়ের পরে যোগমায়া বললেন,‘তোমার কাকা অমরেশ ছিলেন আমাদের জেলার সব চেয়ে বড়ো উকিল। একবার এক সর্বনেশে মকদ্দমায় আমরা ফতুর হতে বসেছিলুম, তিনি আমাদের বাঁচিয়ে দিয়েছেন। আমাকে ডাকতেন বউদিদি বলে।’
অমিত বললে,‘আমি তাঁর অযোগ্য ভাইপো। কাকা লোকসান বাঁচিয়েছেন, আমি লোকসান ঘটিয়েছি। আপনি ছিলেন তাঁর লাভের বউদিদি, আমার হবেন লোকসানের মাসিমা’
যোগমায়া জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমার মা আছেন।’
অমিত বললে,‘ছিলেন। মাসি থাকাও খুব উচিত ছিল।’
‘মাসির জন্যে খেদ কেন বাবা?’
‘ভেবে দেখুন না, আজ যদি ভাঙতুম মায়ের গাড়ি বকুনির অন- থাকত না, বলতেন- এটা বাঁদরামি; গাড়িটা যদি মাসির হয় তিনি আমার অপটুতা দেখে হাসেন, মনে মনে বলেন-ছেলেমানুষি।’
যোগমায়া হেসে বললেন,‘তা হলে নাহয় গাড়িখানা মাসিরই হল।’ অমিত লাফিয়ে উঠে যোগমায়ার পায়ের ধুলো নিয়ে বললে, ‘এই জন্যেই তো পূর্বজন্মের কর্মফল মানতে হয়। মায়ের কোলে জন্মেছি, মাসির জন্যে কোনো তপস্যাই করি নি- গাড়ি ভাঙাটাকে সৎকর্ম বলা চলে না, অথচ এক নিমেষে দেবতার বরের মতো মাসি জীবনে অবতীর্ণ হলেন-এর পিছনে কত যুগের সূচনা আছে ভেবে দেখুন।’
যোগমায়া হেসে বললেন, ‘কর্মফল কার বাবা? তোমার না আমার, না যারা মোটর মেরামতের ব্যাবসা করে তাদের?
ঘন চুলের ভিতর দিয়ে পিছন দিকে আঙ্গল চালিয়ে অমিত বললে,‘শক্ত প্রশ্ন। কর্ম একার নয়, সমস- বিশ্বের, নক্ষত্র থেকে নক্ষত্রে তারই সম্মিলিত ধারা যুগে যুগে চলে এসে শুক্রবার ঠিক বেলা নটা বেজে আটচল্লিশ মিনিটের সময় লাগালে এক ধাক্কা। তার পবে?’
যোগমায়া লাবণ্যের দিকে আড়চোখে চেয়ে একটু হাসলেন। অমিতর সঙ্গে আলাপ হতে না হতেই তিনি ঠিক করে বসে আছেন, এদের দুজনের বিয়ে হওয়া চাই। সেইটের প্রতি লক্ষ করেই বললেন,‘বাবা, তোমরা দুজনে ততক্ষণ আলাপ করো, আমি এখানে তোমার খাওয়ার বন্দোবস- করে আসি গে।
দ্রুত তালে আলাপ জমাবার ক্ষমতা অমিতর। সে একেবারে শুরু করে দিলে, ‘মাসিমা আমাদের আলাপ করবার আদেশ করেছেন। আলাপের আদিতে হল নাম। প্রথমেই সেটা পাকা করে নেওয়া উচিত। আপনি আমার নাম জানেন তো? ইংরেজি ব্যাকরণে যাকে বলে প্রপার নেম।’
লাবণ্য বললে, ‘আমি তো জানি আপনার নামা অমিতবাবু।’
‘ওটা সব ক্ষেত্রে চলে না’।
লাবণ্য হেসে বললে, ‘ক্ষেত্র অনেক থাকতে পারে, কিন’ অধিকারীর নাম তো একই হওয়া চাই।’ ‘আপনি যে কথাটা বলছেন ওটা একালের নয়। দেশে কালে পাত্রে ভেদ আছে অথচ নামে নেই, ওটা অবৈজ্ঞানিক। জবষধঃরারঃু ড়ভ ঘধসবং প্রচার করে আমি নামজাদা হব সি’র করেছি। তার গোড়াতেই জানাতে চাই, আপনার মুখে আমার নাম অমিতবাবু নয়’।
‘আপনি সাহেবি কায়দা ভালোবাসেন? মিস্টার রয়?’
‘একেবারে সমুদ্রের ও পারর ওটা দূরের নাম। নামের দূরত্ব ঠিক করতে গেলে মেপে দেখতে হয় শব্দটা কানের সদর থেকে মনের অন্দরে পৌঁছতে কতক্ষন লাগে।’
‘দ্রুতগামী নামটা কী শুনি।’
‘বেগ দ্রুত করতে গেলে বস’ কমাতে হবে। অমিতবাবুর বাবুটা বাদ দিন।’
লাবণ্য বললে,‘সহজ নয়, সময় লাগবে।’
‘সময়টা সকলের সমান লাগা উচিত নয়। একঘড়ি বলে কোনো পদার্থ ত্রিভুবনে নেই, ট্যাকঘড়ি আছে, ট্যাক অনুসারে তার চাল। আইনস্টাইনের এই মত।’
লাবণ্য উঠে দাঁড়িয়ে বললে, ‘আপনার কিন’ স্মানের জল ঠান্ডা হয়ে আসছে।’
‘ঠান্ডা জল শিরোধার্য করে নেব, যদি আলাপটাকে আরো একটু সময় দেন।’
‘সময় আর নেই, কাজ আছে।’ বলেই লাবণ্য চলে গেল।
অমিত তখনই স্মান করতে গেল না। স্মিতহাস্যমিশ্রিত প্রত্যেক কথাটি লাবণ্যর ঠোঁটদুটির উপর কি রকম একটি চেহারা ধরে উঠেছিল, বসে বসে সেইটি ও মনে করতে লাগল।
অমিত অনেক সুন্দরী মেয়ে দেখেছে, তাদের সৌন্দর্য পূর্ণিমারাত্রির মতো, উজ্জ্বল অথচ আচ্ছন্ন; লাবণ্যর সৌন্দর্য সকালবেলার মতো, তাতে অস্পষ্টতার মোহ নেই, তার সমস-টা বুদ্দিতে পরিব্যপ্ত। তাকে মেয়ে করে গড়বার সময় বিধাতা তার মধ্যে পুরুষের একটা ভাগ মিশিয়ে দিয়েছেন; তাকে দেখলেই বোঝা যায়, তার মধ্যে কেবল বেদনা শক্তি নয়, সেই সঙ্গে আছে মননের শক্তি। এইটেতেই অমিতকে এত করে আকর্ষণ করেছে। অমিতর নিজের মধ্যে বুদ্ধি আছে, ক্ষমা নেই; বিচার আছে, ধৈর্য নেই; ও অনেক জেনেছে, শিখেছে, কিন’ শানি- পায় নি- লাবণ্যর মুখে ও এমন একটি শানি-র রূপ দেখেছিল যে শানি- হৃদয়ে তৃপ্তি থেকে নয়, যা ওর বিবেচনাশক্তির গভীরতায় অচঞ্চল।
শেষের কবিতা – অধ্যায় ০৬
৬নুতন পরিচয়
অমিত মিশুক মানুষ। প্রকৃতির সৌন্দর্য নিয়ে তার বেশিক্ষণ চলে না। সর্বদাই নিজে বকাঝকা করা অভ্যাস; গাছপালা পাহাড়পর্বত সঙ্গে হাসিতামাশা চলে না, তাদের সঙ্গে কোনোরকম উলটো ব্যবহার করতে গেলেই ঘা খেয়ে মরতে হয়-তারাও চলে নিয়মে, অন্যের ব্যবহারেও তারা নিয়ম প্রত্যাশা করে- এককথায়, তারা অরসিক, সেইজন্যে শহরের বাইরে ওর প্রাণ হাঁপিয়ে ওঠে।
কিন’ হঠাৎ কী হল, শিলঙ পাহাড়টা চার দিক থেকে অমিতকে নিজের মধ্যে যেন রসিয়ে নিচ্ছে। আজ সে উঠেছে সূর্য ওঠবার আগেই; এটা ওর স্বধর্মবিরুদ্ধে। জানলা দিয়ে দেখলে, দেবদারু গাছের ঝলরগুলো কাঁপছে, আর তার পিছনে পাতলা মেঘের উপর পাহাড়ের ও পার থেকে সূর্য তার তুলির লম্বা লম্বা সোনালি টান লাগিয়েছে-আগুনে-জ্বালা যে সব রঙ্গের আভা ফুটে উঠছে তার সম্বন্ধে চুপ করে থাকা ছাড়া আর-কোনো উপায় নেই।
তাড়াতাড়ি এক পেয়ালা চা খেয়ে অমিত বেরিয়ে পড়ল। রাস্তা তখন নির্জন। একটা শেওলা ধরা অতি প্রাচীন পাইন গাছের তলায় স-রে স-রে ঝরা পাতার সুগন্ধঘন আস-রণের উপর পা ছড়িয়ে বসল। সিগারেট জ্বালিয়ে দুই আঙুলে অনেকক্ষণ চেপে রেখে দিলে, টান দিতে গেল ভুলে।
যোগমায়ার বাড়ির পথে এই বন। ভোজে বসবার পূর্বে রান্নাঘরটা থেকে আগাম গন্ধ পাওয়া যায়, এই জায়গা থেকে যোগমায়ার বাড়ির সৌরভটা অমিত সেইরকম ভোগ করে। সময়টা ঘড়ির ভদ্র দাগটাতে এসে পৌঁছলেই সেখানে গিয়ে এক পেয়ালা চা দাবি করবে। প্রথমে সেখানে ওর যাবার সময় নির্দিষ্ট ছিল সন্ধেবেলায়। অমিত সাহিত্যরসিক এই খ্যাতিটার সুযোগে আলাপ-আলোচনার জন্যেও পেয়েছিল বাঁধা নিমন্ত্রণ। প্রথম দুই-চারি দিন যোগমায়া এই আলোচনায় উৎসাহ প্রকাশ করেছিলেন, কিন’ যোগমায়ার কাছে ধরা পড়ল যে, তাতে করেই এ পক্ষের উৎসাহটাকে কিছু যেন কুন্ঠিত করলে। বোঝা শক্ত নয় যে তার কারণ, দ্বিবচনের জায়গায় বহুবচন প্রয়োগ। তার পর থেকে যোগমায়ার অনুপসি’ত থাকবার উপলক্ষ ঘন ঘন ঘটত। একটু বিশ্লেষণ করতেই বোঝা গেল, সেগুলি অনিবার্য নয়, দৈবকৃত নয়,তাঁর ইচ্ছাকৃত। প্রমাণ হল, কর্তামা এই দুইটি আলোচনাপরায়ণের যে অনুরাগ লক্ষ করেছেন সেটা সাহিত্যানুরাগের চেয়ে বিশেষ একটু গাঢ়তর। অমিত বুঝে নিল যে, মাসির বয়স হয়েছে বটে, কিন’ দৃষ্টি তীক্ষ্ন, অথচ মনটি আছে কোমল। এতে করেই আলোচনাই উৎসাহ তার আরো প্রবল হল। নির্দিষ্ট কালটাকে প্রশস-তর করবার অভিপ্রায়ে যতিশংকরের সঙ্গে আপসে ব্যবস’া করলে, তাকে সকালে এক ঘন্টা এবং বিকেলে দুঘন্টা ইংরেজি সাহিত্য-পড়ায় সাহয্য করবে। শুরু করলে যাহায্য-এত বাহুল্য পরিমাণে যে, প্রায়ই সকাল গড়াত দুপুরে, সাহায্য গড়াতে বাজে কথায়, অবশেষে যোগমায়ার এবং ভদ্রতার অনুরোধে মধ্যাহ্নভোজনটা অবশ্যকর্তব্য হয়ে পড়ত। এমনি করে দেখা গেল, অবশ্যকর্তব্যতার পরিধি প্রহরে প্রহরে বেড়াই চলে।
যতিশংকের অধ্যাপনার ওর যোগ দেবার কথা সকাল আটটায়। ওর প্রকৃতিস’ অবস’ায় সেটা ছিল অসময়। ও বলত, যে জীবের গর্ভবাসের মেয়াদ দশ মাস তার ঘুমের মেয়াদ পশুপক্ষীদের মাপে সংগত হয় না। এতদিন অমিত রাত্রিবেলাটা তার সকালবেলাকার অনেকগুলো ঘন্টাকে পিলপেগাড়ি করে নিয়েছিল। ও বলত, এই চোরাই সময়টা অবৈধ বলেই ঘুমের পক্ষে সব চেয়ে অনুকূল।
কিন’ আজকাল ওর ঘুমটা আর অবিমিশ্র নয়। সকাল সকাল জাগবার একটা আগ্রহ তার অন-র্নিহিত। প্রয়োজনের আগেই ঘুম ভাঙ্গে- তার পরে পাশ ফিরে শুতে সাহস হয় না, পাছে বেলা হয়ে যায়। মাঝে মাঝে গড়ির কাঁটা এগিয়ে দিয়েছে; কিন’ সময় চুরির অপরাধ ধরা পড়বার ভয়ে সেটা বার বার করা সম্ভব হত না। আজ একবার ঘড়ির দিকে চাইলে, দেখলে, বেলা এখনো সাতটার এ পারেই। মনে হল, ঘড়ি নিশ্চয় বন্ধ। কানের কাছে নিয়ে শুনলে টিকটিক শব্দ।
এমন সময় চমকে উঠে দেখে, ডান হাতে ছাতা দোলাতে দোলাতে উপরের রাস্তা দিয়ে আসছে লাবণ্য। সাদা শাড়ি, পিঠে কালো রঙের তিনকোণা শাল, তাতে কালো ঝালর। অমিতর বুঝতে বাকি নেই যে, লাবণ্যর অর্ধেক দৃষ্টিতে সে গোচর হয়েছে, কিন’ পূর্ণদৃষ্টিতে সেটাকে মোকাবিলায় কবুল করতে লাবন্য নারাজ। বাঁকের মুখ পর্যন- লাবণ্য যেই গেছে, অমিত আর থাকতে পারলে না, দৌড়তে দৌড়তে তার পাশে উপসি’ত।
বললে,‘‘জানতেন এড়াতে পারবেন না, তবু দৌড় করিয়ে নিলেন। জানেন না কি, দূরে চলে গেলে কতটা অসুবিধা হয়।’’
‘‘কিসের অসুবিধা।’’
অমিত বললে, ‘‘যে হতভাগা পিছনে পড়ে থাকে তার প্রাণটা ঊর্ধ্বস্বরে ডাকতে চায়। কিন’ ডাকি কী বলে। দেবদেবীদের নিয়ে সুবিধে এই যে, নাম ধরে ডাকলেই তাঁরা খুশি। দুর্গা দুর্গা বলে গর্জন করতে থাকলেও ভগবতী দশভুজা অসন’ষ্ট হন না। আপনাদের নিয়ে যে মুশকিল।’’
‘‘না ডাকলেই চুকে যায়।’’
‘‘বিনা সম্বোধনেই চালাই যখন কাছে থাকেন। তাই তো বলি, দূরে যাবেন না। ডাকতে চাই অথচ ডাকতে পারি নে, এর চেয়ে দুঃখ আর নেই।’’
‘‘কেন, বিলিতি কায়দা তো আপনার অভ্যাস আছে।’’
‘‘মিস ডাট? সেটা চায়ের টেবিলে। দেখুন-না, আজ এই আকাশের সঙ্গে পৃথিবী যখন সকালের আলোয় মিলল, সেই মিলনের লগ্নটি করবার জন্যে উভয়ে মিলে একটি রূপ সৃষ্টি করলে, তারই মধ্যে রয়ে গেল স্বর্গমর্তের ডাকনাম। মনে হচ্ছে না কি, একটা নাম ধরে ডাকা উপর থেকে নীচে আসছে, নীচে থেকে উপরে উঠে চলেছে। মানুষের জীবনেও কি ঐ রকমের নাম সৃষ্টি করবার সময় উপসি’ত হয় না। কল্পনা করুন-না, যেন এখনই প্রাণ খুলে গলা ছেড়ে আপনাকে ডাক দিয়েছি, নামের ডাক বনে বনে ধ্বনিত হল, আকাশের ঐ রঙিন মেঘের কাছ পর্যন- পৌঁছল, সামনের ঐ পাহাড়টা তাই শুনে মাথায় মেঘ মুড়ি দিয়ে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল। মনে ভাবতেও কি পারেন সেই ডাকটা মিস ডাট।’’
লাবণ্য কথাটাকে এড়িয়ে বললে,‘‘নামকরণে সময় লাগে, আপাতত বেড়িয়ে আসি সে।’’
অমিত তার সঙ্গ নিয়ে বললে,‘‘চলতে শিখতেই মানুষের দেরি হয়, আমার হল উলটো। এতদিন পরে এখানে এসে তবে বসতে শিখেছি। ইংরেজিতে বলে, গড়ানে পাথরের কপালে শ্যাওলা জোটে না– সেই ভেবেই অন্ধকার থাকতে কখন থেকে পথের ধারে বসে আছি। তাই তো ভোরের আলো দেখলুম।’’
লাবণ্য কথাটাকে তাড়াতাড়ি চাপা দিয়ে জিজ্ঞাসা করলে, ‘‘ঐ সবুজ ডানাওয়ালা পাখিটার নাম জানেন?’’
অমিত বললে,‘‘জীবজগতে পাখি আছে সেটা এতদিন সাধারণভাবেই জানতুম, বিশেষভাবে জানবার সময় পাই নি। এখানে এসে, আশ্চর্য এই যে, স্পষ্ট জানতে পেরেছি, পাখি আছে, এমন-কি, তারা গানও গায়।’’
লাবণ্য হেসে উঠে বললে, ‘আশ্চর্য!’
অমিত বললে,‘হাসছেন! আমার গভীর কথাতেও গাম্ভীর্য রাখতে পারি নে। ওটা মুদ্রাদোষ। আমার জন্মলগ্নে আছে চাঁদ, ঐ গ্রহটি কৃষ্ণচতুর্দশীর সর্বনাশা রাত্রেও একটুখানি মুচকে না হেসে মরতেও জানে না।’
লাবণ্য বললে,‘আমাকে দোষ দেবেন না। বোধ হয় পাখিও যদি আপনার কথা শুনত, হেসে উঠত।’
অমিত বললে,‘দেখুন, আমার কথা লোকে হঠাৎ বুঝতে পারে না বলেই হাসে, বুঝতে পারলে চুপ করে বসে ভাবত। আজ পাখিকে নতুন করে জানছি এ কথায় লোকে হাসছে। কিন’ এর ভিতরের কথাটা হচ্ছে এই যে, আজ সমস-ই নতুন করে জানছি, নিজেকেও। এর উপরে তো হাসি চলে না। ঐ দেখুন-না, কথাটা একই, অথচ এইবার আপনি একেবারেই চুপ।’
লাবণ্য হেসে বললে, ‘আপনি তো বেশিদিনের মানুষ না, খুবই নতুন, আরো নতুনের ঝোঁক আপনার মধ্যে আসে কোথা থেকে।’
‘‘এর জবাবে খুব-একটা গম্ভীর কথাই বলতে হল যা চায়ের টেবিলে বলা চলে না। আমার মধ্যে নতুন যেটা এসেছে সেটাই অনাদিকালের পুরোনো, ভোরবেলাকার আলোর মতোই সে পুরোনো, নতুন ফোটা ভুইচাঁপা ফুলেরই মতো, চিরকালের জিনিস নতুন করে আবিষ্কার।’’
কিছু না বলে লাবণ্য হাসলে।
অমিত বললে, ‘‘আপনার এবারকার এই হাসিটি পাহারাওয়ালার চোর ধরা গোল লন্ঠনের হাসি। বুঝেছি, আপনি যে কবির ভক্ত তার বই থেকে আমার মুখের এ কথাটা আগেই পড়ে নিয়েছেন। দোহাই আপনার, আমাকে দাগি চোর ঠাওরাবেন না। এক এক সময়ে এমন অবস’া আসে, মনের ভিতরটা শংকরাচার্য হয়ে ওঠে; বলতে থাকে, আমিই লিখেছি কি আর কেউ লিখেছে এই ভেদজ্ঞানটা মায়া। এই দেখুন-না, আজ সকালে বসে হঠাৎ খেয়াল গেল, আমার জানা সাহিত্যের ভিতর থেকে এমন একটা লাইন বের করি যেটা মনে হবে এইমাত্র স্বয়ং আমি লিখলুম, আর কোনো কবির লেখবার সাধ্যই ছিল না।’’
লাবণ্য থাকতে পারলে না, প্রশ্ন করলে, ‘বের করতে পেরেছেন?’
‘‘হাঁ, পেরেছি।’’
লাবণ্যর কৌতূহল আর বাধা মানল না, জিজ্ঞাসা করে ফেললে, ‘লাইনটা কী বলুন-না।’
‘‘ ঋড়ৎ এড়ফ’ং ংধশব, যড়ষফ ুড়ঁৎ ঃড়হমঁব
ধহফ ষবঃ সব ষড়াব! ’’
লাবণ্যর বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল।
অনেকক্ষণ পরে অমিত জিজ্ঞাসা করলে,‘আপনি নিশ্চয় জানেন লাইনটা কার।’
লাবণ্য একটু মাথা বেঁকিয়ে ইশারায় জানিয়ে দিলে, হাঁ।
অমিত বললে,‘সেদিন আপনা টেবিলে ইংরেজ কবি ডনের বই আবিষ্কার করলুম, নইলে এ
লাইন আমার মাথায় আসত না।’
‘‘আবিষ্কার করলেন?’’
‘‘আবিষ্কার নয় তো কী। বইয়ের দোকানে বই চোখে পড়ে, আপনার টেবিলে বই প্রকাশ পায়। পাবলিক লাইব্রেরির টেবিল দেখেছি, সেটা তো বইগুলিকে বহন করে; আপনার টেবিল দেখলুম, সে যে বইগুলিকে বাসা দিয়েছে। সেদিন ডনের কবিতাকে প্রাণ দিয়ে দেখতে পেয়েছি। মনে হল, অন্য কবির দরজায় ঠেলাঠেলি ভিড়, বড়োলোকের শ্রাদ্ধে কাঙালি-বিদায়ের মতো। ডনের কাব্যমহল নির্জন, ওখানে দুটি মানুষ পাশাপশি বসবার জায়গাটুকু আছে। তাই অমন স্পষ্ট করে শুনতে পেলুম আমার সকালবেলাকার মনের কথাটি-
দোহাই তোদের, একটুকু চুপ কর্।
ভালোবাসিবারে দে আমাকে অবসর।
লাবণ্য বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলে,‘আপনি বাংলা কবিতা লেখেন নাকি।’
‘‘ভয় হচ্ছে, আজ থেকে লিখতে শুরু করব বা। নতুন অমিত রায় কী যে কান্ড করে বসবে, পুরোনো অমিত রায়ের তা কিছু জানা নেই। হয়তো বা সে এখনই লড়াই করতে বেরোবে।’
‘লড়াই? কার সঙ্গে।’
‘সেইটে ঠিক করতে পারছি নে। কেবলই মনে হচ্ছে, খুব মস- কিছু একটার জন্যে একখুনি চোখ বুঝে প্রাণ দিয়ে ফেলা উচিত, তার পরে অনুতাপ করতে হয় রয়ে বসে করা যাবে।’
লাবণ্য হেসে বললে,‘প্রাণ যদি দিতেই হয় তে সাবধানে দেবেন।’
‘সে কথা আমাকে বলা অনাবশ্যক। কম্যুন্যাল রায়টের মধ্যে আমি যেতে নারাজ। মুসলমার বাঁচিয়ে, ইংরেজ বাঁচিয়ে চলব। যদি দেশি বুড়োসুড়ো গোছের মানুষ, অহিংস্র মেজাজের ধার্মিক চেহারা, শিঙে বাজিয়ে মোটর হাঁকিয়ে চলেছে, তার সামনে দাঁড়িয়ে পথ আটকিয়ে বলব‘যুদ্ধং দেহি-ঐ যে লোক অজীর্ণ রোগ সারবার জন্যে হাসপাতালে না গিয়ে এমন পাহাড়ে আসে, খিদে বাড়াবার জন্যে নিলর্জ্জ হয়ে হাওয়া খেতে বেরোয়।’’
লাবণ্য হেসে বললে,‘লোকটা তবু যদি অমান্য করে চলে যায়?’
‘‘তখন আমি পিছন থেকে দু হাত আকাশে তুলে বলব, এবারকার মতো ক্ষমা করলুম, তুমি আমার ভ্রাতা, আমরা এক ভারতমাতার সন্তান।– বুঝতে পারছেন, মন যখন খুব বড়ো হয়ে ওঠে তখন মানুষ যুদ্ধও করে, ক্ষমাও করে।’
লাবণ্য হেসে বললে,‘আপনি যখন যুদ্ধের প্রস-াব করেছিলেন মনে হয় হয়েছিল, কিন’ ক্ষমার কথা যেরকম বোঝালেন তাতে আশ্বস- হলুম যে ভাবনা নেই।’
অমিত বললে,‘আমার একটা অনুরোধ রাখবেন?’
‘‘কী, বলুন।’’
‘‘আজ খিদে বাড়াবার জন্যে আর বেশি বাড়াবেন না।’’
‘‘আচ্ছা, বেশ তার পরে?’’
‘‘ঐ নীচে গাছতলায় যেখানে নানা রঙের ছ্যতলা পড়া পাথরটার নীচে দিয়ে একটুখানি জল ঝিরঝির করে বয়ে যাচ্ছে ঐখানে বসবেন আসুন।’
‘লাবন্য হাতে বাঁধা ঘড়িটাকে দিকে চেয়ে বললে,‘কিন’ সময় যে অল্প।’
‘‘জীবনে সেইটেই তো শোচনীয় সমস্যা, লাবণ্যদেবী, সময় অল্প। মরুপথে সঙ্গে আছে আধ-মশক মাত্র জল। যাতে সেটা উছলে উছলে শুকনো ধুলোয় মারা না যায় সেটা নিতান-ই করা চাই। সময় যাদের বিস-র তাদেরই পাঙ্ক্চুয়াল হওয় শোভা পায়। দেবতার হাতে সময় অসীম তাই ঠিক সময়টিতে সূর্য ওঠে, ঠিক সময়ে অস- যায়। আমাদের মেয়াদ অল্প, পাঙ্ক্চুয়াল হতে গিয়ে নষ্ট করা আমাদের পক্ষে অমিতব্যয়িতা। অমরাবতীর কেউ যদি প্রশ্ন করে‘ভবে এসে করলে কী তখন কোন লজ্জায় বলব,‘ঘড়ির কাঁটার দিকে চোখ রেখে কাজ করতে করতে জীবনের যা-কিছু সকল সময়ের অতীত তার দিকে চোখ তোলবার সময় পাই নি। তাই তো বলতে বাধ্য হলুম, চলুন ঐ জায়গাটাতে।
ওর যেটাতে আপত্তি নেই সেটাতে আর কোরো যে আপত্তি থাকতে পারে অমিত সেই আশঙ্কাটাকে একেবারে উড়িয়ে দিয়ে কথাবর্তা কয়। সেইজন্যে তার প্রস-াবে আপত্তি করা শক্ত। লাবণ্য বললে, চলুন।
ঘনবনের ছায়া। সরু পথ নেমেছে নীচে একটা খাসিয়া গ্রামের দিকে। অর্ধপথে আর একপাশে দিয়ে ক্ষীণ ঝরনার ধারা এক জায়গায় লোকালয়ের পথটাকে অস্বীকার করে তার উপর দিয়ে নিজের অধিকারচিহ্নস্বরূপ নুড়ি বিছিয়ে স্বতন্ত্র পথ চালিয়ে গেছে। সেইখানে পাথরের উপরে দুজনে বসল। ঠিক সেই জায়গায় খাদটা গভীর হয়ে খানিকটা জল জমে আছে, যেন সবুজ পর্দার ছায়ায় একটি পর্দানশীন মেয়ে, বাইরে পা বাড়াতে তার ভয়। এখানকার নির্জনতার আবরণটাই লাবণ্যকে নিবারণের মতো লজ্জা দিতে লাগল। সামান্য যা তা একটা কিছু বলে এইটেকে ঢাকা দিতে ইচ্ছে করছে, কিছুতেই কোনো কথা মনে আসছে না, স্বপ্নে যেরকম কন্ঠরোধ হয় সেই দশা।
অমিত বুঝতে পারলে, একটা কিছু বলাই চাই। বললে,‘আর্যা, আমাদের দেশে দুটো ভাষা-একটা সাধু, আর একটা চলতি। কিন’ এ ছাড়া আরো একটা ভাষা থাকা উচিত ছিল-সমাজের ভাষা নয়, ব্যবসায়ের ভাষা নয়, আড়ালের ভাষা এইরকম জায়গার জন্য। পাখির গানের মতো, কবির কাব্যের মতো সেই ভাষা অন্যায়সেই কন্ঠ দিয়ে বেরোনো উচিত ছিল, যেমন করে কান্না বেরোয়। সেজন্যে মানুষকে বইয়ের দোকানে ছুটতে হয় সেটা বড়ো লজ্জা। প্রত্যেকবার হাসির জন্যে যদি ডেন্টিস্টের দোকানে দৌড়াদৌড়ি করতে হত তা হলে কী হত ভেবে দেখুন। সত্যি বলুন লাবণ্যদেবী, এখনই আপনার সুর করে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না?’
লাবন্য মাথা হেঁট করে চুপ করে বসে রইল।
অমিত বললে,‘‘চায়ের টেবিলের ভাষায় কোনটা ভদ্র, কোনটা অভদ্র, তার হিসেব মিটতে চায় না। কিন’ এ জায়গায় ভদ্রও নেই অভদ্রও নেই। তা হলে কী উপায় বলুন। মনটাকে সহজ করবার জন্যে একটা কবিতা না আওড়ালে তো চলছে না। গদ্যে অনেক সময় নেয়, অত সময় তো হাতে নেই। যদি অনুমতি করেন তো আরম্ভ করি।’
দিতে হল অনুমতি, নইলে লজ্জা করতে গেলেই লজ্জা।
অমিত ভূমিকায় বললে, ‘রবি ঠাকুরের কবিতা বোধ হয় আপনার ভালো লাগে।’
‘‘হাঁ, লাগে।’’
‘‘আমার লাগে না। অতএব আমাকে মাঁপ করবেন। আমার একজন বিশেষ কবি আছে; তার লেখা এত ভালো যে, খুব অল্প লোকেই পড়ে। এমন কি, তাকে কেউ গাল দেবার উপযুক্ত সম্মানও দেয় না। ইচ্ছে করছি আমি তার থেকে আবৃত্তি করি।’
‘‘আপনি এত ভয় করছেন কেন।’’
‘‘এ সম্বন্ধে আমার অভিজ্ঞতা শোকাবহ। কবিবরকে নিন্দে করলে আপনাকে জাতে ঠেলেন, তাকে নিঃশব্দে পাশ কাটিয়ে বাদ দিয়ে চললে তাতে করেও কঠোর ভাষার সৃষ্টি হয়। যা আমার ভালো লাগে তাই আর-একজনের ভালো লাগে না, এই নিয়েই পৃথিবীতে যত রক্তপাত।’’
‘‘আমার কাছ থেকে রক্তপাতের ভয় করবেন না। আপন রুচির জন্যে আমি পরের রুচির সমর্থন ভিক্ষে করি না।’
‘এটা বেশ বলেছেন, তা হলে নির্ভয়ে শুরু করা যাক–
রে অচেনা, মোর মুষ্টি ছাড়াবি কী করে,
যতক্ষণ চিনি নাই তোরে?
বিষয়টা দেখছেন? না চেনার বন্ধন। সব চেয়ে কড়া বন্ধন্ না-চেনা জগতে বন্দী হয়েছি, চিনে নিয়ে তবে খালাস পাব, একেই বলে মুক্তিতত্ত্ব।
কোন্ অন্ধক্ষণে
বিজড়িত তন্দ্রা-জাগরণে
রাত্রি যবে সবে হয় ভোর,
মুখ দেখিলাম তোর।
চক্ষু’পরে চক্ষু রাখি শুধালেম, কোথা সংগোপনে
আছ আত্মবিস্মৃতির কোণে।
নিজেকেই ভুলে থাকা মতো কোনো এমন ঝাপসা কোণ আর নেই। সংসারে কত যে দেখবার ধন দেখা হল না, তারা আত্মবিস্মৃতির কোণে মিলিয়ে আছে। তাই বলে তো হাল ছেড়ে দিলে চলে না।বিজড়িত তন্দ্রা-জাগরণে
রাত্রি যবে সবে হয় ভোর,
মুখ দেখিলাম তোর।
চক্ষু’পরে চক্ষু রাখি শুধালেম, কোথা সংগোপনে
আছ আত্মবিস্মৃতির কোণে।
তোর সাথে চেনা
সহজে হবে না–
কানে কানে মৃদুকন্ঠে নয়।
করে নেব জয়
সংশয়কুন্ঠিত তোর বাণী–
দৃপ্ত বলে লব টানি
শঙ্কা হতে, লজ্জা হতে, দ্বিধা দ্বন্দ্ব হতে
নির্দয় আলোতে।
একেবারে নাছোড়বান্দা। কতবড়ো জোর। দেখেছেন রচনায় পৌরুষ।
জাগিয়া উঠিবি অশ্রুধারে,
মুহূর্তে চিনিবি আপনারে,
ছিন্ন হবে ডোর–
তোর মুক্তি দিয়ে তবে মুক্তি হবে মোর।
সহজে হবে না–
কানে কানে মৃদুকন্ঠে নয়।
করে নেব জয়
সংশয়কুন্ঠিত তোর বাণী–
দৃপ্ত বলে লব টানি
শঙ্কা হতে, লজ্জা হতে, দ্বিধা দ্বন্দ্ব হতে
নির্দয় আলোতে।
একেবারে নাছোড়বান্দা। কতবড়ো জোর। দেখেছেন রচনায় পৌরুষ।
জাগিয়া উঠিবি অশ্রুধারে,
মুহূর্তে চিনিবি আপনারে,
ছিন্ন হবে ডোর–
তোর মুক্তি দিয়ে তবে মুক্তি হবে মোর।
ঠিক এই তানটি আপনার নামাজাদা লেখকের মধ্যে পাবেন না, সূর্যমন্ডলে এ যেন আগুনের ঝড়। এ শুধু লিরিক নয়, এ নিষ্ঠুর জীবনতত্ত্ব।’’– লাবণ্যর মুখের দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে বললে–
‘‘হে অচেনা,
দিন যায়, সন্ধ্যা হয়, সময় রবে না,
তীব্র আকস্মিক
বাধা বন্ধ ছিন্ন করি দিক,
তোমারে চেনার চেনার অগ্নি দীপ্তশিখা উঠুক উজ্জ্বলি,
দিব তাহে জীবন অঞ্জলি।’’
আবৃত্তি শেষ হতে-না-হতেই অমিত লাবণ্যর হাত চেপে ধরলে। লাবণ্য হাত ছাড়িয়ে নিলে না। অমিতর মুখের দিকে চাইলে, কিছু বললে না।দিন যায়, সন্ধ্যা হয়, সময় রবে না,
তীব্র আকস্মিক
বাধা বন্ধ ছিন্ন করি দিক,
তোমারে চেনার চেনার অগ্নি দীপ্তশিখা উঠুক উজ্জ্বলি,
দিব তাহে জীবন অঞ্জলি।’’
এর পরে কোনো কথা বলবার কোনো দরকার হল না। লাবণ্য ঘড়ির দিকে চাইতেই ভূলে গেল।
শেষের কবিতা – অধ্যায় ০৭
৭ঘটকালি
অমিত যোগমায়র কাছে এসে বললে, ‘মাসিমা, ঘটকালি করতে এলেম। বিদায়ের বেলা কৃপণতা করবেন না।’
‘পছন্দ হবে তবে? আগে নাম ধাম বিবরণটা বলো।’
অমিত বললে, ‘নাম নিয়ে পাত্রটির দাম নয়।’
‘ তা হলে ঘটক-বিদায়ের হিসাব থেকে কিছু বাদ পড়বে দেখছি।
‘ অন্যায় কথা বললেন। নাম যার বড়ো তার সংসারটা ঘরে অল্প, বাইরেই বেশি। ঘরের মন-রক্ষার চেয়ে বাইরে মানরক্ষাতেই তার যত সময় যায়। মানুষটার অতি অল্প অংশই পড়ে স্ত্রীর ভাগে, পুরো বিবাহের পক্ষে সেটুকু যথেষ্ট নয়। নামজাদা মানুষের বিবাহ স্বল্প বিবাহ, বহুবিবাহরে মতোই গর্হিত।’
‘ আচ্ছ, নামটা না হয় খাটো হল, রূপটা।’
‘ বলতে ইচ্ছো করি নে, পাছে অত্যুক্তি করে বসি।’
‘ অত্যুক্তির জোরেই বুঝি বাজারে চালাতে হবে?’
‘ পাত্র-বাছাইয়ের বেলায় দুটি জিনিস লক্ষ্য করা চাই- নামের দ্বারা বর যেন ঘরকে ছাড়িয়ে না যায়, আর রূপের দ্বারা কনেকে।’
‘ আচ্ছা।, নামরূপ থাক বাকিটা?’
‘ বাকি যেটা রইল সব জড়িয়ে সেটাকে বলে পদার্থ। তা, লোকটা অপদার্থ নয়।’
‘ বুদ্ধি?’
‘ লোকে যাতে ওকে বুদ্ধিমান বলে হঠাৎ ভ্রম করে সেটুকু বুদ্ধি ওর আছে।’
‘ বিদ্যে?’
‘ স্বয়ং নিউটনের মতো। ও জানে যে, জ্ঞান সমুদ্রের কুলে সে নুড়ি কুড়িয়েছে মাত্র। তাঁর মতো সাহস করে বলতে পারে না, পাছে লোকে ফস করে বিশ্বাস করে বসে।’
‘ পাত্রের যোগ্যতার ফর্দটা তো দেখছি কিছু খাটো গোছের।’
‘ অন্নপূর্ণার পূর্ণতা প্রকাশ করতে হবে বলেই শিব নিজেকে ভিখারি কবুল করেন, একটুও লজ্জা নেই।’
‘তা হলে পরিচয়টা আরো একটু স্পষ্ট করো।’
‘জানা ঘর। পাত্রটির নাম অমিত কুমার রায। হাসছেন কেন মাসিমা? ভাবছেন কথাটা ঠাট্টা?’
‘ সে ভয় মনে আছে বাবা, পাছে শেষ পর্যন- ঠাট্টাই হবে ওঠে।’
‘ এস সন্দেহটা পাত্রের পরে দোষারোপ।’
‘ বাবা সংসারটাকে হেসে হালকা করে রাখা কম ক্ষমতা নয়।’
‘মাসি, দেবতাদের সেই ক্ষমতা আছে, তাই দেবতারা বিবাহের অযোগ; দয়মন-ী সে কথা বুঝেছিলেন।’
‘ আমার লাবণ্যকে সত্যি কি তোমার পছন্দ হয়েছে?’
‘ কিরকম পরীক্ষা চান বলুন।’
‘একমাত্র পরীক্ষা হচ্ছে, লাবণ্য যে তোমার হাতেই আছে, এইটি তোমার নিশ্চিত জানা।’
‘ কথাটাকে আর একটু ব্যাখ্যা করুন।’
‘ যে রত্নকে সস-ায় পাওয়া গেল তারও আসল মুল্য যে বোঝে সেই জানব জহুরি।’
‘ মাসিমা, কথাটাকে বড়ো বেশি সুক্ষ্ম করে তুলছেন। মনে হচ্ছে, যেন একটা ছোটো গল্পের সাইকোলজিতে শান লাগিয়ে ছেন কিন’ কথাটা আসলে মোটা, জাগতিক নিয়মে এক ভদ্রলোক এক ভদ্ররমনীকে বিয়ে করবার জন্যে খেপেছে। দোষে গুনে ছেলেটি চলনসই, মেয়েটির কথা বলা বাহুল্য। এমন অবস’ায় সাধারন মাসিমার দাল স্বাভাবের নিয়মেই খুমি হয়ে কথনি ঠেকিতে আনন্দনাড়- কুটতে শুরু করেন।’
‘ ভয় নেই বাবা, ঢেঁকিতে পা পড়েছে। ধরই নাও লাবন্যকে তুমি পেয়েইছ। তার পরেও হাতে পেয়েও যদি তোমার বাবার ইচ্ছে প্রবল থেকেই যায় তবেই বুঝব, লাবণ্যর মতো মেয়েকে বিয়ে করবার তুমি যোগ্য।’
‘আমি যে এ-হেন আধুনিক, আমাকে সুদ্ধ তাক লাগিয়ে দিলেন।’
‘আধুনিকের লক্ষণটা কী দেখলে?
‘ দেখছি বিংশ শতাব্দীর মাসিমারা বিয়ে দিতেও ভয় পান।’
‘ তার কারণ, আগেকার শতাব্দীর মাসিমারা যাদের বিয়ে দিতেন তারা ছিল খেলার পুতুল। এখন যারা বিয়ের উমেদার, মাসিমাদের খেলার শখ মেটাবার দিকে তাদের মন নেই।’
‘ভয় নেই আপনার। পেয়ে পাওয়া ফুরোয় না বরঞ্চ চাওয়া বেড়েই ওঠে, লাবণ্যকে বিয়ে করে এই তত্ত্ব প্রমাণ করবে বলেই অমিত রায় মর্তে অবতীর্ন। নইলে, আমার মোটরগাড়িটা অচেতন পদার্থ হয়েও অস’ানে অসমেয় এমন অদ্ভুত অঘটন ঘটিয়ে বসবে কেন?’
‘বাবা, বিবাহযোগ্য বয়সের সুর এখনো তোমার কথাবার্তায় লাগছে না, শেষে সমস-টা বাল্যবিবাহ হয়ে না দাঁড়ায়।’
‘ মাসিমা, আমার মনের স্বীকার একটা স্পেসিফিক গ্রাভিটি আছ, তারই গুণে আমার হৃদয়ের ভারী কথাগুলোও মুখে খুব হালকা হয়ে ভেসে ওঠে, তাই বলে তার ওজন কমে না।’
যোগমায়া গেলেন ভোজের ব্যবস’া করতে। অমিত এ ঘরে ও ঘরে ধুরে বেড়ালে, দর্শনীয় কাউকে দেখতে পেলে না। দেখা হল যতিশংকরের সঙ্গে। মনে পড়ল আজ তাকে ‘ অ্যান্টনি ক্লিয়োপ্যাট্রা’ পড়াবার কথা। অমিতর মুখের ভাব দেখেই যতি বুঝেছিল, জীবের প্রতি দয়া করেই আজ তার ছুটি নেওয়া আশু কর্তব্য। সে বললে, ‘ অমিতদা, কিছু যদি মনে না কর আজ আমি ছুটি চাই, আপার শিলঙে বেড়াতে যাব।’
অমিত পুলকিত হয়ে বললে, ‘ পড়ার সময় যারা ছুটি নিতে জানে না তারা পড়ে, পড়া হজম করে না। তুমি ছুটি চাইলে আমি কিছু মনে করব এমন অসম্ভব ভয় করছ কেন?
‘কাল রবিবার ছুটি তো আছেই, পাছে তুমি তাই ভাব।’
‘ ইস্কুল- মাস্টারি বুদ্ধি আমার নয় ভাই, বরাদ্দ ছুটিকে ছুটি বলিই নে। যে ছুটি নিয়মিত, তাকে ভোগ করা আর বাঁধা পশুকে শিকার করা একই কথা। ওতে ছুটির রস ফিকে হয়ে যায়।’
হাঠাৎ যে উৎসাহে অমিতকুমার ছুটিতত্ত্ব ব্যাখ্যায় মেতে উঠল তার মুল কারনটা অনুমান করে যতির খুব মজা লাগল। সে বললে, ‘কয়দিন থেকে ছুটিতত্ত্ব তোমার মাথায় নতুন নতুন ভাব উঠছে। সেদনিও আমাকে উপদেশ দিয়েছিলে। এমন আর কিছুদিন চললেই ছুটি নিতে আমার হাত পেকে যাবে।’
‘ সেদিন কী উপদেশ দিয়েছিলুম।’
‘ বলেছিলে, অকর্তব্যবুদ্ধি মানুষের একটা মহদগুণ, তার ডাক পড়লেই একটুও বিলম্ব করা উচিত হয় না। বলেই বই বন্ধ করে তখনি বাইরে দিলে ছুট। বাইরে হয়তো একটা অকর্তব্যের কোথাও আবির্ভাব হয়েছিল, লক্ষ্য করি নি।
যতির বয়স বিশের কোঠায়। অমিতর মনে যে চাঞ্চল্য উঠেছে ওর নিজের মনেও তার আন্দোলনটা এসে লাগছে। ও লাবণ্যকে এতদিন। শিক্ষক জাতীয় বলেই টাউরেছিল, আজ অমিতর অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝতে পেরেছে, সে নারীজাতীয়।
অমিত হেসে বললে, ‘ কাজ উপসি’ত হলেই প্রস’ত হওয়া চাই, এই উপদেশেল বাজার দর বেশি, আকব্বরি মোহরের মতো; কিন’ ওর উলটো পিঠে খোদাই থাকা উচিত অকাজ উপসি’ত হলেই সেটাকে বীরের মতো মেনে নেওয়া চাই।’
‘তোমার বীরত্বের পরিচয় আজকাল প্রায়ই পাওয়া যাচ্ছে।’
যতির পিঠ চাপড়িয়ে অমিত বললে, ‘জরুরী কাজটাকে এক কোপে বলি দেবার পবিত্র অষ্টমী তিথি তোমার জীবন-পঞ্জিকায় একদিন যখন আসবে দেবীপূজায় বিলম্ব কোরো না ভাই-তার পরে বিজয়াদশমী আসতে দেরি হয় না।’
যতি গেল চলে, অকর্তব্যবুদ্ধিও সজাগ, যাকে আশ্রয় করে অকাজ দেখা দেয় তারও দেখা নেই। অমিত ঘর ছেড়ে গেল বাইরে।
ফুলে আছন্ন গোলাপের লতা; এক ধারে সুর্যমুখীর ভিড়, আর-এক ধারে চৌকো কাঠের টবে চন্দ্রমল্লিকা। ঢালু ঘাসের খেতের উত্তর প্রানে- এক মস- য়ুক্যালিপটাস গাছ। তারই গুড়িতে হেলান দিয়ে সামনে পা ছড়িয়ে বসে আছে লাবণ্য। ছাই রঙের আলোয়ান গায়ে, পায়ের উপর পড়েছে সকালবেলাকার রোদদুর। কোলে রুমালের উপর কিছু রুটির টুকরো কিছু ভাঙা আখরোট। আজ সকালটা জীবসেবায় কাটাবে ঠাউরেছিল, তাও গেছে ভুলে। অমিত কাচে এসে দাঁড়াল, লাবণ্য মাতা তুলে তার মুখের দিকে চেয়ে চুপ করে রইল, মৃদু হাসিতে মুখ গেল ছেয়ে। অমিত সামনাসামনি বসে বললে, ‘সুখবর আছে মাসিমার মত পেয়েছি।’
লাবণ্য তার কোনো উত্তর না করে অদুরে একটা নিষ্ফলা পিচগাছের দিকে একটা ভাঙা আখরোট ফেলে দিলে। দেখতে দেখতে তার গুড়ি বেয়ে একটা কাঠবিড়ালী নেমে এল। এই জীবটি লাবণ্যর মুক্তিভিখারি দলের একজন।
অমিত বললে, ‘যদি আপত্তি না কর, তোমার নামটা একটু ছেঁটে দেব।’
‘ তা দাও।’
‘ তোমাকে ডাকব বন্য বলে।’
‘বন্য।’
‘ না না এ নামটাতে হয়তো বা তোমার বদনাম হল। এ রকম নাম আমাকেই সাজে। তোমাকে ডাকব- বন্যা। কী বল?
‘ তাই ডেকো, কিন’ তোমার মাসিমার কাছে নয়।’
‘ কিছুতেই নয়। এ-সব নাম বীজমন্ত্রের মতো, কারো কাছে ফাঁস করতে নেই। এ রইল আমার মুখে আর তোমার কানে।’
‘আচ্ছা বেশ।’
‘ আমারও ঐ রকমের একটা বেসরকারি নাম চাই তো। ভাবছি, ব্রহ্মপুত্র কেমন হয়! বন্যা হঠাৎ এল তারই কুল ভাসিয়ে দিয়ে।’
‘নামটা সর্বদা ডাকবার পক্ষে ওজনে ভারী।’
‘ঠিক বলেছ। কুলি ডাকতে হবে ডাকবার জন্যে। তুমিই তা হলে নামটা দাও। সেটা হবে তোমারই সৃষ্টি।’
‘আচ্ছা, আমি দেব তোমার নাম ছেঁটে। তোমাকে বলব-মিতা।’
‘ চমৎকার। পদাবলীতে ওরই একটি দোসর আছে-বঁধু। বন্যা, মনে ভাবছি, ঐ নামে না হয় আমাকে সবার সামনেই ডাকলে, তাতে দোষ কী?
‘ ভয় হয়, এক কানের ধন পাঁচ কানে পাছে সস-া হয়ে যায়।’
‘ সে কথা মিছে নয়। দুইয়ের কানে যেটা এক, পাঁচের কানে সেটা ভগ্নাংশ বন্যা।’
‘ কী মিতা।’
‘ তোমার নামে যদি কবিতা লিখি তো কোন্ মিলটা লাগাবে জান?- অন্যান্য।’
‘ তাকে কী বোঝাবে?
‘ বোঝাবে তুমি যা তুমি তাই, তুমি আর-কিছুই নও।’
‘সেটা বিশেষ আশ্চর্যের কথা নয়।’
‘ বল কী, খুবই আম্চর্যের কথা । দৈবাৎ এক একজন মানুষকে দেখতে পাওয়া যায় যাকে দেখেই চমকে বলে উঠি, এ মানুষটি একেবারে নিজের মতো; পাঁচজনের মতো নয়। সেই কথাটি আমি কবিতায় বলব-
হে মোর বন্যা, তুমি অনন্যা,
আপন স্বরূপে আপনি ধণ্যা।’
‘ তুমি কবিতা লিখবে নাকি?’
‘ নিশ্চয়ই লিখব। কার সাধ্য রোধে তার গতি?’
‘ এমন মরিয়া হয়ে উঠলে কেন?’
‘কারণ বলি। কাল রাত্তির আড়াইটা পর্যন-, ঘুম না হলে যেমন এ-পাশ ও-পাশ করতে হয় তেমনি করেই কেবলই অকসফোর্ড বুক অফ ভর্সেস এর এ পাত ও পাত উলটেছি। ভালোবাসার কবিতা খুঁজেই পেলুম না, আগে সেগুলো পায়ে পায়ে ঠেকত। স্পষ্টই বুঝতে পারছি, আমি লিখব বলেই সমস- পৃথিবী আ অপেক্ষা করে আছে।’
এই বলেই লাবণ্যর বাঁ হাত নিজের দুই হাতের মধ্যে চেপে ধরে বললে, ‘হাত জোড়া পড়ল, কলম ধরব কী দিয়ে? সব চেয়ে ভালো মিল হাতে হাতে মিল। এই যে তোমার আঙুলগুলি আমার আঙুলে আঙুলে কথা কইছে, কোনো কবিই এমন সহজ করে কিছু লিখতে পারলে না।’
‘কিছুই তোমার সহজে পছন্দ হয় না, সেইজন্যে তোমাকে এত ভয় করি মিতা।’
‘ কিন’ আমার কথাটা বুঝে দেখো। রামচন্দ্র সীতার সত্য যাচাই করতে চেয়েছিলেন বাইরের আগুনে, তাতেই সীতাকে হারালেন। কবিতার সত্য যাচাই হয় অগ্নিপরীক্ষায়, সে আগুন অন-রের। যার মনে নেই সেই আগুন সে যাচাই করবে কী দিয়ে? তাকে পাঁচজনের মুখের কথা মেনে নিতে হয়, অনেক সময়েই সেটা দুর্মুখের কথা। আমার মনে আজ আগুন জ্বলেছে, সেই আগুনের ভিতর দিয়ে আমার পুরোনো সব পড়া আবার পড়ে নিচ্ছি; কত অল্পই টিকল। সব হু হু শব্দে ছাই হয়ে যাচ্ছে। কবিদের হট্টগোলের মাঝখানে দাড়িয়ে আজ আমাকে বলতে হয়, তোমরা অত চেচিয়ে কথা কোয়ো না, ঠিক কথাটি আসে- বলো-
ঋড়ৎ মড়ফ’ং ংধশব, যড়ষফ ুড়ঁৎ ঃড়হমঁৎ
ধহফ ষবঃ সব ষড়াব!
অনেকক্ষন দুজনে চুপ করে বসে রইল। তার পরে এক সময়ে লাবন্যর হাতখানি তুলে ধরে অমিত নিজের মুখের উপর বুলিয়ে নিলে। বললে, ‘ ভেবে দেখো বন্যা, আজ এই সকালে ঠিক এই মুহুর্তে সমস- পৃথিবীতে কত অসংখ্য লোকই চাচ্ছে, আর কত অল্প লোকই পেলে। আমি সেই অতি অল্প লোকের মধ্যে একজন। সমস- পৃথিবীতে একমাত্র তুমিই সেই সৌভাগ্যবান লোককে দেখতে পেলে শিলঙ পাহাড়ের কোনে এই য়ুক্যালিপটস গাছের তলায়। পৃথিবীতে পরামাশ্চর্য ব্যাপারগুলিই পরম নম্র, চোখে পড়তে চায় না। অথচ তোমাদের ঐ তারিণী তলাপাত্র কলকাতার গোলদিঘি থেকে আরম্ভ করে নোয়াখালি চাটগাঁ পর্যন- চীৎকার শব্দে শূন্যের দিকে ঘুষি উচিয়ে বাকা পলিটিক্সের ফাকা আওয়াজ ছড়িয়ে এল, সেই দুর্দান- বাজে খবরটা বাংলাদেশের সর্বপ্রধান খবর হয়ে উঠল। কে জানে হয়তো এইটেই ভালো।’
‘ কোনটা ভালো?
‘ ভালো এই যে, সংসারের আসল জিনিসগুলো হাটেবাটেই চলাফেরা করে বেড়ায়, অথচ বাজে লোকের চোখের ঠোকর খেয়ে খেয়ে মরে না। তার গভীর জানাজানি বিশ্ব জগতের অন-রের নাড়ীতে নাড়ীতে আচ্ছা বন্যা, আমি তো বকেই চলেছি, তুমি চুপ করে বসে কী ভাবছ বলো তো।’
লাবণ্য চোখ নিচু করে বসে রইল, জবাব করলে না।
অমিত বললে, ‘ তোমার এই চুপ করে থাকা যেন মাইনে না দিয়ে আমরা সব কথাকে বরখাস- করে দেওয়ার মতো।’
লাবণ্য চোখ নিচু করেই বললে, ‘ তোমার কথা শুনে আমার ভয় হয় মিতা।’
‘ ভয় কিসের!’
‘ তুমি আমার কাছে কী যে চাও, আর আমি তোমাকে কতটুকুই বা দিতে পারি, ভেবে পাই নে।’
‘ কিছু না ভেবেই তুমি দিতে পার, এইটেতেই তো তোমার দানের দাম।’
‘ তুমি যখন বললে কর্তামা সম্মতি দিয়েছেন, আমার মনটা কেমন করে উঠল। মনে হল, এইবার আমার ধরা পড়বার দিন আসছে।’
‘ ধরাই তো পড়তে হবে।’
‘ মিতা, তোমার রুচি, তোমার বুদ্ধি আমার অনেক উপরে। তোমার সঙ্গে একত্রে পথ চলতে গিয়ে একদিন তোমার থেকে বহু দুরে পিছিয়ে পড়ব, তখন আর তুমি আমাকে ফিরে ডাকবে না। সেদিন আমি তোমাকে একটুও দোষ দেব না-না না, কিছু বলো না, আমার কথাটা আগে শোনা। মিনতি করে বলছি, আমাকে বিয়ে করতে চেয়ো না। বিয়ে করে তখন গ্রনি’ খুলতে গেলে তাতে আরো জট পড়ে যাবে। তোমার কাছ থেকে আমি যা পেয়েছি সে আমার পক্ষে যথেষ্ট, জীবনের শেষ পর্যন- চলবে। তুমি কিন’ নিজেকে ভুলিয়ো না।’
‘ বন্যা, তুমি আজকের দিনের ঔদার্যের মধ্যে কালকের দিনের কার্পণ্যের আশঙ্কা কেন তুলছ?’
‘ মিতা, তুমিই আমাকে সত্য বলবার জোর দিয়েছ।আজ তোমাকে যা বলছি তুমি নিজেও তা ভিতরে ভিতরে জান। মানতে চাও না, পাছে যে রস এখন ভোগ করছ তাতে একটুও খটকা বাধে। তুমি তো সংসার ফাঁদবার মানুষ নও, তুমি রুচির তৃষ্ণা মেটাবার জন্যে ফের; সাহিত্যে সাহিত্যে তাই তোমার বিহার, আমার কাছেও সেইজন্যেই তুমি এসেছ। বলব ঠিক কথাটা? বিয়েটা তুমি মনে মনে জান, যাকে তুমি সর্বদাই বল ভালগার। ওটা বড়ো রেসপেক্টবল; ওটা শাস্ত্রের দোহাই পাড়া সেই সব বিষয় লোকের পোষা জিনিসে যারা সম্পত্তির সঙ্গে সহধর্মিনীকে মিলিয়ে নিয়ে খুব মোটা তাকিয়া ঠেসান দিয়ে বসে।’
‘ বন্যা, তুমি আশ্চর্য নরম সুরে আশ্চর্য কঠিন কথা বলতে পার।’
‘ মিতা, ভালোবাসার জোরে চিরদিন যেন কঠিন থাকতেই পারি, তোমাকে ভোলাতে গিয়ে একটুও ফাকি যেন না দিই। তুমি যা আছ ঠিক তাই থাকো, তোমার রুচিতে আমাকে যাতটুকু ভালো লাগে ততটুকুই লাগুক, কিন’ একটুও তুমি দায়িত্ব নিয়ো না।- তাতেই আমি খুশি থাকব।’
‘ বন্যা, এবার তবে আমার কথাটা বলতে দাও। কী আশ্চর্য করেই তুমি আমার চরিত্রের ব্যাখ্যা করেছ। তা নিয়ে কথা কাটাকাটি করব না। কিন’ একটা জায়গায় তোমার ভুল আছে। মানুষের চরিত্র জিনিসটাও চলে। ঘর পোষা অবস’ায় তার একরকম শিকলি বাঁধা স’াবর পরিচয়। তার পরে একদিন ভাগ্যের হঠাৎ এক ঘায়ে তার শিকলি কাটে, সে ছুট দেয় অরণ্যে, তখন তার আর এক মুর্তি।
‘ আজ তুমি তার কোনটা?’
‘ যেটা আমার বরাবরের সঙ্গে মেলে না সেইটে। এর আগে অনেক মেয়ের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল, সমাজের কাটা খাল বেয়ে বাঁধা ঘাটে, রুচির ঢাকা-লন্ঠন জ্বালিয়ে। তাতে দেখাশোনা হয়, চেনাশোনা হয় না। তুমি নিজেই বলো বন্যা, তোমার সঙ্গেও কি আমার সেই আলাপ? লাবণ্য চুপ করে রইল।
অমিত বললে, ‘ বাইরে বাইরে দুই নক্ষত্র পরস্পরকে সেলাম করতে করতে প্রদক্ষিণ করে চলে, কায়দাটা বেশ শোভন, নিরাপদ-সেটাতে যেন তাদের রুচির টান, মর্মের মিল নয়। হঠাৎ যদি মরণের ধাক্কা লাগে, নিবে যায় দুই তারার লন্ঠন, দোঁহে এক হয়ে ওঠবার আগুন ওঠে জ্বলে। সে আগুন জ্বলেছে, অমিত রায় বদলে গেল। মানুষের ইতিহাসটাই এইরকম। তাকে দেখে মনে হয় ধরাবাহিক কিন’ আসলে সে আকস্মিকের মালা গাথা। সৃষ্টির গতি চলে সেই আকস্মিকের ধাক্কায় ধাক্কায় দমকে দমকে; যুগের পর যুগ এগিয়ে যায় ঝাপতালের লয়ে। তুমি আমার তাল বদলিয়ে দিয়েছ বন্যা- সেই তালেই তো তোমার সুরে আমার সুরে গাথা পড়ল।
লাবণ্যর চোখের পাতা ভিজে এল। তবু এ কথা মনে না করে থাকতে পারলে না যে, ‘ অমিতর মনের গড়নটা সাহিত্যের, প্রত্যেকে অভিজ্ঞতায় ওর মুখে কথায় উচ্ছাস তোলে। সেইটে ওর জীবনের ফসল, তাতেই ও পায় আনন্দ। আমাকে ওর প্রযোজন সেইজন্যেই । যে সব কথা ওর মনে বরফ হয়ে জমে আছে, ও নিজে যার ভার বোধ করে কিন’ আওয়াজ পায় না, আমার উত্তাপ লাগিয়ে তাকে গলিয়ে ঝরিয়ে দিতে হবে।’
দুজনে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থেকে লাবণ্য হঠাৎ এক সময়ে প্রশ্ন করলে, ‘ আচ্ছা মিতা, তুমি কি মনে কর না যেদিন তাজমহল তৈরী শেষ হল সেদিন মমতাজের মৃত্যুর জন্যে শাজাহান খুশি হয়েছিলেন? তাঁর স্বপ্নকে অমর করবার জন্যে এই মৃত্যুর দরকার ছিল। এই মৃত্যুই মমতাজের সব চেয়ে বড় প্রেমের দান। তাজমহলে শাজাহানের শোক প্রকাশ পায় নি, তাঁর আনন্দ রূপ ধরেছে।’
অমিত বললে, ‘ তোমার কথায় তুমি ক্ষনে ক্ষনে আমাকে চমক লাগিয়ে দিচ্ছ। তুমি নিশ্চয়ই কবি।’
‘ আমি চাই নে কবি হতে।’
‘ কেন চাও না?’
‘ জীবনের উত্তাপে কেবল কথায় প্রদীপ জ্বালাতে আমার মন যায় না। জগতে যারা উৎসবসভা সাজাবার হুকুম পেয়েছে কথা তাদের পক্ষেই ভালো। আমার জীবনের তাপ জীবনের কাজের জন্যেই।’
‘ বন্যা, তুমি কথাকে অস্বীকার করছ? জান না, তোমার কথা আমাকে কেমন করে জাগিয়ে দেয়। তুমি কী করে জানবে তুমি কী বল, আর সে বলার কী অর্থ! আবার দেখছি নিবারণ চক্রবর্তীকে ডাকতে হল। ওর নাম শুনে শুনে তুমি বিরক্ত হয়ে গেছ। কিন’ কী করব বলো, ঐ লোকটা আমার মনের কথার ভান্ডারী। নিবারণ এখনো নিজের কাছে নিজে পুরোনো হয়ে যায় নি- ও প্রত্যেক বারেই যে কবিতা লেখে সে ওর প্রথম কবিতা। সেদিন ওর খাতা ঘাঁটতে ঘাঁটতে অল্পদিন আগেকার একটা লেখা পাওয়া গেল। ঝর্নার উপরে কবিতা কী করে খবর পেয়েছে, শিলঙ পাহাড়ে এসে আমার ঝর্না আমি খুঁজে পেয়েছি। ও লিখছে-
ঝর্না, তোমার স্ফটিক জলের
স্বচ্ছ ধারা,
তাহারি মাঝারে দেখে আপনারে
সূর্য তারা।
‘আমি নিজে যদি লিখতুম, এর চেয়ে স্পষ্টতর করে তোমার বর্ণনা করতে পারতুম না। তোমার মনের মধ্যে এমন একটি স্বচ্ছতা আছে যে, আকাশের সমস- আলো সহজেই প্রতিবিম্বিত হয়। তোমার সব-কিছুর মধ্যে ছড়িয়ে-পড়া সেই আলো আমি দেখতে পাই। তোমার মুখে, তোমার হাসিতে, তোমার কথায়, তোমার সি’র হয়ে বসে থাকায়, তোমার রাস-া দিয়ে চলায়।
আজি মাঝে মাঝে আমার ছায়ারে
দুলায়ে খেলায়ো তারি এক ধারে,
সে ছায়ারি সাথে হাসিয়া মিলায়ো
কলধ্বনি-
দিয়ো তারে বাণী যে বাণী তোমার চিরন-নী।
‘তুমি ঝর্না, জীবনস্রোতে তুমি যে কেবল চলছ তা নয়, তোমার চলার সঙ্গে সঙ্গেই তোমার বলা। সংসারের যে-সব কঠিন অচল পাথরগুলোর উপর দিয়ে চল তারাও তোমার সংঘাতে সুরে বেজে ওঠে।
আমার ছায়াতে তোমার হাসিতে
মিলিত ছবি,
তাই নিয়ে আজি পরানে আমার
মেতেছ কবি।
পদে পদে তব আলোর ঝলকে
ভাষা আনে প্রাণে পলকে পলকে,
মোর বাণীরূপ দেখিলাম আজি,
নির্ঝরিণী-
তোমার প্রবাহে মনেরে জাগায়,
নিজেরে চিনি।’
লাবণ্য একটু ম্লান হাসি হেসে বললে, ‘ যতই আমার আলো থাক আর ধ্বনি তাকা তোমার ছায়া তবু ছায়াই, সে ছায়াকে আমি ধরে রাখতে পারব না।’
অমিত বললে, ‘ কিন’ একদিন হয়তো দেখবে, আর-কিছু যদি না থাকে আমার বানীরূপ রয়েছে।’
লাবণ্য হেসে বললে, ‘কোথায়? নিবারণ চক্রবর্তীর খাতায়?’
আশ্চর্য কিছুই নেই। আমার মনের নীচের স-রে যে ধারা বয়, নিবারণের ফোয়ারায় কেমন করে সেটা বেরিয়ে আসে।’
‘তা হলে কোনো একদিন হয়তো কেবল নিবারণ চক্রবর্তীর ফোয়ারার মধ্যেই তোমার মনটিকে পাব, আর কোথাও নয়।’
এমন সময় বাসা থেকে লোক এল ডাকতে- খাবার তৈরি।
অমিত চলতে চলতে ভাবতে লাগল যে, ‘লাবন্য বুদ্ধির আলোতে সমস-ই স্পষ্ট করে জানতে চায়। মানুষ স্বভাবত যেখানে আপনাকে ভোলাতে ইচ্ছা করে ও সেখানেও নিজেকে ভোলাতে পারে না। লাবণ্য যে কথাটা বললে সেটার তো প্রতিবাদ করতে পারছি নে। অন-রাত্মার গভীর উপলব্ধি বাইরে প্রকাশ করতেই হয়, কেউ বা করে জীবনে,কেউ বা করে রচনায়- জীবনকে ছুঁতে ছুঁতে অথচ তার থেকে সরতে সরতে, নদী যেমন কেবলই তীর থেকে সরতে সরতে চলে তেমনি। আমি কি কেবলই রচনার স্রোত নিয়েই জীবন থেকে সরে সরে যাব! এইখানেই কি মেয়ে পুরুষের ভেদ? পুরুষ তার সমস- শক্তিকে সার্থক করে সৃষ্টি করতে, সেই সৃষ্টি আপনাকে এগিয়ে দেবার জন্যেই আপনাকে পদে পদে ভোলে। মেয়ে তার সমস- শক্তিকে খাটায় রক্ষা করতে, পুরোনোকে রক্ষা করবার জন্যেই নতুন সৃষ্টিকে সে বাধা দেয়। রক্ষার প্রতি সৃষ্টি নিষ্ঠুর , সৃষ্টির প্রতি রক্ষা বিঘ্ন। এমন কেন হল? এক জায়গায় এরা পরস্পরকে আঘাত করবেই। যেখানে খুব করে মিল সেইখানেই মস- বিরুদ্ধতা। তাই ভাবছি, আমাদের সকলের চেয়ে বড়ো যে পাওনা সে মিলন নয় সে মক্ত।’
একথাটা ভাবতে অমিতকে পীড়া দিলে, কিন’ ওর মন এটাকে অস্বীকার করতে পারলে না।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন