রবিবার, ২৭ মার্চ, ২০১১

শেষের কবিতা – অধ্যায় ০৮ ৮ লাবণ্য- তর্ক যোগমায়া বললেন, ‘মা লাবণ্য, তুমি ঠিক বুঝেছ?’ ‘ঠিক বুঝেছি মা’। ‘অমিত ভারি চঞ্চল, সে কথা মানি। সেইজন্যেই ওকে এত স্নেহ করি। দেখো-না, ও কেমনতরো এলোমেলো। হাত থেকে সবই যেন পড়ে পড়ে যায়’। লাবণ্য একটু হেসে বললে, ‘ওঁকে সবই যদি ধরে রাখতেই হত, হাত থেকে সবই যদি খসে খসে না পড়ত, তা হলেই ওঁর ঘটত বিপদ। ওঁর নিয়ম হচ্ছে, হয় উনি পেয়েও পাবেন না, নয় উনি পেয়েই হারাবেন। যেটা পাবেন সেটা যে আবার রাখতে হবে, এটা ওঁর ধাতের সঙ্গে মেলে না’। ‘সত্যি করে বলি বাছা, ওর ছেলেমানুষি আমার ভারি ভালো লাগে’। ‘সেটা হল মায়ের ধর্ম। ছেলেমানুষি দায় যত-কিছু সব মায়ের, আর ছেলের দিকে যত-কিছু সব খেলা। কিন’ আমাকে কেন বলছি, দায় নিতে যে পারে না তার উপরে দায় চাপাতে’? ‘দেখছ-না লাবণ্য, ওর অমন দুরন- মন আজকাল অনেকখানি যেন ঠান্ডা হয়ে গেছে। দেখে আমার বড়ো মায়া করে। যাও বল, ও তোমাকে ভালোবাসে’। ‘তা বাসেন।’ ‘তবে আর ভাবনা কিসের?’ ‘কর্তামা, ওঁর যেটা স্বভাব তার উপর আমি একটুও অত্যাচার করতে চাই নে’। ‘আমি তো এই জানি লাবণ্য, ভালোবাসা খানিকটা অত্যাচার চায়, অত্যাচার করেও।’ ‘কর্তামা, সে অত্যাচারের ক্ষেত্র আছে; কিন’ স্বভাবের উপর পীড়ন সয় না। সাহিত্যে ভালোবাসার বই যতই পড়লেম ততই এই কথাটা বার বার মনে হয়েছে, ভালোবাসার ট্রাজেডি ঘটে সেইখানেই যেখানে পরস্পরকে স্বতন্ত্র জেনে সন’ষ্ট থাকতে পারে নি- নিজের ইচ্ছেকে অন্যের ইচ্ছে করবার জন্যে যেখানে জুলুম-যেখানে মনে করি, আপন মনের মতো করে বদলিয়ে অন্যকে সৃষ্টি করব’। ‘তা মা, দুজনকে নিয়ে সংসার পাততে গেলে পরস্পর খানিকটা সৃষ্টি না করে নিলে চলেই না। ভালোবাসা যেখানে আছে সেখানে সেই সৃষ্টি সহজ; যেখানে নেই সেখানে হাতুড়ি পিটাতে গিয়ে তুমি যাকে ট্র্যাজেডি বল তাই ঘটে’। ‘সংসার পাতবার জন্যেই যে মানুষ তৈরি তার কথা ছেড়ে দাও। সে তো মাটির মানুষ, সংসারের প্রতিদিনের চাপেই তার গড়ন-পিটোন আপনিই ঘটতে থাকে। কিন’ যে মানুষ মাটির মানুষ একেবারেই নয় সে আপনার স্বাতন্ত্র্য কিছুতেই ছাড়তে পারে না। যে মেয়ে তা না বোঝ সে যতই দাবি করে ততই হয় বঞ্চিত, যে পুরুষ তা না বোঝে সে যতই টানা-হেঁচড়া করে ততই আসল মানুষটাকে হারায়। আমার বিশ্বাস, অধিকাংশ স’লেই আমরা যাকে পাওয়া বলি সে আর কিছু নয়, হাতকড়া হাতকে যেরকম পায় সেই আর-কি।’ ‘তুমি কী করতে চাও লাবণ্য?’ ‘বিয়ে করে দুঃখ দিতে চাই নে। বিয়ে সকলের জন্যে নয়। জান কর্তামা, খুঁতখুঁতে মন যাদের তারা মানুষকে খানিক খানিক বাদ দিয়ে দিয়ে বেছে বেছে নেয়। কিন’ বিয়ের ফাঁদে জড়িয়ে পড়ে স্ত্রী-পুরুষ যে বড়ো বেশি কাছাকাছি এসে পড়ে, মাঝে ফাঁক থাকে না; তখন একেবারে গোটা মানুষকে নিয়েই কারবার করতে হয় নিতান- নিকটে থেকে। কোন একটা অংশ ঢাকা রাখবার জো থাকে না।’ ‘লাবণ্য, তুমি নিজেকে জান না। তোমাকে নিতে গেলে কিছুই বাদ দিয়ে নেবার দরকার হবে না।’ ‘কিন’ উনি তো আমাকে চান না। যে আমি সাধারণ মানুষ, ঘরের মেয়ে, তাকে উনি দেখতে পেয়েছেন বলে মনেই করি নে। আমি যেই ওঁর মনকে স্পর্শ করেছি অমনি ওঁর মন অবিরাম ও অজস্র কথা কয়ে উঠেছে। সেই কথা দিয়ে উনি কেবলই আমাকে গড়ে তুলেছেন। ওঁর মান যদি ক্লান- হয়, কথা যদি ফুরোয়, তবে সেই নিঃশব্দের ভিতরে ধরা পড়বে এই নিতান- সাধারন মেয়ে, যে মেয়ে ওঁর নিজের সৃষ্টি নয়। বিয়ে করলে মানুষকে মেনে নিতে হয়, তখন আর গড়ে নেবার ফাঁক পাওয়া যায় না।’ ‘ তোমার মনে হয়, অমিত তোমার মতো মেয়েকেও সম্পুর্ণ মেনে নিতে পারবে না?’ ‘ স্বভাব যদি বদলায় তবে পারবেন। কিন’ বদলাবেই বা কেন? আমি তো তা চাই নে।’ ‘ তুমি কী চাও?’ ‘ যতদিন পারি না হয় ওঁর কথার সঙ্গে, ওঁর মনের খেলার সঙ্গে মিশিয়ে স্বপ্ন হয়েই থাকব। আর, স্বপ্নই বা তাকে বলব কেন? সে আমার একটা বিশেষ জন্ম, একটা বিশেষ রূপ, একটা বিশেষ জগতে সে সত্য হয়ে দেখা দিয়েছে। না হয় সে গুটি থেকে বের হয়ে আসা-দু চার দিনের একটা রঙিন প্রজাপতিই হল, তাতে দোষ কী? জগতে প্রজাপতি আর কিছুর চেয়ে যে কম সত্য তা তো নয়। নাহয় সে সূর্যোদয়ের আলোতে দেখা দিল আর সূর্যাসে-র আলোতে মরেই গেল, তাতেই বা কী? কেবল এইটুকুই দেখা চাই যে, সেটুকু সময় যেন ব্যর্থ হয়ে না যায়।’ ‘ সে যেন বুঝলুম, তুমি অমিতের কাছে নাহয় ক্ষনকালের মায়া রূপেই থাকবে। আর নিজে? তুমিও কি বিয়ে করতে চাও না? তোমার কাছে অমিতও কি মায়া?’ লাবণ্য চুপ করে বসে রইল, কোনো জবাব করলে না। যোগমায়া বলেলেন, ‘তুমি যখন তর্ক কর তখন বুঝতে পারি তুমি অনেক-বই-পড়া মেয়ে। তোমার মতো করে ভাবতেও পারি নে, কথা কইতেও পারি নে; শুধু তাই নয়, হয়তো কাজের বেলাতেও এত শক্ত হতে পারি নে। কিন’ তর্কের ফাঁকের মধ্যে দিয়েও যে তোমাকে দেখেছি মা। সেদিন রাত তখন বারোটা হবে-দেখলুম, তোমার ঘরে আলো জ্বলছে। ঘরে গিয়ে দেখি, তোমার টেবিলের উপর নুয়ে পড়ে দুই হাতের মধ্যে মুখ রেখে তুমি কাঁদছ। এ তো ফিলজফি-পড়া মেয়ে নয়। একবার ভাবলুম, সান-না দিয়ে আসি; তার পরে ভাবলুম, সব মেয়েকেই কাঁদবার দিনে কেঁদে নিতে হবে, চাপা দিতে যাওয়া কিছু নয়। এ কথা খুবই জানি, তুমি সৃষ্টি করতে চাও না, ভালোবাসতে চাও। মন প্রাণ দিয়ে সেবা না করতে পারলে তুমি বাঁচবে কী করে। তাই তো বলি, ওকে কাছে না পেলে তোমার চলবে না। ‘ বিয়ে করব না’ বলে হঠাঃ পণ করে বোসো না। একবার তোমার মনে একটা জেদ চাপলে আর তোমাকে সোজা করা যায় না, তাই ভয় করি।’ লাবণ্য কিছু বললে না, নতমুখে কোলের উপর শাড়ির আঁচলটা চেপে চেপে অনাবশ্যক ভাঁজ করতে লাগল। যোগমায়া বললেন,‘তোমাকে দেখে আমার অনেকবার মনে হয়েছে, অনেক পড়ে, অনেক ভেবে তোমাদের মন বেশি সূক্ষ্ম হয়ে গেছে; তোমার ভিতরে ভিতরে যে-সব ভাব গড়ে তুলছ আমাদের সংসারটা তার উপযুক্ত নয়। আমাদের সময়ে মনের যে-সব আলো অদৃশ্য ছিল, তোমরা আজ যেন সেগুলোকেও ছাড়ান দিতে চাও না। তারা দেহের মোটা আবরণটাকে ভেদ করে দেহটাকে যেন অগোচর করে দিচ্ছে। আমাদের আমলে মনের মোটা মোটা ভাবগুলো নিয়ে সংসারে সুখদুঃখ যথেষ্ট ছিল, সমস্যা কিছু কম ছিল না। আজ তোমরা এতই বাড়িয়ে তুলছ, কিছুই আর সহজ রাখলে না।’ লাবণ্য একটুখানি হাসলে। এই সেদিন অমিত অদৃশ্য আলোর কথা যোগমায়াকে বোঝাচ্ছিল, তার থেকে এই যুক্তি তাঁর মাথায় এসেছে-এও তো সুক্ষ্ম; যোগমায়ার মা ঠাকরুন এ কথা এমন করে বুঝতেন না। বললে, ‘কর্তামা, কালের গতিকে মানুষের মন যতই স্পষ্ট করে সব কথা বুঝতে পারবে ততই শক্ত করে তার ধাক্কা সইতেও পারবে। অন্ধকারের ভয়, অন্ধকারের দুঃখ অসহ্য, কেননা সেটা অস্পষ্ট। যোগমায়া বললেন, ‘আজ আমার বোধ হচ্ছে, কোনো কালে তোমাদের দুজনের দেখা না হলেই ভালো হত।’ ‘ না না, তা বোলো না। যা হয়েছে এ ছাড়া আর-কিছু যে হতে পারত, এ আমি মনেও করতে পারি-নে-এক সময়ে আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, আমি নিতান-ই শুকনো-কেবল বই পড়ব আর পাস করব, এমনি করেই আমার জীবন কাটাবে। আজ হাঠাৎ দেখলুম, আমিও ভালোবাসতে পারি। আমার জীবনে এমন অসম্ভব যে সম্ভব হল, এই আমার ঢের হয়েছে। মনে হয় এত দিন ছায়া ছিলুম, এখন সত্য হয়েছি। এর চেয়ে আর কী চাই! আমাকে বিয়ে করতে বোলো না কর্তামা।’ ব’লে চৌকি থেকে মেঝেতে নেমে যোগমায়ার কোলে মাথা রেখে কাঁদতে লাগল। শেষের কবিতা – অধ্যায় ০৯ ৯ বাসা-বদল গোড়ায় সবাই ঠিক করে রেখেছিল, অমিত দিন-পনেরোর মধ্যে কোলকাতায় ফিরবে। নরেন মিত্তির খুব মোটা বাজি রেখেছিল যে, সাত দিন পেরোবে না। এক মাস যায়, দু মাস যায়, ফেরবার নামও নেই। শিলঙের বাসার মেয়াদ ফুরিয়েছে, রংপুরের কোন্‌ জমিদার এসে সেটা দখল করে বসল। অনেক খোঁজ করে যোগমায়াদের কাছাকাছি একটা বাসা পাওয়া গেছে। এক সময়ে ছিল গোয়ালার কি মালীর ঘর, তার পরে একজন কেরানির হাতে পড়ে তাতে গরিবি ভদ্রতার অল্প একটু আঁচ লেগেছিল। সে কেরানিও গেছে মরে, তারই বিধবা এটা ভাড়া দেয়। জানলা-দরজা প্রভৃতির কার্পণ্যে ঘরের মধ্যে তেজ মরুৎ ব্যোম এই তিন ভুতেরই অধিকার সংকীর্ন, কেবল বৃষ্টির দিনে অপ্‌ অবতীর্ণ হয় আশাতীত প্রাচুর্যের সঙ্গে অখ্যাত ছিদ্রপথ দিয়ে। ঘরের অবস্থা দেখে যোগমায়া একদিন চমকে উঠলেন বললেন, ‘বাবা, নিজেকে নিয়ে এ কী পরীক্ষা চলছে?’ অমিত উত্তর করলে,‘উমার ছিল নিরাহারের তপস্যা, শেষকালে পাতা পর্যন- খাওয়া ছেড়েছিলেন। আমার হল নিরাস্‌বাবের তপস্যা, খাট পালঙ টেবিল কেদারা ছাড়তে ছাড়তে প্রায় এসে ঠেকেছে শুন্য দেয়ালে। সেটা ঘটেছিল হিমালয় পর্বতে, এটা ঘটল শিলঙ পাহাড়ে। সেটাতে কন্যা চেয়েছিলেন বর, এটাতে বর চাচ্ছেন কন্যা। সেখানে নারদ ছিলেন ঘটক, এখানে স্বয়ং আছেন মাসিমা। এখন শেষ পর্যন- যদি কোন কারণে কালিদাস এসে না পৌছাতে পারেন, অগত্যা আমাকেই তাঁর কাজটাও যথাসম্ভব সারতে হবে।’ অমিত হাসতে হাসতে কথাগুলো বলে, কিন’ যোগমায়াকে ব্যথা দেয়। তিনি প্রায় বলতে গিয়েছিলেন, আমাদের বাড়িতেই এসে থাকো-থেমে গেলেন। ভাবলেন, বিধাতা একটা কান্ড ঘটিয়ে তুলেছেন, তার মধ্যে আমাদের হাত পড়লে অসাধ্য জট পাকিয়ে উঠতে পারে। নিজের বাসা থেকে অল্প কিছু জিনিসপত্র পাঠিয়ে দিলেন, আর সেইসঙ্গে এই লক্ষ্মীছাড়াটার’ পরে তাঁর করুণা দ্বিগুণ বেড়ে গেল। লাবণ্যকে বার বার বললেন, ‘মা লাবণ্য, মনটাকে পাষাণ কোরো না।’ একদিন বিষম এক বর্ষনের অনে- অমিত কেমন আছে খবর নিতে গিয়ে যোগমায়া দেখলেন, নড়বড়ে একটা চারপেয়ে টেবিলের নীচে কম্বল পেতে অমিত একলা বসে একখানা ইংরেজি বই পড়ছে। ঘরের মধ্যে যেখানে-সেখানে বৃষ্টি বিন্দুর অসংগত আবির্ভাব দেখে টেবিল দিয়ে একটা গুহা বানিয়ে তার নীচে অমিত পা ছড়িয়ে বসে গেল। প্রথমে নিজে নিজেই হেসে নিলে এক চোট, তার পরে চলল কাব্যালোচনা। মনটা ছুটেছিল যোগমায়ার বাড়ির দিকে। কিন’ শরীরটা দিলে বাধা। কারণ, সেখানে কোনো প্রয়োজন হয় না সেই কোলকাতায় অমি কিনেছিল এক অনেক দামের বর্ষাতি, যেখানে সর্বদাই প্রয়োজন সেখানে আসবার সময় সেটা আনবার কথা মনে হয় নি। একটা ছাতা সঙ্গে ছিল, সেটা খুব সম্ভব কোনো একদিন সংকল্পিত গম্যস’ানেই ফেলে এসেছে, আর তা যদি না হয় তবে সেই বুড়ো দেওদারের তলে সেটা আছে পড়ে। যোগমায়া ঘরে ঢুকে বললেন,‘ একি কান্ড অমিত!’ অমিত তাড়াতাড়ি টেবিলের নীচে থেকে বেরিয়ে এসে বললে,‘ আমার ঘরটা আজ অসম্বন্ধ প্রলাপে মেতেছে, দশা আমার চেয়ে ভারো নয়।’ ‘অসম্বন্ধ প্রলাপ!’ ‘ অর্থাৎ বাড়ির চালটা প্রায় ভারতবর্ষ বললেই হয়। অংশগুলোর মধ্যে সম্বন্ধটা আলগা। এইজন্যে উপর থেকে উৎপাত ঘটলেই চারি দিকে এলোমেলো অশ্রুবর্ষণ হতে থাকে, আর বাইরের দিক থেকে যদি ঝড়ের দাপট লাগে, তবে সোঁ সোঁ করে উঠতে থাকে দীর্ঘশ্বাস। আমি তো প্রটেষ্ট্‌-স্বরূপে মাথার উপরে এক মঞ্চ খাড়া করেছি-ঘরের মিসগর্নমেন্টের মাঝখানেই নিরুপদ্রব হোমরুলের দৃষ্টান্ত পলিটিকসের একটা মুলনীতি একানে প্রত্যক্ষ।’ ‘ মুলনীতিটা কী শুনি।’ ‘ সেটা হচ্ছে এই যে, যে ঘরওয়ালা ঘরে বাস করে না সে যত বড়ো ক্ষমতাশালীই হোক, তার শাসনের চেয়ে যে দরিদ্র বাসাড়ে ঘরে থাকে তার যেমন-তেমন ব্যবস’াও ভালো।’ আজ লাবণ্যর’পর যোগমায়ার খুব রাগ হল। অমিতকে তিনি যতই গভীর ক’রে স্নেহ করছেন ততই মনে মনে তার মুর্তিটা খুব উঁচু করেই গড়ে তুলছেন।-‘এত বিদ্যা, এত বুদ্ধি, এত পাস, অথচ এমন সাদা মন। গুছিয়ে কথা বলবার কী আসামান্য শক্তি। আর, যদি চেহারার কথা বল, আমার চোখে তো লাবণ্যর চেয়ে ওকে অনেক বেশি সুন্দর ঠেকে। লাবণ্যর কপাল ভালো, অমিত কোন্‌ গ্রহের চক্রানে- ওকে এমন মুগ্ধ চোখে দেখেছে! সেই সোনার চাঁদ ছেলেকে লাবন্য এত করে দুঃখ দিচ্ছে! খামকা বলে বসলেন কিনা বিয়ে করবেন না। যেন কোন রাজরাজেশ্বরী! ধনুক-ভাঙা পণ! এত অহংকার সইবে কেন! পোড়ারমুখীকে যে কেঁদে কেঁদে মরতে হবে।’ একবার যোগমায়া ভাবলেন, অমিতকে গাড়িতে করে তুলে নিয়ে যাবেন তাঁদের বাড়িতে। তার পরে কী ভেবে বললেন, ‘একুট বোসো বাবা, আমি এখনই আসছি।’ বাড়ি গিয়েই চোখে পড়ল লাবন্য তার ঘরের সোফায় হেলান দিয়ে পায়ের উপর শাল মেলে গোর্কির ‘মা’ বলে গল্পের বই পড়ছে। ওর এই আরামটা দেখে ওঁর মনে মনে রাগ আরো বেড়ে উঠল। বললেন, ‘চলো, একটু বেড়িয়ে আসবে।’ সে বললে,‘কর্তামা, আজ বেরোতে ইচ্ছে করছে না।’ যোগমায়া ঠিক বুঝলেন না যে, লাবণ্য নিজের কাছ থেকে ছুটে গিয়ে এই গল্পের মধ্যে আশ্রয় নিয়েছে। সমস- দুপুরবেলা খাওয়ার পর থেকেই , তার মনের মধ্যে একটা অসি’র অপেক্ষা ছিল কখন আসবে অমিত। কেবইল মন বলেছে, এল বুঝি। বাইরে দম্‌কা হাওয়ার দৌরাত্ম্যে পাইন গাছগুলো থেকে থেকে ছট্‌ফট্‌ করে। আর, দুর্দান- বৃষ্টিতে সদ্যোজাত ঝর্নাগুলো এমনি ব্যতিব্যস- যেন তাদের মেয়াদের সময়টার সঙ্গে উর্ধ্বশ্বাসে তাদের পাল্লা চলেছে। লাবন্যর মধ্যে একটা ইচ্ছে আজ অশান- হয়ে উঠল-যাক সব বাধা ভেঙে, সব দ্বিধা উড়ে, অমিতের দুই হাত আজ চেপে ধরে বলে উঠি, জন্মে-জন্মান-রে আমি তোমার। আজ বলা সহজ। আজ সমস- আকাশ যে মরিয়া হয়ে উঠল, হু হু করে কী যে হেঁকে উঠছে তার ঠিক নেই, তারই ভাষায় আজ বন-বনান-র ভাষা পেয়েছে, বৃষ্টিধারায়-আবিষ্ট গিরিশৃঙ্গগুলো আকাশে কান পেতে দাঁড়িয়ে রইল। অমনি করেই কেউ শুনতে আসুক লাবণ্যর কথা অমনি মস- করে, স-ব্ধ হয়ে, অমনি উদার মনোযোগে। কিন’ প্রহরের পর প্রহর যায়, কেউ আসে না। ঠিক মনের কথাটি বলার লগ্ন যে উত্তীর্ণ হয়ে গেল। এর পরে যখন কেউ আসবে তখন কথা জুটবে না, তখন সংশয় আসবে মনে, তখন তান্ডবনৃত্যোন্মত্ত দেবতার মাভৈঃ রব আকাশে মিলেয়ে যাবে। বৎসরের পর বৎসর নীরবে চয়ে যায়, তার মধ্যে বাণী একদিন বিশেষ প্রহরে হঠাৎ মানুষের দ্বারে আঘাত করে। এই সময়ে দ্বার খোলবার চাবিটি যদি না পাওয়া গেল তবে কোনোদিনই ঠিক কথাটি অকুন্ঠিত স্বরে বলবার দৈবশক্তি আর জোটে না। যেদিন সেই বাণী আসে সেদিন সমস- পৃথিবীকে ডেকে খবর দিতে ইচ্ছে করে , শোনো তোমরা, আমি ভালোবাসি। ‘ আমি ভালোবাসি’ এই কথাটি অপরিচিত সিন্ধুপারগামী পাখির মতো, কত দিন থেকে, কত দুর থেকে আসছে-সেই কথাটির জন্যেই আমার প্রাণে আমার ইষ্টদেবতা এতদিন অপেক্ষা করছিলেন। স্পর্শ করল আজ সেই কথাটি-আমার সমস- জীবন, আমার সমস- জগৎ সত্য হয়ে উঠল। বালিশের মধ্যে মুখ লুকিয়ে লাবণ্য আজ কাকে এমন করে বলতে লাগল ‘সত্য সত্য, এত সত্য আর কিছু নেই’! সময় চলে গেল, অতিথি এল না। অপেক্ষার গুরুভারে বুকের ভিতরটা টন টন করতে লাগল, বারান্দায় বেরিয়ে গিয়ে লাবণ্য খানিকটা ভিজে এল জলের ঝাপটা লাগিয়ে। তার পরে একটা গভীর অবসাদে তার মনটাকে ঢেকে ফেললে নিবিড় একটা নৈরাশ্যে; মনে হল ওর জীবনে যা জ্বলবার তা একবার মাত্র দপ্‌ ক’রে জ্বলে তার পরে গেল নিবে, সামনে কিছুই নেই। অমিতকে নিজের ভিতরকার সত্যের দোহাই দিয়ে সম্পূর্ণ করে স্বীকার করে নিতে ওর সাহস চলে গেল। এই কিছু আগেই ওর প্রবল যে একটা ভরসা জেগেছিল সেটা ক্লান- হয়ে পড়েছে। অনেকক্ষণ চুপ করে পড়ে থেকে অবশেষে টেবিল থেকে বইটা টেনে নিলে। কিছু সময় গেল মন দিতে; তার পরে গল্পের ধারার মধ্যে প্রবেশ করে কখন নিজেকে ভুলে গেল তা জানতে পারে নি। এমন সময় যোগমায়া ডাকলেন, বেড়াতে যেতে। ওর উৎসাহ হল না। যোগমায়া একটা চৌকি টেনে লাবণ্যর সামনে বসলেন, দীপ্ত চোখ তার মুখে রেখে বললেন, ‘ সত্যি করে বলো দেখি লাবণ্য, তুমি কি অমিতকে ভালোবাস?’ লাবণ্য তাড়াতাড়ি উঠে বসে বললে, ‘ এমন কথা কেন জিজ্ঞাসা করছ কর্তামা?’ ‘ যদি না ভালোবাস ওকে স্পষ্ট করেই বলো-না কেন। নিষ্ঠুর তুমি, ওকে যদি না চাও তবে ওকে ধরে রেখো না।’ লাবণ্যর বুকের ভিতরটা ফুলে উঠল, মুখ দিয়ে কথা বেরোল না। ‘ এইমাত্র যে দশা ওর দেখে এলুম, বুক ফেটে যায়। এমন ভিক্ষুকের মতো কার জন্যে এখানে ও পড়ে আছে! ওর মতো ছেলে যাকে চায় সে যে কত বড়ো ভাগ্যবতী তা কি একটুও বুঝতে পার না?’ চেষ্টা করে রুদ্ধ কন্ঠের বাধা কাটিয়ে লাবণ্য বলে উঠল, ‘ আমার ভালবাসার কথা জিজ্ঞাসা করছ কর্তামা? আমি তো ভেবে পাই নে, আমার চেয়ে ভালোবাসতে পারে পৃথিবীতে এমন কেউ আছে। ভালোবাসায় আমি যে মরতে পারি। এতদিন যা ছিলুম সব যে আমার লুপ্ত হয়ে গেছে। এখন থেকে আমার আর-এক আরম্ভ, এ আরম্ভের শেষ নেই। আমার মধ্যে এ যে কত আশ্চার্য সে আমি কাউকে কেমন করে জানাব? আর কেউ কি এমন করে জেনেছে?’ যোগমায়া অবাক হয়ে গেলেন। চিরদিন দেখে এসেছেন লাবণ্যর মধ্যে গভীর শানি-, এত বড়ো দুঃসহ আবেগ কোথায় এতদিন লুকিয়ে ছিল! তাকে আসে- আসে- বললেন, ‘মা লাবণ্য, নিজেকে চাপা দিয়ে রেখো না। অমিত অন্ধকারে তোমাকে খুঁজে খুঁজে বেড়াচ্ছে; সম্পূর্ণ করে তার কাছে তুমি আপনাকে জানাও-একটুও ভয় কোরো না। যে আলো তোমার মধ্যে জ্বলেছে সে আলো যদি তার কাছেও প্রকাশ পেত তা হলে তার কোন অভাব থাকত না। চলে মা, এখনই চলো আমার সঙ্গে।’ দুজনে গেলেন অমিতর বাসায়। শেষের কবিতা – অধ্যায় ১০ ১০ দ্বিতীয় সাধনা তখন অমিত ভিজে চৌকির উপরে একতাড়া খবররে কাগজ চাপিয়ে তার উপর বসেছে। টেবিলে এক দিসে- ফুলস্ক্যাপ কাগজ নিয়ে তার চলছে লেখা। সেই সময়েই সে তার বিখ্যাত আত্মাজীবনী শুরু করেছিল। কারণ জিজ্ঞাসা করলে বলে, সেই সময়েই তার জীবনটা আকস্মাৎ তার নিজের কাছে দেখা দিয়েছিল নান রঙে, বাদলের পরদিনকার সকালবেলায় শিলঙ পাহাড়ের মতো; সেদিন নিজের অসি-ত্বের একটা মূল্য সে পেয়েছিল, সে কথাটা প্রকাশ না করে সে থাকবে কী করে? অমিত বলে, মানুষের মৃত্যুর পরে তার জীবনী লেখা হয় তার কারণ, এক দিকে সংসারে সে মরে, আর-এক দিকে মানুষের মনে সে নিবিড় করে বেঁচে ওঠে। অমিতর ভাবখানা এই যে, শিলঙে সে যখন ছিল তখন এক দিকে সে মরেছিল, তার অতীতটা গিয়েছিল মরীচিকার মতো মিলিয়ে, তেমনি আর-এক দিকে সে উঠেছিল তীব্র করে বেঁেচ; পিছনের অন্ধকারের উপরে উজ্জ্বল আলোর ছবি প্রকাশ পেয়েছে। এই প্রকাশের খবরটা রেখে যাওয়া চাই। কেননা, পৃথিবীতে খুব অল্প লোকের ভাগ্যে এটা ঘটতে পারে, তারা জন্ম থেকে মৃত্যুকাল পর্যন- একটা প্রদোষচ্ছায়ার মধ্যেই কাটিয়ে যায়, যে বাদুড় গুহার মধ্যে বাসা করেছে তারই মতো। তখন অল্প অল্প বৃষ্টি পড়েছে, ঝোড়ো হাওয়াটা গেছে থেমে, মেঘ এসেছে পাতলা হয়ে। অমিত চৌকি ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললে,‘এ কী অন্যায় মাসিমা।’ ‘কেন বাবা কী করেছি?’ ‘আমি যে একেবারে অপ্রস-ত। শ্রীমতী লাবন্য কী ভাববেন’। ‘শ্রীমতী লাবণ্যকে একটু ভাবতে দেওয়াই তো দরকার। যা জানবার সবটাই যে জানা ভালো। এতে শ্রীযুক্ত অমিতের এত আশঙ্কা কেন?’ ‘শ্রীযুক্তের যা ঐশ্বর্য সেইটেই শ্রীমতীর কাছে জানাবার। আর, শ্রীহীনের যা দৈন্য সেইটে জানাবার জন্যেই আছ তুমি, আমার মাসিমা’। ‘এমন ভেদবুদ্ধি কেন বাছা?’ ‘নিজের গরজেই। ঐশ্বর্য দিয়েই ঐশ্বর্য দাবি করতে হয়, আর অভাব দিয়ে চাই আশীর্বাদ। মানবসভ্যতায় লাবণ্যদেবীরা জাগিয়েছেন ঐশ্বর্য, আর মাসিমারা এনেছেন আশীর্বাদ।’ ‘ দেবীকে আর মাসিমাকে একাধারেই পাওয়া যেতে পারে অমিত; অভাব ঢাকবার দরকার হয় না।’ ‘ এর জবাব কবির ভাষায় দিতে হয়। গদ্যে যা বলি সেটা স্পষ্ট বোঝাবার জন্যে ছন্দের ভাষ্য দরকার হয়ে পড়ে। ম্যাথু আর্নল্‌ড কাব্যকে বলেছেন ক্রিটিসিজম অফ লাইফ, আমি কথাটাকে সংশোধন করে বলতে চাই লাইফ্‌স্‌ কমেন্টারি ইন ভারস॥ অতিথি বিশেষকে আগে থাকতে জানিয়ে রাখি, যেটা পড়তে যাচ্ছি সে লেখাটা কোনো কবি সম্রাটের নয়।- পুর্ণপ্রাণে চাবায় যাহা রিক্ত হাতে চাস যে তারে, সিক্ত চোখে যায় নে দ্বারে। ভেবে দেখবেন, ভালোবাসাই হচ্ছে পুর্ণতা, তার যা আকাঙ্কা সে তো দরিদ্রের কাঙালপনা নয়। দেবতা যখন তাঁর ভক্তকে ভালোবাসেন তখনই আসেন ভক্তের দ্বারে ভিক্ষা চাইতে।- রত্নমালা আনবি যবে মাল্য-বদল তখন হবে পাতবি কি তোর দেবীর আসন শূন্য ধুলায় পথের ধারে? সেইজন্যেই তো সমপ্রতি দেবীকে একটু হিসেব করে ঘরে ঢুকতে বলেছিলুম। পাতবার কিছুই নেই তো পাতব কী? এই ভিজে খবরের কাগজগুলো? আজকাল সম্পাদকি কালির দাগকে সব চেয়ে ভয় করি। কবি বলেছেন, ডাকবার মানুষকে ডাকি যখন জীবনের পেয়ালা উছলে পড়ে, তাকে তৃষ্ণার শরিক হতে ডাকি নে।- পুষ্প উদার চৈত্রবনে বক্ষে ধরিস নিত্য-ধনে লক্ষ শিখায় জ্বলবে যখন দীপ্ত প্রদীপ অন্ধাকার। মাসিদের কোলে জীবনের আরম্ভেই মানুষের প্রথম তপস্যা দারিদ্র্যের, নগ্ন সন্নাসীর স্নেহসাধনা। এই কুটিরে তারই কঠোর আয়োজন। আমি তো ঠিক করে রেখেছি, এই কুটিরের নাম নাম দেব মাসতুতো বাংলো।’ ‘ বাবা, জীবনের দ্বিতীয় তাপস্যা ঐশ্বর্যের , দেবীকে বাঁ পাশে নিয়ে প্রেমসাধনা। এ কুটিরেও তোমার সে সাধনা ভিজে কাগজে চাপা পড়বে না। ‘বর পাই নি’ বলে নিজেকে ভোলাচ্ছ? মনে মনে নিশ্চয়ই জান, পেয়েছ।’ এই বলে লাবণ্যকে অমিতর পাশে দাঁড় করিয়ে তার ডান হাত অমিতর ডান হাতের উপর রাখলেন। লাবণ্যের গলা থেকে সোনার হারগাছি খুলে তাই দিয়ে দুজনের হাতে বেঁধে বললেন, ‘তোমাদের মিলন অক্ষয় হোক।’ অমিত লাবণ্য দুজনে মিলে যোগমায়ার পায়ের ধুলো নিয়ে প্রণাম করলে। তিনি বললেন, ‘ তোমরা একটু বোসো, আমি বাগান থেকে কিছু ফুল নিয়ে আসি গে।’ ব’লে গাড়ি করে ফুল আনতে গেলেন। অনেকক্ষণ দুজনে খাটিয়াটার উপরে পাশাপাশি চুপ করে বসে রইল। এক সময়ে অমিতর দিকে মুখ তুলে লাবণ্য মৃদুস্বরে বললে, ‘আজ তুমি সমস- দিন গেলে না কেন?’ অমিত উত্তর দিলে, ‘কারণটা এত বেশি তুচ্ছ যে আজকের দিনে সে কথাটা মুখে আনতে সাহসের দরকার। ইতিহাসে কোনোখানে লেখে না যে, হাতের কাছে বর্ষাতি ছিল না ব’লে বাদলের দিনে প্রেমিক তার প্রিয়ার কাছে যাওয়া মুলতবি রেখেছে; বরঞ্চ লেখা আছে সাঁতার দিযে অগাধ জল পার হওয়ার কথা। কিন’ সেটা অন-রের ইতিহাস, সেখানকার সমুদ্রে আমিও কি সাঁতার কাটছি নে ভাবছ? সে অকুল কোনোকালে কি পার হব?- ঋড়ৎ বি ধৎব নড়ঁহফ যিবৎব সধৎরহবৎ যধং হড়ঃ ুবঃ ফধৎবফ ঃড় মড়, অহফ বি রিষষ ৎরংশ ঃযব ংযরঢ়, ড়ঁৎংবষাবং ধহফ ধষষ. আমরা যাব যেখানে কোনো যায় নি নেয়ে সাহস করি। ডুবি যদি তো ডুবি-না কেন। ডুবুক সবি, ডুবুক তরী বন্যা, আমার জন্যে আজ তুমি অপেক্ষা করে ছিলে?’ ’হাঁ মিতা, বৃষ্টির শব্দে সমস- দিন যেন তোমার পায়ের শব্দ শুনেছি। মনে হয়েছে, কত অসম্ভব দুরে থেকে যে আসছ তার ঠিক নেই। শেষকালে তো এসে পৌঁছলে আমার জীবনে।’ ‘ বন্যা, আমার জীবনের মাঝখানটিতে ছিল এতকাল তোমাকে- না জানার একটা প্রকান্ড কালো গর্ত। ঐখানটা ছিল সব চেয়ে কুশ্রী। আজ সেটা কানা ছাপিয়ে ভরে উঠল-তারই উপরে আলো ঝলমলকরে, সমস- আকাশের ছাষা পড়ে, আজ সেই খানটাই হয়েছে সব চেয়ে সুন্দর। এই যে আমি ক্রমাগতই কথা কয়ে যাচ্ছি, এ হচ্ছে ঐ পরিপুর্ণ প্রাণসরোবরের তরঙ্গধ্বনী; একে থামায় কে?’ ‘মিতা, তুমি আজ সমস- দিন কী করছিলে?’ ‘ মনের মাঝখানটাতে তুমি ছিলে, একেবারে নিস-ব্ধ। তোমাকে কিছু বলতে চাচ্ছিলুম, কোথায় সেই কথা আকাশ থেকে বৃষ্টি পড়ছে আর আমি কেবইল বলেছি, কথা দাও, কথা দাও। ঙ যিধঃ রং ঃযরং? গুংঃবৎরড়ঁং ধহফ ঁহপধঢ়ঃঁৎধনষব নষরংং ঞযধঃ ও যধাব শহড়হি, ুবঃ ংববসং ঃড় নব ঝরসঢ়ষব ধং নৎবধঃয ধহফ বধংয ধং ধ ংসরষব, অহফ ড়ষফবৎ ঃযধহ ঃযব বধৎঃয. একি রহস্য, একি আনন্দরাশি! জেনেছি তাহারে, পাই নি তবুও পেয়ে। তবু সে সহজে প্রাণে উঠে নিশ্বাসি, তবু সে সরল যেন রে সরল হাসি- পুরোনো সে যেন এই ধরনীর চেয়ে। বসে বসে ঐ করি। পরের কথাকে নিজের কথা করে তুলি। সুর দিতে পারতুম যদি তবে সুর লাগিয়ে বিদ্যাপতির বর্ষার গানটাকে সম্পূর্ণ আত্মসাঃ করতুম- বিদ্যাপতি কহে, কৈসে গোঙায়বি হরি বিনে দিন রাতিয়া! যাকে না হলে চলে না তাকে না পেয়ে কী করে দিনের পর দিন কাটবে, ঠিক এই কথাটার সুর পাই কোথায়? উপরে চেয়ে কখনো বলি ‘কথা দাও’ কখনো বলি‘ সুর দাও’। কথা নিয়ে সুর নিয়ে দেবতা নেমেও আসেন, কিন’ পথের মধ্যে মানুষ ভুল করেন, খামকা আর-কাউকে দিয়ে বসে- হয়তো বা তোমাদের ঐ বরি ঠাকুরকে।’ লাবণ্য হেসে বললে,‘ রবি ঠাকুরকে যারা ভালোবাসে তারাও তোমার মতো এত বার বার করে তাঁকে স্মরণ করে না।’ ‘বন্যা, আজ আমি বড়ো বেশি বকছি, না? আমার মধ্যে বকুনির মনসুন নেমেছে। ওয়েদার- রিপোর্ট যদি রাখ তো দেখবে এক এক দিন কত ইঞ্চি পাগলামি তার ঠিকানা নেই। কোলকাতায় যদি থাকতুম তোমাকে নিয়ে টায়ার ফাটাতে ফাটাতে মোটরে করে একেবারে মোরাদাবাদে দিতুম দৌড়। যদি জিজ্ঞাসা করতে মোরাদাবাদে কেন, তার কোনোই কারণ দেখাতে পারতুম না। বান যখন আসে তখন সে বকে, ছোটে, সময়টাকে হাসতে হাসতে ফেনার মতো ভাসিয়ে নিয়ে যায়।’ এমন সময় ডালিতে ভরে যোগামায়া সূর্যমুখী ফুল আনলেন। বললেন’ ‘মা লাবণ্য, এই ফুল দিয়ে তুমি ওকে প্রণাম করো।’ এটা আর কিছু নয়, একটা অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে প্রাণের ভিতরকার জিনিসকে বাইরে শরীর দেবার মেয়েলি চেষ্টা। দেহকে বানিয়ে তোলবার আকাঙ্খা ওদের রক্তে মাংসে। আজ কোনো-এক সময়ে অমিত লাবণ্যকে কানে কানে বললে, ‘বন্যা, একটি আংটি তোমাকে পরাতে চাই।’ লাবণ্য বললে, ‘কী দরকার মিতা!’ ‘তুমি যে আমাকে তোমার এই হাতখানি দিয়েছ সে কতখানি দেওয়া তা ভেবে শেষ করতে পারি নে। কবিরা প্রিয়ার মুখ নিয়েই যত কথা কয়েছে। কিন’ হাতের মধ্যে প্রাণের কত ইশারা; ভালোবাসার যত-কিছু আদর, যত-কিছু সেবা, হৃদয়ের যত দরদ, যত অনির্বাচনীয় ভাষা, সব যে ঐ হাতে। আংটি তোমার আঙুলটিকে জড়িয়ে থাকবে আমার মুখের ছোটো একটি কথার মতো; সে কথাটি শুধু এই’ পেয়েছি’। আমার এই কথাটি সোনার ভাষায়, মানিকের ভাষায় তোমার হাতে থেকে যাক- না। লাবণ্য বললে, ‘ আচ্ছা, তাই থাক।’ ‘ কোলকাতা থেকে আনতে দেব, বলো কোন্‌ পাথর তুমি ভালোবাস।’ ‘ আমি কোনো পাথর চাই নে, একটি মাত্র মুক্তো থাকলেই হবে।’ ‘ আচ্ছা, সেই ভালো। আমিও মুক্তো ভালোবাসি।’ Your Ad Here শেষের কবিতা – অধ্যায় ১১ ১১ মিলনতত্ত্ব ঠিক হয়ে গেল আগামী অঘ্রান মাসে এদের বিয়ে। যোগমায়া কোলকাতায় গিয়ে সমস- আয়োজন করবেন। লাবণ্য অমিতকে বললে, ‘ তোমার কোলকাতায় ফেরবার দিন অনেক কাল হল পেরিয়ে গেছে। অনিশ্চিতের মধ্যে বাঁধা পড়ে তোমার দিন কেটে যাচ্ছিল। এখন ছুটি নিঃসংশয়ে চলে যাও। বিয়ের ‘ এমন কড়া শাসন কেন?’ ‘ সেদিন যে সহজ আনন্দের কথা বলেছিলে তাকে সহজ রাখবার জন্যে।’ ‘ এটা একেবারে গভীর জ্ঞানের কথা। সেদিন তোমাকে কবি বলে সন্দেহ করেছিলুম, আজ সন্দেহ করছি ফিলজফার বলে। চমৎকার বলেছ। সহজকে সহজ রাখতে হলে শক্ত হতে হয়। ছন্দকে সহজ করতে চাও তো যতিকে ঠিক জায়গায় কষে আঁটতে হবে। লোভ বেশি, তাই জীবনের কাব্যে কোথাও যতি দিতে মন সরে না, ছন্দ ভেঙে গিয়ে জীবনটা হয় গীতহীন বন্ধন। আচ্ছা, কালই চলে যাব, একবারে হঠাৎ এই ভরা দিনগুলোর মাঝখানে। মনে হবে, যেন মেঘনাদবধ- কাব্যের সেই চমকে-থেমে-যাওয়া লাইনটা- চলি যবে গেলা যমপুরে অকালে! শিলঙ থেকে আমিই না হয় চললুম, কিন’ পাঁজি থেকে অঘ্রান মাস তো ফস করে পালাবে না। কোলকাতায় গিয়ে কী করব জান?’ ‘কী করবে।’ ‘ মাসিমা যতক্ষণ করবেন বিয়ের দিনের ব্যবস’া ততক্ষণ আমাকে করতে হবে তার পরের দিনগুলোর আয়োজন। লোকে ভুলে যায় দাম্পত্যটা একটা আর্ট, প্রতিদিন ওকে নুতন করে সৃষ্টি করা চাই। মনে আছে বন্যা, রঘুবংশে অজ মহারাজা ইন্দুমতীর কী বর্ণনা করেছিলেন? ‘ লাবন্য বললে, প্রিয়শিষ্যা ললিতে কলাবিধৌ।’ অমিত বললে, ‘ সেই ললিতকলা বিধিটা দাম্পত্যেরই। অধিকাংশ বর্বর বিয়েটাকেই মনে করে মিলন, সেইজন্যে তার পর থেকে মিলনটাকে এত অবহেলা।’ ‘ মিলনের আর্ট তোমার মনে কিরকম আছে বুঝিয়ে দাও। যদি আমাকে শিষ্যা করতে চাও আজই তার প্রথম পাঠ শুরু হোক।’ ‘ আচ্ছা তবে শোন। ইচ্ছাকৃত বাধা দিয়েই কবি ছন্দের সৃষ্টি করে। মিলনকেও সুন্দর করতে হয় ইচ্ছাকৃত বাধায়। চাইলেই পাওয়া যায়, দামি জিনিসকে এত সস-া করা নিজেকেই ঠকানো। কেনান, শক্ত করে দাম দেওয়ার আনন্দটা বড়ো কম নয়।’ ‘ দামের হিসাবটা শুনি।’ ‘ রোসো, তার আগে আমার মনে যে ছবিটা আছে বলি। গঙ্গার ধার, বাগানটা ডায়মন্ড্‌হারবারের ঐদিকটাতে। ছোটো একটি ষ্টীম লঞ্চ্‌ ক’রে ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে কোলকাতায় যাতায়াত করা যায়।’ ‘ আবার কোলকাতায় কী দরকার পড়ল? ‘ এখন কোন দরকার নেই সে কথা জান। যাই বটে বার লাইব্রেরিতে-ব্যাবসা করি নে, দাবা খেলি। অ্যাটর্নিরা বুঝে নিয়েছে, কাজে গরজ নেই, তাই মনে নেই। কোনো আপসের মকদ্দমা হলে তার ব্রীফ আমাকে দেয়, তার বেশি আর কিছুই দেয় না। কিন’ বিয়ের পরেই দেখিয়ে দেব কাজ কাকে বলে-জীবিকার দরকারে নয়, জীবনের দরকারে। আমের মাঝখানটাতে থাকে আঠি, সেটা মিষ্টিও নয়, নরম ও নয়, খাদ্যও নয়; কিন’ ঐ শক্তটাই সমস- আমের আশ্রয়, ঐটেতেই সে আকার পায়। কোলকাতার পাথুরে আঁঠিটাকে কিসের জন্য দরকার বুঝেছ তো? মধুরের মাঝখানে একটা কঠিনকে রাখবার জন্যে।’ ‘ বুঝেছি। তা হলে দরকার তো আমারও আছে। আমাকেও কোলকাতায় যেতে হবে-দশটা- পাঁচটা।’ ‘ দোষ কী? কিন’ পাড়া-বেড়াতে নয়, কাজ করতে।’ ‘ কিসের কাজ বলো। বিনা মাইনেয়?’ ‘ না না, বিনা মাইনের কাজ কাজও নয় ছুটিও নয়, বারোআনা ফাঁকি। ইচ্ছে করলেই তুমি মেয়ে- কলেজে প্রোফেসারি নিতে পারবে।’ ‘ আচ্ছা, ইচ্ছে করব। তর পর?’ ‘ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, গঙ্গার ধার; পাড়ির নীচ তলা থেকে উঠেছে বুঝি নামা অতি পুরোনো বটগাছ। ধনপতি যখন গঙ্গা বেয়ে সিংহলে যাচ্ছিল তখন হয়তো এই বটগাছে নৌকা বেঁধে গাছতলায রান্না চড়িয়েছিল। ওরই দক্ষিণ ধারে ছ্যাৎলা-পড়া বাধানো ঘাট, অনেকখানি ফাটল ধরা, কিছু কিছু ধসে যাওয়া। সেই ঘাটে সবুজে সাদায় রঙ-করা আমাদের ছিপছিপে নৌকাখানি তারই নীল নিশানে সাদা অক্ষরে নাম লেখা। কী নাম বলে দাও তুমি।’ ‘ বলব? মিতালী!’ ‘ ঠিক নামটি হয়েছে, মিতালী। আমি ভেবেছিলুম সাগরী, মনে একটু গর্বও হয়েছিল; কিন’ তোমার কাছে হার মানতে হল। বাগানের মাঝখান দিয়ে সরু একটি খাড়ি চলে গেছে, গঙ্গার হৃৎস্পন্দন বয়ে। তার ও পরে তোমার বাড়ি, এ পারে আমার।’ ‘রোজই কি সাঁতার দিয়ে পার হবে, আজ জানালায় আমার আলো জ্বালিয়ে রাখব?’ ‘দেব সাঁতার মনে মনে, একটা কাঠের সাঁকোর উপর দিয়ে। তোমার বাড়িটির নাম মানসী, আমার বাড়ির একটা নাম তোমাকে দিতে হবে।’ ‘দীপক।’ ‘ঠিক নামটি হয়েছে। নামের উপযুক্ত একটি দীপ আমার বাড়ির চুড়োয় বসিয়ে দেব, মিলনের সন্ধেবেলায় তাতে জ্বলবে লাল আলো, আর বিচ্ছেদের রাতে নীল। কোলকাতা থেকে ফিরে এসে রোজ তোমার কাছ থেকে একটি চিঠি আশার করব। এমন হওয়া চাই, সে চিঠি পেতেও পারি, না পেতেও পারি। সন্ধে আটটার মধ্যে যদি পাই তবে হতবিধিকে অভিসম্পাত দিয়ে বারট্রান্ড্‌ রাসেলের লজিক পড়বার চেষ্টা করব। আমাদের নিয়ম হচ্ছে, অনাহুত তোমার বাড়ীতে কোনোমতেই যেতে পারব না।’ ‘ আর তোমার বাড়িতে আমি?’ ‘ ঠিক এক নিয়ম হলেই ভালো হয়, কিন’ মাঝে মাঝে নিয়মের ব্যকিক্রম হলে সেটা অসহ্য হবে না।’ ‘ নিয়মের ব্যতিক্রমটাই যদি নিয়ম না হয়ে ওঠে তা হলে তোমার বাড়িটার দশা কী হবে ভেবে দেখে বরঞ্চ আমি বুরকা পরে যাব।’ ‘ তা হোক, কিন’ আমার নিমন্ত্রণ-চিঠি চাই। সে চিঠিতে আর-কিছু থাকবার দরকার নেই, কেবল কোনো-একটা কবিতা থেকে দুটি-চারটি লাইন মাত্র।’ ‘ আর আমার নিমন্ত্রণ বুঝি বন্ধ? আমি একঘরে?’ ‘ তোমার নিমন্ত্রণ মাসে একদিন, পুণিমার রাতে; চোদ্দটা তিথির খন্ডতা যেদিন চরম পূর্ণ হয়ে উঠবে।’ ‘ এইবার তোমার প্রিয়শিষ্যাকে একটি চিঠির নমুনা দাও।’ ‘ আচ্ছা বেশ।’ পকেট থেকে একটা নোটবই বের করে তার পাতা ছিঁড়ে লিখলে- ইষড় ি মবহঃষু ড়াবৎ সু মধৎফবহ ডরহফ ড়ভ ঃযব ংড়ঁঃযবৎহ ংবধ, ওহ ঃযব যড়ঁৎ সু ষড়াব পড়সবঃয অহফ পধষষবঃয সব. চুমিয়ে যেয়ো তুমি আমার বনভুমি দখিন-সাগরের সমীরণ, যে শুভখনে মম আসিবে প্রিয়তম- ডাকিবে নাম ধ’রে অকারণ। লাবণ্য কাগজখানা ফিরিয়ে দিলে না। অমিত বললে, ‘ এবারে তোমার চিঠির নমুনা দাও, দেখি তোমার শিক্ষা কত দুরে এগোল।’ লাবণ্য একটা টুকরো কাগজে লিখতে যাচ্ছিল। অমিত বললে,‘না, আমার এই নোটবইয়ে লেখো।’ লাবণ্য লিখে দিলে – মিতা, ‘মসি মম জীবনং, ‘ মসি মম ভূষনং, ‘ মসি মম ভবজলধিরত্মম্‌। অমিত বইটাকে পকেটে পুরে বললে, ‘আশ্চর্য এই, আমি লিখেছি মেয়ের মুখের কথা, তুমি লিখেছ পুরুষের। কিছুই অসংগত হয় নি। শিমুলকাঠই হোক আর বকুল কাঠই হোক, যখন জ্বলে তখন আগুনের চেহারাটা একই।’ লাবণ্য বললে, ‘নিমন্ত্রণ তো করা গেল, তার পরে?’ অমিত বললে, ‘ সন্ধ্যাতারা উঠেছে, জোয়ার এসেছে গঙ্গায়, হাওয়া উঠল ঝির্‌ ঝির্‌ করে ঝাউগাছ গুলোর সার বেয়ে, বুড়ো বটগাছটার শিকড়ে শিকড়ে উঠল স্রোতের ছল্‌ছলানি। তোমার বাড়ির পিছনে পদ্মদিঘি, সেইখানে খিড়কির নির্জন ঘাটে গা ধুয়ে চুল বেঁধেছে। তোমার এক-একদিন এক-এক রঙের কাপড়, ভাবতে ভাবতে যার আজকে সন্ধেবেলার রঙটা কী? মিলনের জায়গার ও ঠিক নেই, কোনোদিন শান-বাধানো চাঁপতলায়, কোনদিন বাড়ির ছাতে, কোনদিন গঙ্গার ধারের চাতালে। আমি গঙ্গায় স্নান সেরে সাদা মলমলের ধুতি আর চাদর পরব, পায়ে থাকবে হাতির দাঁতের কাজ করা খড়ম। গিয়ে দেখব, গালচে বিছিয়ে বসেছ। সামনে রুপোর রেকাবিতে মোটা গোড়ে মালা, চন্দনের বাটিতে চন্দন, এক কোণে জ্বলছে ধুপ।…… পূজোর সময় অন-ত দু মাসের জন্যে দুজনে বেড়াতে বেরোব। কিন’ দুজনে দু জায়গায়। তুমি যদি যাও পর্বতে আমি যাব সমুদ্রে। এই তো আমার দাম্পত্য দ্বৈরাজ্যের নিয়মাবলী তোমার কাছে দাখিল করা গেল! এখন তোমার কী মত? ‘মেনে নিতে রাজি আছি।’ ‘ মেনে নেওয়া, আর মনে নেওয়া, এই দুইয়ের যে তফাত আছে বন্যা।’ ‘ তোমার যাতে প্রয়োজন আমার তাতে প্রয়োজন না’ও যদি থাকে, তবু আপত্তি করব না।’ ‘ প্রয়োজন নেই তোমার?’ ‘ না, নেই। তুমি আমার যতই কাছে থাক তবু আমার থেকে তুমি অনেক দুরে। কোনো নিয়ম দিয়ে সেই দুরত্বটুকু বজায় রাখা আমার পক্ষে বাহুল্য। কিন’ আমি জানি, আমার মধ্যে এমন কিছুই নেই যা তোমার কাছের দৃষ্টিকে বিনা লজ্জায় সইতে পারবে, সেই জন্যে দাম্পত্যে দুই পারে দুই মহল করে দেওয়া আমার পক্ষে নিরাপদ।’ অমিত চৌকি থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললে, ‘ তোমার কাছে আমি হার মানতে পারব না বন্যা, যাক গে আমার বাগানটা। কোলকাতার বাইরে এক পা নড়ব না। নিরঞ্জনদের আপিসের উপরের তলায় পঁচাত্তর টাকা দিয়ে একটা ঘর ভাড়া নেব। সেইখানে থাকবে তুমি, আর থাকব আমি। চিদাকাশে কাছে-দুরে ভেদ নেই। সাড়ে তিন হাত চওড়া বিছানায় বাঁ পাশে তোমার মহল মানসী, ডান পাশে আমার মহল দীপক। ঘরের পুব দেওয়ালে একখানা আয়নাওয়ালা দেরাজ, তাতেই তোমারও মুখ দেখা আর আমারও। পশ্চিম দিকে থাকবে বইয়ের আলমারি, পিঠ দিয়ে সেটা রোদ্‌দুর ঠেকাবে আর সামনের দিকে সেটাতে থাকবে দুটি পাঠকের একটিমাত্র সারক্যুলেটিং লাইব্রেরি। ঘরের উত্তর দিকটাতে একখানি সোফা, তারই বাঁ পাশে একটু জায়গা খালি রেখে আমি বসব এক প্রানে-, তোমার কাপড়ের আলনার আড়ালে তুমি দাঁড়াবে-দু হাত তফাতে। নিমন্ত্রণের চিঠিখানা উপরের দিকে তুলে ধরব কম্পিত হসে-, তাতে লেখা থাকবে- ছাদের উপরে বহিয়ো নীরবে ওগো দক্ষিণ হাওয়া, প্রেয়সীর সাথে যে নিমেষে হবে চারি চক্ষুতে চাওয়া। এটা কি খারাপ শোনাচ্ছে বন্যা?’ ‘ কিছু না মিতা। কিন’, এটা সংগ্রহ হল কোথা থেকে?’ ‘ আমার বন্ধু নীলমাধবের খাতা থেকে। তার ভাবী বধু তখন অনিশ্চিত ছিল। তাকে উদ্দেশ করে ঐ ইংরেজী কবিতাটাকে কোলকাতাই ছাঁচে ঢালাই করেছিল, আমিও সঙ্গে যোগ দিয়েছিলুম। ইকনমিক্‌সে এম.এ পাস করে পনেরো হাজার টাকা নগদ পণ আর আশি ভরি গয়না-সমেত নববধুকে লোকটা ঘরে আনলে, চার চক্ষে চাওয়াও হল, দক্ষিনে বাতাসও বয়, কিন’ ঐ কবিতাটাকে আর ব্যবহার করতে পারলে না। এখন তার অপর শরিককে কাব্যটির সর্বস্বত্ত্ব সমর্পণ করতে বাধবে না।’ ‘ তোমারও ছাদে দক্ষিণে বাতাস বইবে, কিন’ তোমার নববধু কি চিরদিইন নববধু থাকবে?’ টেবিলে প্রবল চাপড় দিতে দিতে উচ্চেঃস্বরে অমিত বললে, ‘ থাকবে, থাকবে, থাকবে। যোগমায়া পাশের ঘর থেকে তাড়াতাড়ি এসে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী থাকবে অমিত? আমার টেবিলটা বোধ হচ্ছে থাকবে না।’ ‘ জগতে যা-কিছু টেকসই সবই থাকবে। সংসারে নববধু দুর্লভ কিন’ লাখের মধ্যে একটি যদি দৈবাৎ পাওয়া যায় সে চিরদিনই থাকবে নববধূ। ‘ একটা দৃষ্টান- দেখাও দেখি।’ ‘ একদিন সময় আসবে, দেখাবে।’ ‘ বোধ হচ্ছে তার কিছু দেরি আছে, ততক্ষণ খেতে চলো।’ Your Ad Here শেষের কবিতা – অধ্যায় ১২ ১২ শেষ সন্ধ্যা আহার শেষ হলে অমিত বললে, কাল কোলকাতায় যাচ্ছি মাসিমা। আমার আত্মীয়স্বজন সবাই সন্দেহ করছে আমি খাসিয়া হয়ে গেছি।’ ‘আত্মীয়স্বজনরা কি জানে কথায় কথায় তোমার এত বদল সম্ভব?’ ‘ খুব জানে, নইলে আত্মীয়স্বজন কিসের? তাই ব’লে কথায় কথায় নয়, আর খাসিয়া হওয়া নয়; যে বদল আজ আমার হল এ কি জাত-বদল, এ যে যুগ-বদল, তার মাঝখানে একটা কল্পান-। প্রজাপতি জেগে উঠেছেন আমার মধ্যে এক নতুন সৃষ্টিতে। মাসিমা, অনমুতি দাও, লাবন্যকে নিয়ে আজ একবার বেড়িয়ে আসি। যাবার আগে শিলঙ পাহাড়কে আমাদের যুগল প্রনাম জানিয়ে যেতে চাই।’ যোগমায়া সম্মতি দিলেন। কিছু দুরে যেতে যেতে দুজনের হাত মিলে গেল, ওরা কাছে কাছে এল ঘেঁষে। নির্জন পথের ধারে নীচের দিকে চলেছে ঘন বন। সেই বনের একটা জায়গায় পড়েছে ফাঁক, আকাশ সেখানে পাহাড়ের নজরবন্দি থেকে একটুখানি ছুটি পেয়েছে; তার অঞ্জলি ভরিয়ে নিয়েছে অস- সূর্যের শেষ আভায়। সেই খানে পশ্চিমের দিকে মুখ করে দুজনে দাঁড়াল। অমিত লাবণ্যর মাথা বুকে টেনে নিয়ে তার উপরে তুলে ধরলে। লাবণ্যের চোখ অর্ধেক বোজা, কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। আকাশে সোনার রঙের উপর চুনি গলানো পান্না-গলানো আলোর আভাসগুলি মিলিয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে; মাঝে মাঝে পাতলা মেঘের ফাঁকে ফাঁকে সুগভীর নির্মল নীল, মনে হয় তার ভিতর দিয়ে যেখানে দেহ নেই শুরু অনন্দ আছে সেই অমর্তজগতের অব্যক্তধ্বনি আসছে। ধীরে ধীরে অন্ধকার হল ঘন। সেই খেলা আকাশটুকু, রাত্রিবেলায় ফুলের মতো, নানা রঙের পাপড়িগুলি বন্ধ করে দিলে। অমিতর বুকের কাছ থেকে লাবণ্য মৃদুস্বরে বললে, ‘চলো এবার।’ কেমন তার মনে হল, এইখানে শেষ করা ভালো। অমিত সেটা বুঝলে, কিছু বললে না। লাবণ্যের মুখ বুকের উপর একবার চেপে ধরে ফেরবার পথে খুব ধীরে ধীরে চলল। বললে, ‘কাল সকালেই আমাকে ছাড়তে হবে, তার আগে আর দেখা করতে আসব না।’ ‘ কেন আসবে না।’ ‘ আজ ঠিক জায়গায় আমাদের শিলঙ পাহাড়ের অধ্যায়টি এসে থামল-ইতি প্রথমঃ সর্গঃ আমাদের সয়ে বয়ে স্বর্গ।’ লাবণ্য কিছু বললে না, অমিতর হাত ধরে চলল। বুকের ভিতর আনন্দ, আর তারই সঙ্গে সঙ্গে একটা কান্না স-ব্ধ হয়ে আছে। মনে হল, জীবনে কোনোদিন এমন নিবিড় করে অভাবনীয়কে এত কাছে পাওয়া যাবে না। পরমক্ষণে শুভদৃষ্টি হল, এর পরে আর কি বাসরঘর আছে? রইল কেবল মিলন আর বিদায় একত্র মিশিয়ে একটি শিষ প্রণাম। ভারি ইচ্ছে করতে লাগল অমিতকে এখনই সেই প্রণামটি করে বলে, ‘তুমি আমাকে ধণ্য করেছ।’ কিন’ সে আর হল না। বাসার কাছাকাছি আসতেই অমিত বললে, ‘বন্যা আজ তোমার শেষ কথাটি একটি কবিতায় বলো, তা হলে সেটা মনে করে নিয়ে যাওয়া সহজ হবে। তোমার নিজের যা মনে আছে এমন একটা কিছু আমাকে শুনিয়ে দাও।’ লাবণ্য একটু খানি ভেবে আবৃত্তি করলে- ‘ তোমারে দিই নি সুখ, মুক্তির নৈবেদ্য গেনু রাখি রজনীর শুভ্র অবসানে। কিছু আর নাই বাকি, নাইকো প্রার্থনা, নাই প্রতি মুহুর্তের দৈন্যরাশি, নাই অভিমান, নাই দীন কান্না, নাই গর্বহাসি, নাই পিছু-ফিরে দেখা। শুধু সে মুক্তির ডালখানি ভরিয়া দিলাম আজি আমার মহৎ মৃত্যু আনি।’ ‘বন্যা, বড়ো অন্যায় করলে। আজকের দিনে তোমার মুখে বলাবার কথা এ নয়, কিছুতেই নয়। কেন এটা তোমার মনে এল? তোমার এ কবিতা এখনই ফিরিয়ে নাও।’ ‘ ভয় কিসের মিতা? এই আগুনে-পোড়া প্রেম এ সুখের দাবি করে না, এ নিজে মুক্ত বলেই মুক্তি দেয়, এর পিছনে ক্লানি- আসে না, ম্লানতা আসে না; এর চেয়ে আর কিছু কি দেবার আছে? ‘ কিন’ আমি জানতে চাই, এ কবিতা তুমি পেলে কোথায়?’ ‘ রবি ঠাকুরের।’ ‘ তার তো কোনো বইয়ে এটা দেখি নি।’ ‘ বইয়ে রেরোয় নি।’ ‘ তবে পেলে কী করে?’ ‘ একটি ছেলে ছিল, সে আমার বাবাকে গুরু বলে বক্তি করত, বাবা দিয়েছিলেন তাকে তার জ্ঞানের খাদ্য। এ দিকে তার হৃদয়টিও ছিল তাপস। সময় পেলেই সে যেত রবি ঠাকুরের কাছে, তাঁর খাতা থেকে মুষ্টিভিক্ষা করে আনত।’ ‘ আর নিয়ে এসে তোমার পায়ে দিত।’ ‘ সে সাহস তার ছিল না। কোথাও রেখে দিত, যদি আমার দৃষ্টিতে পড়ে, যদি আমি তুলে নিই।’ ‘ তাকে দয়া করেছ?’ ‘ করবার অবকাশ হল না; মনে মনে প্রার্থনা করি-ঈশ্বর যেন তাকে দয়া করেন।’ ‘ যে কবিতাটি আজ তুমি পড়লে, বেশ বুঝতে পারছি এটা সেই হতভাগারই মনের কথা।’ ‘ হাঁ তারই কথা বৈকি।’ ‘ তবে তোমার কেন আজ ওটা মনে পড়ল?’ ‘ কেমন করে বলব? ঐ কবিতাটির সঙ্গে আর-এক টুকরো কবিতা ছিল, সেটাও আজ আমার কেন মনে পড়ছে ঠিক বলতে পারি নে- সুন্দর, তুমি চক্ষু ভরিয়া এনেছ অশ্রুজল। এনেছ তোমার বক্ষে ধরিয় দুঃসহ হোমানল। দুঃখ যে তায় উজ্জ্বল হয়ে উঠে, মুগ্ধ প্রাণের আবেশবন্ধ টুটে, এ তাপে শ্বসিয়া উঠে বিকশিয়া বিচ্ছেদশতদল।’ অমিত লাবণ্যের হাত চেপে ধরে বললে, ‘ বন্যা, সে ছেলেটা আজ আমাদের মাঝখানে কেন এসে পড়ল? ঈর্ষা করতে আমি ঘৃণা করি, এ আমার ঈর্ষা নয়, কিন’ কেমন একটা বয় আসছে মনে। বলো, তার দেওয়া ঐ কবিতাগুলো আজই কেন তোমার এমন করে মনে পড়ে গেল?’ ‘ একদিন সে যখন আমাদের বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল তার পরে যেখানে বসে সে লিখত সেই ডেক্সে এই কবিতা দুটি পেয়েছি। এর সঙ্গে রবি ঠাকুরের আরো অনেক অপ্রকাশিত কবিতা, প্রায় এক খাতা ভরা। আজ তোমার কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছি, হয়তো সেইজন্যেই বিদায়ের কবিতা মনে এল।’ ‘ সে বিদায় আর এ বিদায় কি একই?’ ‘ কেমন করে বলব? কিন’, এ তর্কের তো কোনো দরকার নেই। যে কবিতা আমার ভালো লেগেছে তাই তোমাকে শুনিয়েছে, হয়তো এ ছাড়া আর কোনো কারণ এর মধ্যে নেই।’ ‘ বন্যা, রবি ঠাকুরের লেখা যতক্ষণ না লোকে একেবারে ভুলে যাবে ততক্ষণ ওর ভালো লেখা সত্য করে ফুটে উঠবে না। সেইজন্যে ওর কবিতা আমি ব্যবহারই করি নে। দলের লোকের ভালো লাগাটা কুয়াশার মতো, যা আকাশের উপর ভিজে হাত লাগিয়ে লাগিয়ে তার আলোটাকে ময়লা করে ফেলে।’ ‘দেখো মিতা, মেয়েদের ভালো-লাগা তার আদরের জিনিসকে আপন অন্দর মহলে একলা নিজেরই করে রাখে, ভিড়ের লোকের কোনো খবরই রাখে না। সে যত দাম দিতে পারে সব দিয়ে ফেলে, অন্য পাঁচজনের সঙ্গে মিলিয়ে বাজার যাচাই করতে তার মন নেই।’ ‘ তা হলে আমারও আশা আছে বন্যা। আমার বাজার-দরের ছোট্ট একটা ছাপ লুকিয়ে ফেলে তোমার আপন দরের মস- একটা মার্কা নিয়ে বুক ফুলিয়ে বেড়াব।’ ‘ আমাদের বাড়ি কাছে এসে পড়ল মিতা। এবার তোমার মুখে তোমার পথশেষের কবিতাটা শুনে নিই।’ ‘ রাগ করো না বন্যা আমি কিন’ রবি ঠাকুরের কবিতা আওড়াতে পারব না।’ ‘ রাগ করব কেন?’ ‘ আমি একটি লেখককে আবিস্কার করেছি, তার স্টাইল-’ ‘ তার কথা তোমার কাছে বরাবরই শুনতে পাই। কোলকাতায় লিখে দিয়েছি তার বই পাঠিয়ে দেবার জন্যে।’ ‘ সর্বনাশ! তার বই! মে লোকটার অন্য অনেক দোষ আছে, কিন’ কখনো বই ছাপাতে দেয় না। তার পরিচয় আমার কাছ থেকেই তোমাকে ক্রমে ক্রমে পেতে হবে। নইলে হয়তো-’ ‘ ভয় কোরো না মিতা, তুমি তাকে যে ভাবে বোঝ আমিও তাকে সেই ভাবেই বুঝে নেব এমন ভরসা আমার আছে। আমারই জিত থাকবে।’ ‘কেন?’ ‘ আমার ভালো-লাগায় যা পাই সেও আমার, আর তোমার ভালো লাগায় যা পাব সেও আমার হবে। আমার নেবার অঞ্জলি হবে দুজনের মনকে মিলিয়ে। কোলকাতায় তোমার ছোটো ঘরের বইয়ের আলমারিতে এক শেলফেই দুই কবির কবিতা ধরাতে পারব। এখন তোমার কবিতাটি বলো।’ ‘ আর বলতে ইচ্ছে করছে না। মাঝকানে বডডো কতকগুলো তর্কবিতর্ক হয়ে হাওয়াটা খারাপ হয়ে গেল।’ ‘ কিচ্ছু খারাপ হয় নি, হাওয়া ঠিক আছে।’ অমিত তার কপালের চুল গুলো কপালের থেকে উপরের দিকে ঠেলে দিয়ে খুব দরদের সুর লাগিয়ে পড়ে গেল- ‘ সুন্দরী তুমি শুকতারা সুদুর শৈলশিখরানে-, শর্বরী যবে হবে সারা দর্শন দিয়ো দিকভ্রান্তে। বঝেছ বন্যা? চাঁদ ডাক দিয়েছে শুকতারাকে, সে আপনার রাত হোবার সঙ্গিনীকে চায়। নিজের রাতটার’ পরে ওর বিতৃষ্ণা হয়ে গেছে।– ধরা যেথা অন্বরে মেশে আমি আধো-জাগ্রত চন্দ্র, আঁধারের বক্ষের’ পরে আধেক আলোকরেখা- রন্ধ্র। ওর এই আধাখানা জাগা, ঐ অল্প একটুখানি আলো, আঁধারটাকে সামান্য খানিকটা আঁচড়ে দিয়েছে। এই হল ওর খেদ। এই স্বল্পতার জালে ওকে জড়িয়ে ফেলেছে, সেইটে ছিড়ে ফেলবার জন্যে ও যেন সমস- রাত্রি ঘুমোতে ঘুমোতে গুমরে উঠছে। কী আইডিয়া! গ্র্যান্ড্‌। আমার আসন রাখে পেতে নিদ্রাগহন মহাশূন্য। তন্ত্রী বাজাই স্বপনেতে, তন্দ্রা ঈষৎ করি ক্ষুন্ন। কিন’, এমন হালকা করে বাঁচার বোঝাটা যে বড্ডো বেশি; যে নদীর জল মরেছে তার মন’র স্রোতের ক্লানি-তে জঞ্জাল জম্‌ে, যে স্বল্প সে নিজেকে বইতে গিয়ে ক্লিষ্ট হয়। তাই ও বলছে- মন্দচরণে চলি পারে, যাত্রা হয়েছে মোর সাঙ্গ। সুর থেমে আসে বারে বারে, ক্লান্তিতে আমি অবশাঙ্গ। কিন’, এই ক্লানি-তেই কি ও শেষ? ওর ঢিলে তারের বীণাকে নতুন করে বাঁধবার আশা ও পেয়েছে, দিগনে-র ওপারে কার পায়ের শব্দ ও যেন শুনল।– সুন্দরী ওগো শুকতারা, রাত্রি না যেতে এসো তুর্ণ। স্বপ্নে যে বাণী হল হারা জাগরণে করো তারে পূর্ণ। উদ্ধারের আশা আছে, কানে আসছে জাগ্রত বিশ্বের বিপুল কলরব, সেই মহাপথের দুতী তার প্রদীপ হাতে করে এল বলে।– নিশীথের তল হতে তুলি লহো তারে প্রভাতের জন্য। আঁধারে নিজেরে ছিল ভুলি, আলোকে তাহারে করো ধন্য। যেখানে সুপ্তি হল লীনা, যেথা বিশ্বের মহামন্দ্র, অর্পিনু সেথা মোর বীণা আমি আধো-জাগ্রত চন্দ্র। এই হতভাগা চাঁদটা তো আমি। কাল সকালবেলা চলে যাব। কিন্তু, চলে যাওয়াকে তো শূন্য রাখতে চাই নে। তার উপরে আবির্ভাব হবে সুন্দরী শুকতারার, জাগরণের গান নিয়ে। অন্ধকার জীবনের স্বপ্নে এতদিন যা অস্পষ্ট ছিল, সুন্দরী শুকতারা তাকে প্রভাতের মধ্যে সম্পুর্ন করে দেবে। এর মদ্যে একটা আশার জোর আছে, ভাবী প্রত্যুষের একটা উজ্জ্বল গৌরব আছে। তোমার ঐ রবি ঠাকুরের কবিতার মতো মিইয়ে-পড়া হাল-ছাড়া বিলাপ নয়।’ ‘ রাগ করো কেন মিতা? রবি ঠাকুর যা পারে তার বেশি সে পারে না, এ কথা বার বার বলে লাভ কী? ‘ তোমরা সবাই মিলে তাকে নিয়ে বড়ো বেশি-’ ‘ ও কথা বোলো না মিতা। আমার ভালো লাগা আমারই তাতে যদি আর কারো সঙ্গে আমার মিল হয়, বা তোমার সঙ্গে মিল না হয়, সেটাতে কি আমার দোষ? নাহয় কথা রইল, তোমার সে পঁচাত্তর টাকার বাসায় একদিন আমার যদি জায়গা হয় তা হলে তোমার কবির লেখা আমাকে শুনিয়ো, আমার কবির লেখা তোমাকে শোনাব না।’ ‘ কথাটা অন্যায় হল যে। পরস্পর পরস্পরের জুলুম ঘাড় পেতে বহন করবে, এইজন্যেই তো বিবাহ।’ ‘ রুচির জুলুম তোমার কিছুতেই সইবে না। রুচির ভোজে তোমরা নিমন্ত্রিত ছাড়া কাউকে ঘরে ঢুকতে দাও না, আমি অতিথিকেও আদর করে বসাই।’ ‘ ভালো করলুম না তর্ক তুলে। আমাদের এখানকার এই শেষ সন্ধেবেলার সুর বিগড়ে গেল।’ ‘ একটুও না। যা-কিছু বলবার আছে সব স্পষ্ট করে বলেও যে সুরটা খাঁটি থাকে সেই আমাদের সুর। তার মধ্যে ক্ষমার অন- নেই। ‘ আজ আমার মুখের বিস্বাদ ঘোচাতেই হবে। কিন’ বাংলা কাব্যে হবে না। ইংরেজি কাব্যে আমার বিচারবুদ্ধি অনেকটা ঠান্ডা থাকে। প্রথম দেশে ফিরে এসে আমিও কিছুদিন প্রোফেসারি করেছিলুম।’ লাবণ্য হেসে বললে, ‘ আমাদের বিচারবুদ্ধি ইংরেজ-বাড়ির বুলডগের মতো ধুতির কোঁচাটা দুলছে। দেখলেই ঘেউ ঘেউ করে ওঠে। ধুতির মহলে কোনটা ভদ্র ও তার হিসেব পায় না। বরঞ্চ খানসামার তকমা দেখলে লেজ নাড়ে।’ ‘ তা মানতেই হবে। পক্ষপাত জিনিসটা স্বাভাবিক জিনিস নয়। অধিকাংশ স’লেই ওটা ফরমাশে তৈরি। ইংরেজি সাহিত্যে পক্ষপাত কানমলা খেয়ে খেয়ে ছেলেবেলা থেকে অভ্যেস হয়ে গেছে। এই অভ্যাসের জোরেই এক পক্ষকে মন্দ বলতে যেমন সাহস হয় না অন্য পক্ষকে ভালো বলতেও তেমনি সাহসের অভাব ঘটে। থাকগে আজ নিবারণ চক্রবর্তী ও না , আজ একেবারে নিছক ইংরেজি কবিতা-বিনা তর্জমায়।’ ‘ না না মিতা, তোমার ইংরেজি থাক, সেটা বাড়ি গিয়ে টেবিলে বসে হবে। আজ আজ আমাদের এই সন্ধেবেলাকার শেষ কবিতাটি নিবারণ চক্রবর্তীর হওয়াই চাই। আর-কারো নয়।’ অমিত উৎফুল্ল হয়ে বললে, ‘ জয় নিবারণ চক্রবর্তীর। এতদিনে সে হল অমর। বন্যা, তাকে আমি তোমার সভাকবি করে দেব। তুমি ছাড়া আর কারো দ্বারে সে প্রসাদ নেবে না।’ ‘ তাকে কি সে বরাবর সন’ষ্ট থাকবে?’ ‘ না থাকে তো তাকে কোন মলে বিদায় করে দেব।’ ‘ আচ্ছা, কান মলার কথা পরে সি’র করব, এখন শুনিয়ে দাও।’ অমিত আবৃত্তি করতে লাগল- ‘ কত ধৈর্য ধরি ছিলে কাছে দিবসশর্বরী! তব পদ-অঙ্কনগুলিরে কতবার দিয়ে গেছে মোর ভাগ্য-পথের ধুলিরে! আজ যবে দুরে যেতে হবে তোমারে করিয়া যাব দান তব জয়গান। কতবার ব্যর্থ আয়োজনে এ জীবনে হোমাগ্নি উঠে নি জ্বলে, শূন্যে গেছে চলি হতাশ্বাস ধুমের কুন্ডলী! কতবার ক্ষনিকের শিখা আঁকিয়াছে ক্ষীণ টিকা নিশ্চেতন নিশীথের ভালে! লুপ্ত হয়ে গেছে তাহা চিহ্নহীন কালে। এবার তোমার আগমন হোমহুতাশন জ্বেলেছে গৌরবে। যজ্ঞ মোর ধন্য হবে। আমার আহুতি দিনশেষে করিলাম সমর্পণ তোমার উদ্দেশে। লহো এ প্রণাম জীবনের পূর্ণ পরিণাম। এ প্রণতি-’পরে স্পর্শ রাখো স্নেহভরে। তোমার ঐশ্বর্য-মাঝে সিংহাসন যেথায় বিরাজে করিয়ো আহ্বান, সেথা এ প্রণতি মোর পায় যেন স্থান।’ শেষের কবিতা – অধ্যায় ১৩ ১৩ আশঙ্কা সকালবেলায় কাজে মন দেওয়া আজ লাবণ্যের পক্ষে কঠিন। সে বেড়াতেও যায় নি। অমিত বলেছিল, শিলঙ থেকে যাবার আগে আজ সকালবেলায় সে ওদের সঙ্গে দেখা করতে চায় না। সেই পণটাকে রক্ষা করবার ভার দুজনেই উপর। কেননা, যে রাস-ায় ও বেড়াতে যায় সেই রাস্তা দিয়েই অমিতকে যেতে হবে। মনে তাই লোভ ছিল যথেষ্ট। সেটাকে কষে দমন করতে হল। যোগমায়া খুব সকালেই স্নান সেরে তাঁর আহ্নিকের জন্যে কিছু ফুল তোলেন। তিনি বেরোবার আগেই লাবণ্য সে জায়গাটা থেকে চলে এল য়ুক্যালিপটাস তলায়। হাতে দুই -একটা বই ছিল, বোধ হয় নিজেকে এবং অন্যদেরকে ভোলাবার জন্যে। তার পাতা খেলা, কিন’ বেলা যায, পাতা ওলটানো হয় না। মনের মধ্যে কেবলই বলছে- জীবনের মহোৎসবের দিন কাল শেষ হয়ে গেল। আজ সকালে এক একবার মেঘরৌদ্রের মধ্যে দিয়ে ভাঙনের দুত আকাশ ঝেটিয়ে বেড়াচ্ছে। মনে দৃঢ় বিশ্বাস যে অমিত চিরপলাতক, একবার সে সরে গেলে আর তার ঠিকানা পাওয়া যায় না। রাস্তায় চলতে চলতে কখন সে গল্প শুরু করে, তার পর রত্রি আসে, পরদিন সকালে দেখা যায় গল্পের গাঁথন ছিন্ন- পথিক গেছে চলে। লাবণ্য তাই ভাবছিল, ওর গল্পটা এখন থেকে চিরদিনের মতো রইল বাকি। আজ সেই অসমাপ্তির ম্লানতা সকালের আলোয়; অকাল-অবসানের অবসাদ আর্দ্র হাওয়ার মধ্যে। এমন সময়, বেলা তখন নটা, অমিত দুমদম শব্দে ঘরে ঢুকেই ‘ মাসিমা মাসিমা’ করে ডাক দিলে। যোগমায়া প্রাতঃসন্ধ্যা সেরে ভাড়ারের কাজে প্রবৃত্ত। আজ তাঁরও মনটা পীড়িত। অমিত তার কথায় হাসিতে চাঞ্চল্যে এতদিন তাঁর স্নেহাসক্ত মনকে, তাঁর ঘরকে ভরে রেখেছিল। সে চলে গেছে এই ব্যাথার বোঝা নিয়ে তাঁর সকালবেলাটা যেন বৃষ্টি বিন্দুর ভারে সদ্যঃতপী ফুলের মতো নুয়ে পড়ছে। তাঁর বিচ্ছেদকাতর ঘরকন্নার কাজে আজ তিনি লাবন্যকে ডাকেন নি। বুঝেছিলেন আজ তার দরকার ছিল একলা থাকার, লোকের চোখের আড়ালে। লাবণ্য তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল, কোলের থেকে বই গেল পড়ে, জানতেও পারলে না। এ দিকে যোগমায়া ভাড়ার ঘর থেকে দ্রুতপদে বেরিয়ে এসে বললেন, ‘ কী বাবা অমিত, ভূমিকম্প নাকি?’ ‘ ভুমিকম্পই তো। জিনিসপত্র রওনা করে দিয়েছি; গাড়ি ঠিক; ডাকঘরে গেলুম দেখতে চিঠিপত্র কিছু আছে কি না। সেখানে এক টেলিগ্রাম।’ অমিতর মুখের ভাব দেখে যোগমায়া উদবিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ খবর সব ভালো তো?’ লাবণ্যও ঘরে এসে জুটল। অমিত ব্যাকুল মুখে বললে, ‘ আজই সন্ধ্যাবেলায় আসছে সিসি, আমার বোন, তার বন্ধু কেটি মিত্তির , আর তার দাদা নরেন।’ ‘ তা, ভাবনা কিসের বাছা? শুনেছি, ঘোড়দৌড়ের মাঠের কাছে একটা বাড়ি খালি আছে। যদি নিতান- না পাওয়া যায় আমার এখানে কি একরকম করে জায়গা হবে না?’ ‘ সেজন্যে ভাবনা নেই মাসি! তারা নিজেরাই টেলিগ্রাফ করে হোটেলে জায়গা ঠিক করেছে।’ ‘ আর যাই হোক বাবা, তোমার বোনেরা এসে যে দেখবে তুমি ঐ লক্ষ্মীছাড়া বাড়িটাতে আছ সে কিছুতেই হবে না। তারা আপন লোকের খ্যাপামির জন্যে দায়িক করবে আমাদেরকেই।’ ‘ না মাসি, আমার প্যারাডাইস্‌ লস্ট। ঐ নগ্ন আসবাবের স্বর্গ থেকে আমার বিদায় । সেই দড়ির খাটিয়ার নীড় থেকে আমার সুখ স্বপ্নগুলো উড়ে পালাবে। আমাকেও জায়গা নিতে হবে সেই অতিপরিচ্ছন্ন হোটেলের এক অতিসভ্য কামরায়।’ কথাটা বিশেষ কিছু নয়, তবু লাবণ্যর মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল। এদদিন একটা কথা ওর মনেও আসে নি যে, অমিতর যে সমাজ সে ওদের সমাজ থেকে সহস্র যোজন দুরে। এক মুহুর্তেই সেটা বুঝতে পারলে। অমিত যে আজ কোলকাতায় চলে যাচ্ছিল তার মধ্যে বিচ্ছেদের কঠোর মুর্তি ছিল না। কিন’ এই-যে আজ ও হোটেলে যেতে বাধ্য হল এইটাতেই লাবণ্য বুঝলে, যে বাসা এতদিন ওরা দুজনে নানা অদৃশ্য উপকরণে গড়ে তুলছিল সেটা কোনোদিন বুঝি আর দৃশ্য হবে না। লাবণ্যর দিকে একটু চেয়ে অমিত যোগমায়াকে বললে, ‘ আমি হোটেলেই যাই আর জাহান্নমেই যাই, কিন’ এইখানেই আমার আসল বাসা।’ অমিত বুঝেছে, শহর থেকে আসছে একটা অশুভ দৃষ্টি। মনে মনে নানা প্ল্যান করেছে যাতে সিসির দল এখানে না আসতে পারে। কিন’ ইদানীং ওর চিঠিপত্র আসছিল যোগমায়ার বাড়ির ঠিকানায়। তখন ভাবে নি, কোনো সময়ে তাতে বিপদ ঘটতে পারে। অমিতর মনের ভাবগুলো চাপা থাকতে চায় না, এমন-কি প্রকাশ পায় কিছু আতিশয্যের সঙ্গে। ওর বোনের আসা সম্বন্ধে অমিতর এত বেশি উদবেগ যোগমায়ার কাছে অসংগত ঠেকছিল; লাবণ্যও ভাবলে অমিত ওকে নিযে বোনেদের কাছে লজ্জিত। ব্যাপারটা লাবণ্যর কাছে বিস্বাদ ও অসম্মানজনক হয়ে দাঁড়াল। অমিত লাবণ্যকে জিজ্ঞাসা করলে, ‘ তোমার কি সময় আছে? বেড়াতে যাবে?’ লাবণ্য একটু যেন কঠিন করে বললে, ‘ না, সময় নেই।’ যোগমায়া ব্যস-া হয়ে বললেন, ‘ যাও-না মা, বেড়িয়ে এসো গে।’ লাবণ্য বললে, ‘কর্তামা, কিছুকাল থেকে সুরমাকে পড়ানোর বড়ো অবহেলা হয়েছে। খুবই অন্যায় করেছি। কাল রাত্রেই ঠিক করেছিলুম আজ থেকে কিছুতেই আর ঢিলেমি করা হবে না।’ ব’লে লাবণ্য ঠোঁট চেপে মুখ শক্ত করে রইল। লাবণ্যের এই জেদের মেজাজটা যোগমায়ার পরিচতি। পীড়াপীড়ি করতে সাহস করলেন না। অমিতও নীরস কন্ঠে বললে, ‘ আমিও চললুম কর্তব্য করতে, ওদের জন্যে সব ঠিক করে রাখা চাই।’ এই ব’লে চলে যাবার আগে বারান্দায় একবার স-ব্ধ হয়ে দাঁড়াল। বললে, ‘ বন্যা, ঐ চেয়ে দেখো। গাছের আড়াল থেকে আমার বাড়ির চালাটা অল্প একটু দেখা যাচ্ছে। একটা কথা তোমাদের বলা হয় নি, এ বাড়িটা কিনে নিয়েছি। বাড়ির মালিক অবাক, নিশ্চয় ভেবেছে ওখানে সোনার গোপন খনি আবিস্কার করে থাকব। দাম বেশ একটু চড়িয়ে নিয়েছে। ওখানে সোনার খনির সন্ধান তো পেয়েইছিলুম, সে সন্ধান একমাত্র আমিই জানি। আমার জীর্ণ কুটিরের ঐশ্বর্য সবার চোখ থেকে লুকোনো থাকবে।’ লাবণ্যের মুখে গভীর একটা বিষাদের ছাড়া পড়ল। বললে, ‘ আর কারো কথা অত করে তুমি ভাব কেন? নাহয় আর-সবাই জানতে পারলে। ঠিকমত জানতে পারাই তো চাই, তা হলে কেউ অমর্যাদা করতে সাহস করে না।’ এ কথার কোনো উত্তর না দিয়ে অমিত বললে, ‘ বন্যা, ঠিক করে রেখেছি বিয়ের পরে ঐ বাড়িতেই আমরা কিছুদিন এসে থাকব। আমার সেই গঙ্গার ধারের বাগান, সেই ঘাট, সেই বটগাছ সব মিলিয়ে গেছে ঐ বাড়িটার মধ্যে। তোমার দেওয়া মিতালী নাম ওকেই সাজে।’ ‘ ও বাড়ি থেকে আজ তুমি বেরিয়ে এসেছ মিতা। আবার একদিন যদি ঢুকতে চাও, দেখবে ওখানে তোমাকে কুলোবে না। পৃথিবীতে আজকের দিনের বাসায় কালকের দিনের জায়গা হয় না। সেদিন তুমি বলেছিলে, জীবনে মানুষের প্রথম সাধনা দারিদ্রের, দ্বিতীয় সাধনা ঐশ্বর্যের। তার পর শেষ সাধনার কথা বল নি, সেটা হচ্ছে ত্যাগের।’ ‘ বন্যা, ওটা তোমাদের রবি ঠাকুরের কথা; সে লিখেছে, শাজাহান আজ তার তাজমহলকেও ছাড়িয়ে গেল। একটা কথা তোমার কবির মাথায় আসে নি যে, আমরা তৈরী করি তৈরি জিনিসকে ছাড়িয়ে যাবার জন্যেই। বিশ্বসৃষ্টিতে ঐটেকেই বলে এভোল্যুশন। একটা অনাসৃষ্টি ভুত ঘাড়ে চেপে থাকে, বলে ‘ সৃষ্টি করো’ সৃষ্টি করলেই ভূত নামে, তখন সৃষ্টিটাকেও আর দারকার থাকে না। কিন’ তাই বলে ঐ ছেড়ে যাওয়াটাই চরম কথা নয়। জগতে শাজাহান -মমতাজের অক্ষয় ধারা বয়ে চলেছেই-ওরা কি একজন মাত্র? সেই জন্যেই তো তাজমহল কোনোদিন শুন্য হতেই পারল না। নিবারণ চক্রবর্তী বাসরঘরের উপর একটা কবিতা লিখেছে। সেটা তোমাদের কবিবরের তাজমহলের সংক্ষিপ্ত উত্তর, পোষ্টকার্ডে লেখা- তোমারে ছাড়িয়ে যেতে হবে রাত্রি যবে উঠিবে উন্মনা হয়ে প্রভাতের রথচক্ররবে। হায় রে বাসরঘর। বিরাট বাহির সে যে বিচ্ছেদের দস্যু ভয়ংকর। তবু সে যতই ভাঙেচোরে, মালাবদলের হার যত দেয় ছিন্ন ছিন্ন করে, তুমি আছ ক্ষয়হীন অনুদিন; তোমার উৎসব বিচ্ছিন্ন না হয় কভু, না হয় নীবর। কে বলে, তোমারে ছেড়ে গিয়েছে যুগল শূন্য করি তব শয্যাতল? যার নাই, যার নাই- নব নব যাত্রী-মাঝে ফিরে ফিরে আসিছে তারাই তোমার আহবানে উদার তোমার দ্বার -পানে। হে বাসরঘর, বিশ্বে প্রেম মৃত্যুহীন, তুমিও অমর। রবি ঠাকুর কেবল চলে যাবার কথাই বলে, রয়ে যাবার গান গাইতে জানে না। বন্যা, কবি কি বলে যে আমরাও দুজন যেদিন ঐ দরজায় ঘা দেব দরজা খুলবে না?’ ‘ মিনতি রাখো, মিতা, আজ সকালে কবির লড়াই তুলো না। তুমি কি ভাবছ প্রথম দিন থেকেই আমি জানতে পারি নি যে তুমিই নিবারণ চক্রবর্তী? কিন’, তোমার ঐ কবিতার মধ্যে এখনই আমাদের ভালোবাসার সমাধি তৈরি করতে শুরু কোরো না, অন-ত তার মরার জন্যে অপেক্ষ কোরো।’ অমিত আজ নানা বাজে কথা বলে ভিতরের কোন্‌ একটা উদবেগকে চাপা দিতে চায়, লাবণ্য তা বুঝেছিল। অমিতও বুঝতে পেরেছে, কাব্যের দ্বন্ধ কাল সন্ধেবেলায় বেখাপ হয় নি, আজ সকালবেলায় তার সুর কেটে যাচ্ছে। কিন’, সেইটে যে লাবণ্যর কাছে সুস্পষ্ট সেই ওর ভালো লাগল না। একটু নীরসভাবে বললে, ‘তা হলে যাই, বিশ্বজগতে আমারও কাজ আছে আপাতত সে হচ্ছে হোটেল পরিদর্শন। ও দিকে লক্ষ্মীছাড়া নিবারণ চক্রবর্তীর ছুটির মেয়াদ এবার ফুরোল বুঝি।’ তখন লাবণ্য অমিতর হাত ধরে বললে, দেখো মিতা, আমাকে চিরদিন যেন ক্ষমা করতে পারো। যদি একদিন চলে যাবার সময় আসে তবে, তোমার পায়ে পড়ি, যেন রাগ করে চলে যেয়ো না।’ এই বলে চোখের জল ঢাকবার জন্যে দ্রুত অন্য ঘরে গেল। অমিত কিছুক্ষণ স-ব্ধ হয়ে দাড়িয়ে রইল। তারপরে আসে- আসে- যেন অন্যমনে গেল য়ুক্যালিপ্‌টাস-তলায়। দেখলে, সেখানে আখরোটের গোটা কতক ভাঙা কোলা ছড়ানো। দেখেই ও মনটার ভিতর কেমন একটা ব্রাথা চেয়ে সকরুন। তার পরে দেখলে ঘাসের উপরে একটা বই , সেটা রবি ঠাকুরের ‘ বলাকা’। তার নীচের পকেটে। একবার ভাবলে, ফিরিয়ে দিয়ে আসি গে. কনি’ ফিরিয়ে দিলে না, সেটা নিল আকাশটাকে খুব করে মেজে দিয়েছে। ধুলো ধোওয়া বাসাতে অত্যন- স্পষ্ট করে প্রকাশ পাচ্ছে চার দিকের ছবিটা; পাহাড়ের আর গাপালার সীমান-গুলি যেন ঘন নীল আকাশে পাচ্ছে চার দিকের ছবিটা; পাহাড়েরর আর গাছপালার সীমান-গুলি যেন ঘন নীল আকাশে খুদে দেওয়া, জগৎটা যেন কাছে এগিয়ে একেবারে মনের উপরে এসে ঠেকল। আসে- আসে- বেলা চলে যাচ্ছে, তার ভিতরটাতে ভৈরবীর সুর। এখনই খুব কষে কাজে লাগবে বলে লাবণ্যের পণ ছিল, তবু যখন দুর থেকে দেখলে অমিত গাছতলায় ব’সে, আর থাকতে পারলে না, বুকের ভিতরটা হাঁপিয়ে উঠল, চোখ এল জলে ছল্‌ছলিয়ে। কাছে আসে বললে, ‘মিতা, তুমি কী ভাবছ? ‘ এতদিন যা ভাবছিলুম একেবারে তার উল্টো।’ ‘ মাঝে মাঝে মনটাকে উলটিয়ে না দেখলে তুমি ভালো থাক না। তোমার উল্টো ভাবনাটা কিরকম শুনি।’ ‘ তোমাকে মনের মধ্যে নিয়ে এতদিন কেবল ঘর বানাচ্ছিলিুম কখনো গঙ্গার ধারে, কখনো পাহাড়ের উপরে। আজ মনের মধ্যে জাগছে সকালবেলাকার আলোয় উদাস করা একটা পথের ছবি-অরণ্যের ছায়ায় ছায়ায় ঐ পাহাড়গুলোর উপর দিয়ে। হাতে আছে লোহার-ফলা-ওয়ালা লম্বা লঠি, পিঠে আছে চামড়ার ষ্ট্যাম্প দিয়ে বাঁধা একটা চৌকো থলি। তুমি চলবে সঙ্গে। তোমার নাম সার্থক হোক বন্যা, তুমি আমাকে বদ্ধ ঘর থেকে বের করে পথে ভাসিয়ে নিয়ে চললে বুঝি। ঘরের মধ্যে নানান লোক, পথ কেবল দুজনের।’ ‘ ডায়মন্ডহারবারের বাগানটা তো গেছেই, তার পরে সেই পচাত্তর টাকার ঘর বেচারাও গেল। তা, যাক গে। কিন’ চলবার পথে বিচ্ছেদের ব্যবস’াটা কি রকম করবে? দিনানে- তুমি এক পান’শালায় ঢুকবে আর আমি আর একটাতে?’ ‘ তার দরকার হয় বন্যা। চলাতেই নতুন রাখে, পায়ে পায়ে নতুন, পুরোনো হবার সময় পাওয়া যায় না। বসে থাকাটাই বুড়োমি।’ ‘ হঠাৎ এ খেয়ালটা তোমার কেন মনে হল মিতা? ‘ তবে বলি। হাঠাৎ শোভনলালের কাছ থেকে একখানা চিঠি পেয়েছি। তার নাম শুনেছ বোধ হয়, রায়চাঁদ-প্রেমচাঁদ ওয়ালা? ভারত ইতিহাসের সাবেক পথগুলো সন্ধান করবে বলে কিছুকাল থেকে সে বেরিয়ে পড়েছে। সে অতীতের লুপ্ত পথ উদ্ধার করতে চায়; আমার ইচ্ছে ভবিষ্যতের পথ সৃষ্টি করা।’ লাবণ্যর বুকের ভিতরে হঠাৎ খুব একটা ধাক্কা দিলে। কথাটাকে বাধা দিয়ে অমিতকে বললে, ‘ শোভনলালের সঙ্গে একই বৎসর আমি এম.এ দিয়েছি। তার সব খবরটা শুনতে ইচ্ছে করে।’ ‘ এক সময়ে সে খেপেছিল, আফগানিস’ানের প্রাচীন শহর কাপিশের ভিতর দিয়ে একদিন যে পুরোনো রাস-া চলেছিল সেইটিকে আয়ত্ত করবে। ঐ রাস-া দিয়েই ভারতবর্ষে হিউয়েনসাঙের তীর্থযাত্রা ঐ রাস-া দিয়েই তারও পূর্বে আলেকজান্ডারের রণযাত্রা। খুব কষে পুশত্‌ পড়লে, পাঠানি কায়দাকানুন অভ্যেস করলে। সুন্দর চেহারা, ঢিলে কাপড়ে ঠিক পাঠানের মতো দেখতে হয় না, দেখায় যেন পারসিকের মতো। আমাকে এস ধরলে, সেখানে ফরাসি পন্ডিতরা এই কাজে লেগেছেন, তাঁদের কাছে পরিচয়পত্র দিতে – ফ্রান্সে থাকতে তাঁদের কারো কারো কাছে আমি পড়েছি। দিলেম পত্র, কিন’ ভারত সরকারের ছাড়চিঠি জুটল না। তার পর থেকে দুর্গম হিমালয়ের মধ্যে কেবইল পথ খুঁজে খুঁজে বেড়াচ্ছে- কখনো কাশ্নীরে, কখনো কুমায়ুনে। এবার ইচ্ছে হয়েছে হিমালয়ের পূর্ব-প্রান-টাতেও সন্ধান করবেভ বৌদ্ধধর্মপ্রচারের রাস-া এ দিকে দিয়ে কোথায় কোথায় গেছে সেইটে দেখতে চায়। এ পথ খেপাটার কথা মনে করে আমারো মন উদাস হয়ে যায়। পুঁথির মধ্যে আমরা কেবল কথায় রাস-া খুঁজে খুজেঁ চোখ খোওয়াই, ঐ পাগল বেরিয়েছে পথের পুঁথি পড়তে, মানববিধাতার নিজের হাতে লেখা।- আমার কী মনে হয় জান?’ ‘ কী বলো।’ ‘ প্রথম যৌবনে একদিন শোভনলাল কোন কাঁকন পরা হাতের ধাক্কা খেয়েছিল, তাই ঘরের থেকে পথের মধ্যে ছিটকিয়ে পড়েছে। ওর সমস- কাহিনীটা স্পষ্ট জানি নে, কিন’ একদিন ওতে-আমাতে একলা ছিলুম, না না কথায় হল প্রায় রাত-দুপুর, জানালার বাইরে হঠাৎ চাঁদ দেখা দিল একটা ফুলন- জারুল গাছের আড়ালে-ঠিক সেই সময়টাতে কোন একজনের কথা বলতে গেল, নাম করলে চলে গেল। বুঝতে পারলুম ওর জীবনের মধ্যে কোনখানে অত্যন- একটা নিষ্ঠুর কথা বিঁধে আছে। সেই কথাটাকেই বুঝি পথ চলতে চলতে ও পায়ে পায়ে খইয়ে দিতে চায়।’ লাবণ্যর হঠাৎ উদ্ভিদতত্ত্বের ঝোঁক এল, নুয়ে পড়ে দেখতে লাগল ঘাসের মধ্যে সাদায় হলদেয়-মেলানো একটা বুনো ফুল। একান- মনোযোগে তার পাপড়িগুলো গুনে দেখার জরুরি দরকার পড়ল। অমিত বললে, ‘ জান, বন্যা, আমাকে তুমি আজ পথের দিকে ঠেলে দিয়েছ।, ‘ কমন করে?’ ‘ আমি ঘর বানিয়েছিলুম। আজ সকালে তোমার কথায় মনে হল তুমি তার মধ্যে পা দিতে কুন্ঠিত। আজ দু মাস ধরে মনে মনে ঘর সাজালুম। তোমাকে ডেকে বললুম, এসো বধূ, ঘরে এসো। তুমি আজ বধুসজ্জা খসিয়ে ফেললে; বললে এখানে জায়গা হবে না বন্ধু , চিরদদিন ধরে আমাদের সপ্তপদী- গমন হবে।’ বনফুলের বটানি আর চলল না। লাবণ্য উঠে পড়ে ক্লিষ্ট স্বরে বললে, ‘মিতা, আর নয়, সময় নেই।’ শেষের কবিতা – অধ্যায় ১৪ ১৪ ধুমকেতু এতদিন পরে অমিত একটা কথা আবিস্কার করেছে যে, লাবণ্যর সঙ্গে তার সম্বন্ধটা শিলঙসুদ্ধ বাঙালি জানে। গভর্মেন্ট অফিসের কেরানিদের প্রধান আলোচ্য বিষয় তাদের জীবিকা ভাগ্যগগনে ‘ কোন গ্রহ রাজার হৈল কেবা মন্ত্রিবর।’ এমন সময় তাদের চোখে পড়ল মানবজীবরেন জ্যোতির্মন্ডলে এক যুগ্মতারার আবর্তন, একেবারে ফাস্ট ম্যাগ্নিট্যুডের আলো। পর্যবেক্ষকদের প্রকৃতি অনুসারে এই দুটি নবদীপ্যমান জ্যোতিস্কের আগ্নেয় নাট্যের নানা প্রকার ব্যাখ্যা চলছে। পাহাড়ে হাওয়া খেতে এসে এই ব্যাখ্যার মধ্যে পড়েছিল কুমার মুকুজ্জে-অ্যাটর্নি। সঙক্ষেপের কেউ তাকে বলে কুমার মুখো, কেউ বলে মার মুখো। সিসিদের মিত্রাগোষ্ঠীর অন-শ্চর নয় সে, কিন’ জ্ঞাতি, অর্থাৎ জানাশোনার দলে। অমিত তাকে ধুমকেতু মুখো না দিয়েছিল। তার একটা কারণ, সে এদে দলের বাইরে, তবু সে মাঝে মাঝে এদর কক্ষপথে পুচ্ছ বুলিয়ে যায়। সকলেই আন্দাজ করে, যে গ্রহটি তাকে বিশেষ করে টান মারছে তার নাম লিসি। এই নিয়ে সকলেই কৌতুক অনুভব করে, কিন’, সিসি স্বয়ং এতে ক্রুদ্ধ ও লজ্জিত। তাই লিসি প্রায়ই প্রবলবেগে এর পচ্ছমর্দন করে চলে যায়, কিন’ দেখতে পাই, তাতে ধূমকেতুর লেজার বা মুড়োর কোনোই লোকসান হয় না। অমিত শিলঙের রাস-ায় ঘাটে মাঝে মাঝে কুমার মুখোকে দুর থেকে দেখেছে। তাকে না দেখতে পাওয়া শক্ত। বিলেতে আজো যায় নি বলে তার বিলিতি কায়দা খুব উৎকট ভাবে প্রকাশমান। তার মুখে নিরবচ্ছিন্ন একটা দীর্ঘ মোটা চুরুট থাকে, এইটেই তার ধুমকেতু মুখো নামের প্রধান কারণ। অমিত তাকে দূরে থেকেই এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেছে এবং নিজেকে ভুলিয়েছে যে ধুমকেতু বুঝি সেটা বঝতে পারে নি। কিন’ দেখেও দেখতে না পাওয়াটা টকেট বড়ো বিদ্যের অন-র্গত। চুরিবিদ্যের মতোই, তার সার্থকতার প্রমাণ হয় যদি না পড়ে ধরা। তাতে প্রত্যক্ষ দৃশ্যটাকে সম্পূর্ণ পার করে খেবার পারদর্শিতা চাই। কুমার মুখো শিলঙের বাঙালি সমাজ থেকে এমন অনেক কথা সংগ্রহ করেছে যাকে মোটা অক্ষরে শিরোনামা দেওয়া যেতে পারে ‘ অমিত রায়ের অমিতাচার’। মুখে সব চেয়ে নিন্দে করেছে যারা, মনে সব চেয়ে রসভোগ করেছে তারাই। যকৃতের বিকৃতিশোধনের জন্য কুমার কিছুদিন এখানে থাকবে বলেই সি’র ছিল, কিন’ জনশ্রুতিবিস-ারের উগ্র উৎসাহে তাকে পাঁচ দিনের মধ্যে কোলকাতায় ফেরালে। সেখানে গিয়ে অমিত সম্বন্ধে তার চুরুট-ধুমাকৃত অত্যুক্তি-উদ্গারে সিসি- লিসি মহলে কৌতুকে কৌতুহলে জড়িত বিভীষিকা উৎপাদর করলে। অভিজ্ঞ পাঠকমাত্রেই এতক্ষনে অনুমান করে থাকবেন যে, সিসি দেবতার বাহন হচ্ছে কেটি মিত্তিরের দাদা নরেন। তার অনেক দিনের একনিষ্ঠ বাহন দশা এবার বৈবাহনের দশম দশায় উত্তীর্ণ হবে, এমন কথা উঠেছে। সিসি মনে মনে রাজি। কিন’ যেন রাজি নয় ভাব দেখিয়ে একটা প্রদোষান্ধকার ঘনিয়ে রেখেছে। অমিতর সম্পতিসহায়ে নরেন এই সংশয়টুকু পার হতে পারবে বলে ঠিক করেছিল কিন’ অমিত হাম্বাগটা না ফেরে কোলকাতায়, না দেয় চিঠির জবাব। ইংরেজী যতগুলো গর্হিত শব্দভেদী বাক্য তার জানা ছিল সবগুলিই প্রকাশ্যে ও স্বগত উক্তিকে নিরুদ্দেশ অমিতর প্রতি নিক্ষেপ করেছে। এমন কি, তারযোগে অত্যন- বেতার বাক্য শিলঙে পাঠাতে ছাড়ে নি, কিন’ উদাসীন নক্ষত্রকে লক্ষ্য করে উদ্ধত হাউইয়ের মতো কোথাও তার দাহরেখা রইল না অবশেষে সর্ব সম্মতিক্রমে সি’র হল, অবস’াটার সরেজমিন তদন- হওয়া দরকার। সর্বনাশের স্রোতে অমিতর ঝুটির ডগাটাও যদি কোথাও একটু দেখা যায়, টেনে ডাঙায় তোলা আশু দরকার। এ সম্বন্ধে তার আপন বোন সিসির চেয়ে পরের বোন কেটির উৎসাহ অনেক বেশি। ভারতের ধন বিদেশে লুপ্ত হচ্ছে বলে আমাদের পলিটিক্সের যে আক্ষেপ কেটি মিটারের ভাবখানা সেই জাতের। নরেন মিটার দীর্ঘকাল য়ুরোপে ছিল। জমিদারের ছেলে, আয়ের জন্য ভাবনা নেই, ব্যয়ের জন্যেও; বিদ্যার্জনের ভাবনাও সেই পরিমাণেই লঘু। বিদেশে ব্যয়ের প্রতিই অধিক মনোযোগ করেছিল-অর্থ এবং সময় দুই দিকে থেকে। নিজেকে আর্টিষ্ট বল পরিচয় দিতে পারলে একই কালে দায়মুক্ত স্বাধীনতা ও অহেতুক আত্মসম্মান লাভ করা যায়। এইজন্যে আর্ট সরস্বতীর অনুসরণে য়ুরোপের অনেক বড়ো বড়ো শহরের বোহিমীয় পাড়ায় সে বাস করেছে। কিছুদিন চেষ্টার পর স্পষ্টবক্তা হিতৈষীদের কঠোর অনুরোধে আঁকা ছবি আঁকা ছেড়ে দিতে হল, এখন সে ছবির সমজদারিতে পরিপক্ক বলেই নিজের প্রমাণনিরপেক্ষ পরিচয় দেয়। চিত্রকলা সে ফলাতে পারে না, কিন’ দুই হাতে সেটাকে চটকাতে পারে। ফরাসি ছাঁচে সে তার গোঁফের দুই প্রত্যন-দেশকে সযত্নে কন্টকিত করেছে, এদিকে মাথায় ঝাঁকড়া চুলের প্রতি তার সযত্ন অবহেলা। চেহারাখানা তার ভালোই, কিন’ আরো ভালো করবার মহার্ঘ সাধনায় তার আয়নার টেবিল প্যারিসীয় বিলাসবৈচিত্র্যে ভারাক্রান-। তার মুখ ধোবার টেবিলের উপকরণ দশাননের পক্ষেও বাহুল্য হত। দামি হাভানা দু-চার টান টেনেই আনায়াসেই সেটাকে অবজ্ঞা করা এবং মাসে মাসে গাত্রবস্ত্র পার্সেল পোষ্টে ফরাসি ধোবার বাড়িতে ধুইয়ে আনানো, এ-সব দেখে ওর আভিজাত্য সম্বন্ধে দ্বিরুক্তি করতে সাহস হয় না। য়ুরোপের শ্রেষ্ঠ দর্জিশালার রেজিষ্ট্রি বহিতে ওর গায়ের মাপ ও নম্বর লেখা এমন সব কোঠায় যেখানে খুঁজলে পাতিয়ালা- কর্পুরতলার নাম পাওয়া যেতে পারে। ওর স্ন্যাঙ-বিকীর্ণ ইংরেজী ভাষার উচ্চারণটা বিজড়িত, বিলম্বিত, অমীলিত চক্ষুর অলস কটাক্ষ-সহযোগে অনতিব্যক্ত; যারা অভিজ্ঞ তাদের কাছে শোনা যায়, ইংল্যান্ডের অনেক নীলরক্তবান আমীরদের কন্ঠস্বরে এইরকম গদ্গদ জড়িমা। এর উপরে ঘোড়দৌড়ীয় অপভাষা এবং বিলিত শপথের দুর্বাক্যসম্পদে সে তার দলের লোকের আদর্শ পুরুষ। কেটি মিটারের আসল নাম কেতকী। চালচলন ওর দাদারই কায়দা-কারখানার বকযন্ত্রপরস্পরায় শোধিত তৃতীয় ক্রমের চোলাই-করা, বিলিতি কৌলীন্যের ঝাঁঝালো এসেনস। সাধারণ বাঙালি মেয়ের দীর্ঘকেশগৌরবের গর্বের প্রতি গর্বসহকারেই কোটি দিয়েছে কাঁচি চালিয়ে, খোঁপাটা ব্যাঙাচির লেজের মতো বিলুপ্তি হয়ে অনুকরণের উল্লম্ফশীল পরিণত অবস’া প্রতিপন্ন করছে। মুখের স্বাভাবিক গৌরিমা বর্ণপ্রলেপের দ্বারা এনামেল করা। জীবনের আদ্যলীলায় কেটির কালো চোখের ভাবটি ছিল স্নিগ্ধ, এখন মনে হয় সে যেন যাকে-তাকে দেখতেই পায় না। যদি বা দেখে তো লক্ষ্যই করে না, যদি বা লক্ষ্য করে তাতে যেন আধ খোলা একটা ছুরির ঝলক থাকে। প্রথম বয়সে ঠোঁটদুটিতে সরল মাধুর্য ছিল, এখন বার বার বেঁকে বেঁকে তার মধ্যে বাঁকা অঙ্কুশের মতো ভাব স’ায়ী হয়ে গেছে। মেয়েদের বেশের বর্ণনায় আমি আনাড়ি, তার পরিভাষা জানি নে। মোটের উপর চোখে পড়ে, উপরে একটা পাতলা সাপের খোলসের মতো ফুরফুরে আবরণ, আন্দরের কাপড় থেকে অন্য একটা রঙের আভাস আসছে। বুকের অনেকখানিই অনাবৃত; আর অনাবৃত বাহুদুটিকে কখনো কখনো টেবিলে, কখনো চৌকির হাতায়, কখনো পরস্পরকে জড়িত করে যত্নের ভঙ্গিতে আলগোছের রাখবার সাধনা সুসস্পূর্ন। আর যখন সুমার্জিতনখররমনীয় দুই আঙুলে চেপে সিগারেট খায় সেটা যতটা অলংকরণের অঙ্গ রূপে ততটা ধুমপানের উদ্দেশ্যে নয়। সব চেয়ে যেটা মনে দুশ্চিন-া উদ্রেক করে সেটা ওর সমুচ্চ- খুরওয়ালা জুতোজোড়ার কুটিল ভঙ্গিমায়; যেন ছাগলজাতীয় জীবের আদর্শ বিস্মৃত হয়ে মানুষের পায়ের গড়ন দেবার বেলায় সৃষ্টিকর্তা ভুল করেছিলেন, যেন মুচির দত্ত পদোন্নতির কিম্ভুত বক্রতায় ধরণীকে পীড়ন করে চলার দ্বারা এভোল্যুশনের ক্রটি সংশোধন করা হয়। সিসি এখনো আছে মাঝামাঝি জায়গায়। শেষের ডিগ্রি এখনো পায় নি, কিন’ ডবল প্রোমোশন পেয়ে চলেছে। উচ্চ হাসিতে, অজস্র খুশিতে, অনর্গন আলাপে ওর মধ্যে সর্বদা একটা চলন বলন টগবগ করছে-উপাসকমন্ডলীর কাছে সেটার খুব আদর। রাধিকার বয়ৎসন্ধির বর্ণনায় দেখতে পাওয়া যায় কোথাও তার ভাবখানা পাকা, কোথাও কাঁচা; এরও তাই। খুরওয়ালা জুতোয় যুগান-রের জয়তোরণ, কিন’ অনবচ্ছিন্ন খোপাটাতে রয়ে গেছে অতীত যুগ। পায়ের দিকে শাড়ির বহর ইঞ্চি দুই-তিন খাটো, কিন’ উত্তরচ্ছদে অসমবতির সীমানা এখনো আলজ্জতার অভিমুখে, অকারণ দস-ানা পরা অভ্যস- অথচ এখনো এক হাতের পরিবর্তে দুই হাতেই বালা; সিগারেট টানতে আর মাথা ঘোরে না, কিন’ পান খাবার আসক্তি এখনো প্রবল। বিস্কুটের টিনে ঢেকে আচার-আমসত্ত্ব পাঠিয়ে দিলে সে আপত্তি করে না; ক্রিস্ট্‌েমাসের প্লাম পুডিং এবং পৌষপার্বনের পিঠে এই দুইয়ের মধ্যে শেষটার প্রতিই তার লোলুপতা কিছু বেশি। ফিরিঙ্গি নাচওয়ালীর কাছে সে নাচ শিখেছে, কিন’ নাচের সভায় জুড়ি মিলিয়ে ঘূর্ণিনাচ নাচতে সামান্য একটু সংকোট বোধ করে। অমিত সম্বন্ধে জনরব শুনে এরা বিশেষ উদ্‌বিগ্ন হয়ে চলে এসেছে। বিশেষত, এদের পরিভাষাগত শ্রেণীবিভাগে লাবন্য গর্ভনেস। ওদের শ্রেণীর পুরুষের জাত মারবার জন্যেই তার স্পেশাল ক্রিয়েশন। মনে সন্দেহ নেই, টাকার লোভে মানের লোভেই সে অমিতকে কষে আঁকড়ে ধরেছে। ছাড়াতে গেলে সেই কাজটাতে মেয়েদেরই সম্মার্জনপটু হস-ক্ষেপ করতে হবে। চতুরমুখ তার চোর জোড়া চক্ষে মেয়েদের দিকে কটাক্ষপাত ও পক্ষপাত একসঙ্গেই করে থাকবেন, সেইজন্যে মেয়েদের সম্বন্ধে বিচারবুদ্ধিতে পুরুষদের গড়েছেন নিটে নির্বোধ করে। তাই স্বজাতিমোহমুক্ত আত্মীয় মেয়েদের সাহায্য না পেলে অনাত্মীয় মেয়েদের মোহজাল থেকে পুরুষদের উদ্ধার পাওয়া এত দুঃসাধ্য। আপাতত এই উদ্ধারের প্রণালীটা কিরকম হাওয়া চাই তাই নিয়ে দুই নারী নিজেদের মধ্যে একটা পরামর্শ ঠিক করেছে। এটা নিশ্চিত, গোড়ায় অমিতকে কিছুই জানতে দেওয়া হবে না। তার আগেই শত্রুপক্ষকে আর রণক্ষেত্রটাকে দেখে আসা চাই। তার পর দেখা যাবে মায়াবিনীর কত শক্তি। প্রথমে এসেই চোখে পড়ল অমিতর উপর ঘর এক পোঁচ গ্রাম্য রঙ। এর আগেও ওর দলের সঙ্গে অমিতর ভাবের মিল ছিল না। তবু সে তখন ছিল প্রখর নাগরিক চাঁচা, মাজা, ঝকঝকে। এখন কেবল যে খোলা হাওয়ায় রঙটা কিছু ময়লা হয়েছে তা নয়, সবসুদ্ধ ওর উপরে যেন গাছপালার আমেজ দিয়েছে। ও যেন কাঁচা হয়ে গেছে এবং ওদের মতে কিছু যেন বোকা। ব্যবহারটা প্রায় যেন সাধারন মানুষের মতো। আগে জীবনের সমস- বিষয়কে হাসির অস্ত্র নিয়ে তাড়া করে বেড়াত, এখন ওর সে শখ সেই বললেই হয়; এইটেকেই ওরা মনে করেছে নিদেন কালের লক্ষণ। সিসি একদিন ওকে স্পষ্টই বললে, ‘দুর থেকে আমরা মনে করেছিলুম তুমি বুঝি খাসিয়া হবার দিকে নামছ। এখন দেখছি তুমি হয়ে উঠছ যাতে বলে গ্রীন, এখানকার পাইনগাছের মতো, হয়তো আগেকার চেয়ে স্বাস’্যকর, কিন’ আগেকার মতো ইনটারেসটিঙনয়। অমিত ওঅর্ডসওঅর্থের কবিতা থেকে নজির পেড়ে বললে, ‘ প্রকৃতির সংসর্গে থাকতে থাকতে নির্বাক নিশ্চেতন পদার্থের ছাপ লেগে যায় দেহ মনে প্রাণে,যাকে কবি বলেছেন সঁঃব রহংবহংধঃব ঃযরহমং’ শুনে সিসি ভাবলে, নির্বাক নিশ্চেতন পদার্থকে নিয়ে আমাদের কোনো নালিশ নেই; যারা অত্যন- বেশি সচেতন আর যারা কথা কইবার মধুর প্রগলভতায় সুপটু তাদের নিয়েই আমাদের ভাবনা। ওরা আশা করেছিল, লাবণ্য সম্বন্ধে অমিত নিজেই কথা তুলবে। একদিন দুদিন তিনদিন যায়, সে একেবারে চুপ। কেবল একটা কথা আন্দাজে বোঝা গেল, অমিতর সাধের তরণী সমপ্রতি কিছু বেশিরকম ঢেউ খাচ্ছে। ওরা বিছানা থেকে উঠে তৈরি হবার আগেই অমিত কোথা থেকে ঘুরে আসে তার পর মুখ দেখে মনে হয়, ঝোড়া হাওয়ায় যে কলাগাছের পাতাগুলো ফালি ফালি হয়ে ঝুলছে তারই মতো শতদীর্ণ ভাবখানা। আরো ভাবনার কথাটা এই যে, রবি ঠাকুরের বই কেউ কেউ ওর বিছানায় দেখেছে। ভিতরের পাতায় লাবণ্যর নাম থেকে গোড়ার অক্ষরটা লাল কালি দিয়ে কাটা। বোধ হয় নামের পরশপাথরেই জিনিসটার দাম বাড়িয়েছে। অমিত ক্ষনে ক্ষনে বেরিয়ে যায়। বলে, ‘খিদে সংগ্রহ করতে চলেছি।’ খিদের জোগানটা কোথায়, আর খিদেটা খুবই যে প্রবল, তা অন্যদের আগোচর ছিল না। কিন’ তারা এমনি অবুঝের মতো ভাব করত যেন হাওয়ায় ক্ষুধাকরতা ছাড়া শিলঙে আর কিছু আছে এ কথা কেউ ভাবতে পারে না। সিসি মনে মনে হাসে কেটি মনে মনে জ্বলে। নিজের সমস্যাটাই অমিতর কাছে এত একান- যে, বাইরের কোনো চাঞ্চল্য লক্ষ্য করার শক্তিই তার নেই। তাই সে নিঃসংকোচে সখীযুগলের কাছে বলে, ‘ চলেছি এক জলপ্রপাতের সন্ধানে।’ কিন’ প্রপাতটা কোন্‌ শ্রেণীর, আর তার গতিটা কোন্‌ অভিমুখী তা নিয়ে অন্যদের মনে যে কিছু ধোঁকা আছে তা সে বুঝতেই পারে না। আজ বলে গেল, এক জায়গায় কমলালেবুর মধু সওদা করতে চলেছে। মেয়েদুটি নিতান- নিরীহভাবে সরল ভাষায় বললে, এই অপূর্ব মধু সম্বন্ধে তাদের দুর্দমনীয় কৌতুহল, তারাও সঙ্গে যেতে চায়। অমিত বললে পথ দুর্গম, যানবাহনের আয়ত্তাতীত। বলেই আলোচনাটাকে প্রথম অংশে ছেদন করেই দৌড় দিলে। এই মুধকরের ডানায় চাঞ্চল্য দেখে দুই বন্ধু সি’র করলে, আর দেরি নয়, আজই কমলালেবুর বাগানে অভিযান করা চাই। এ দিকে নরেন গেছে ঘোড়দৌড়ের মাঠে। সিসিকে নিয়ে যাবার জন্যে খুব আগ্রহ ছিল সিসি গেল না। এই নিবৃত্তিতে তার কতখানি শমদমের দরকার হয়েছিল তা দরদী ছাড়া অন্যে কে বুঝবে? শেষের কবিতা – অধ্যায় ১৫ ১৫ ব্যাঘাত দুই সখী যোগমায়ার বাগানে বাইরের দরজা পার হয়ে চাকরদের কাউকে দেখতে পেলে না। গাড়িবারান্ডায় এসে চোখে পড়ল বাড়ির রোযাকে একটি ছোটো টেবিল পেতে একজন শিক্ষায়িত্রী ও ছাত্রীতে মিলে পড়া চলছে। বুঝতে বাকি রইল না। এরই মধ্যে বড়োটি লাবণ্য। কেটি টক্‌ টক্‌ করে উপরে উঠে ইংরেজিতে বললে, ‘ দুঃখিত।’ লাবণ্য চৌকি ছেড়ে উঠে বললে, কাকে চান আপনারা?. কেটি এক মুহুর্তে লাবণ্যের আপাদমস-কে দৃষ্টিটাকে প্রখর ঝাটার মতো দ্রুত বুলিয়ে নিয়ে বললে, ‘ মিস্টার অমট্রায়ে এখানে এসেছেন কি না খবর নিতে এলুম।’ লাবণ্য হাঠাৎ বুঝতেই পারলে না ‘অমিট্রায়ে’ কোন্‌ জাতের জীব। বললে, ‘ তাঁকে তো আমরা চিনি নে।’ অমনি দুই সখীতে একটা বিদ্যুচ্চকিত চোখ-ঠরাঠারি হয়ে গেল, মুখে পড়ল একটা আড়হাসির রেখা কেটি ঝাজিয়ে উঠে মাথা নাড়া দিয়ে বললে, ‘ আমরা তো জানি এ বাড়িতে তাঁর যাওয়া আশা আছে ড়ভঃবহবৎ ঃযধহ রং মড়ড়ফ ভড়ৎ যরস’ ভাব দেখে লাবণ্য চমকে উঠল, বুঝলে এরা কে আরও কী ভুলটাই করেছে। অপ্রস’ত হয়ে বললে, ‘ কর্তামাকে ডেকে দিই, তাঁর কাছে খবর পাবেন।’ লাবণ্য চলে গেলেই সুরমাকে কেটি সংক্ষেপে জিজ্ঞাসা করলে, ‘ তোমার টিচার?’ ‘ হা।’ ‘ নাম বুঝি লাবণ্য।’ ‘ হা।’ ‘ গট ম্যাচেস?’ হঠাৎ দেশালাইয়ের প্রয়োজন আন্দাজ করতে না পেরে সুরমা কথাটার মানেই বুঝলে না। মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কেটি বললে, ‘ দেশালাই।’ সুরমা দেশলাইয়ের বাক্স নিয়ে এল। কেটি সিগারেট ধরিয়ে টানতে টানতে সুরমাকে জিজ্ঞাসা করলে, ‘ ইংরেজি পড়।’ সুরমা স্বীকৃতিসূচক মাথা নেড়েই ঘরের দিকে দ্রুত চলে গেল। কেটি বললে, ‘গবর্নেসের কাছে মেয়েটা আর যাই শিখুক ম্যানারস্‌ শেখে নি।’ তার পরে দুই সখীতে টিপ্পনী চলল। ‘ ফেমাস লাবণ্য। ডিল্লীশস্‌ ! শিলঙ পাহাড়টাকে ভল্‌ক্যানো বানিয়ে তুলেছে, ভুমিকম্পে অমিটের হৃদয়ডাঙায় ফাটল ধরিয়ে দিলে, এ ধার থেকে ও ধার সিলি! মেন আর ফানি!’ সিসি উচ্চেঃস্বরে হেসে উঠল। এই হাসিতে ঔদার্য ছিল। কেননা, পুরুষমানুষ নির্বোধ বলে সিসির পক্ষে আক্ষেপের কারন ঘটে নি। সে তো পাথুরে জমিতে ও ভুুমিকম্প ঘটিয়েছে, দিয়েছে একেবারে চৌচির করে। কিন’ এ কী সৃষ্টিছাড়া ব্যপার! এক দিকে কেটির মতো মেয়ে, আর অন্য দিকে ঐ অদ্ভুত ধরনে কাপড়-পরা গবর্নেস। মুখে মাখন দিলে গলে না, যেন এতকাল ভিজে ন্যাকড়া; কাছে বসলে মানটাতে বাদলার বিস্কুটের মতো ছাতা পড়ে যায়। কী করে অমিট ওকে এক মোমেন্টও সহ্য করে। ‘ সিসি, তোমার দাদার মনটা চিরদিন উপরে পা করে হাটে। কোন এক সৃষ্টিছাড়া উলটো বুদ্ধিতে এই মেয়েটাকে হঠাৎ মনে হয়েছে এঞ্জেল।’ এই বলে টেবিলে অ্যালজেব্রার বইয়ের গায়ে সিগারেটটা ঠেকিয়ে রেখে কেটি ওর রুপোর শিকল ওয়ালা প্রসাধনের থলি বের করে মুখে একটুখানি পাউডার লাগালে, অঞ্জনের পেনসিল নিয়ে ভুরুর রেখাটা একটু ফুটিয়ে তুললে। দাদার কান্ডজ্ঞানহীনতায় সিসির যথেষ্ট রাগ হয় না, এমন-কি, ভিতরে ভিতরে একটু যেন স্নেহই হয়। সমস- রাগটা পড়ে পুরুষদের মুগ্ধনয়ন বিহারীনি মেকি এঞ্জেলদের’ পরে। দাদা সম্বন্ধে সিসির এই সকৌতুক ঔদাসীন্যে কেটির ধৈর্যভঙ্গ হয়। খুব করে ঝাঁকনি দিয়ে নিতে ইচ্ছে করে। এমন সময়ে দাদা গরদের শাড়ি পরে যোগমায়া বেরিয়ে এলেন। লাবন্য এল না। কেটির সঙ্গে এসেছিল ঝাঁকড়া চুলে- দুইচোখ আচ্ছন্নপ্রায় ক্ষুদ্রকায়া ট্যাবি-নাম ধারী কুকুর। সে একবার ঘ্রানের দ্বারা লাবণ্য ও সুরমার পরিচয় গ্রহন করেছে। যোগমায়াকে দেখে হঠাৎ কুকুরটার মনে কিছু উৎসাহ জন্মালো। তাড়াহাড়ি গিয়ে সামনের দুটো পা দিয়ে যোগমায়ার নির্মল শাড়ির উপর পঙ্কিল স্বাক্ষর অঙ্কিত করে দিয়ে কৃত্রিম প্রীতি জ্ঞাপন করলে। সিসি ঘাড় ঘরে টেনে আনলে কেটির কাছে, কেটি তার নাকের উপর তর্জনী তাড়ন করে বললে, ‘ নটি ডগ!’ কেটি চৌকি থেকে উঠলই না। সিগারেট টানতে টানতে অত্যন- নির্লিপ্ত আড়ভাবে একটু ঘাড় বাঁকিয়ে যোগমায়াকে নিরীক্ষণ করতে লাগল। যোগমায়ার’ পরে তার আক্রোশ বোধ করি লাবণ্যর চেয়েও বেশি। ওর ধারণা লাবণ্যর ইতিহাসে একটা খুঁত আছে। যোগমায়াই মাসি সেজে অমিতর হাতে তাকে গতিয়ে দেবার কৌশল করছে। পুরুষমানুষকে ঠকাতে অধিক বুদ্ধির দরকার করে না বিধাতার স্বহসে–তৈরি ঠুলি তাদের দুই চোখে পরানো। সিসি সামনে এসে যোগমায়াকে নমস্কারের একুট আভাস দিয়ে বললে, ‘ আমি সিসি, অমির বোন।’ যোগমায়া একটু হেসে বললেন, ‘ অমি আমাকে মাসি বলে, সেই সম্পর্কে আমি তোমারও মাসি হই মা!’ কেটির রকম দেখে যোগমায়া তাকে লক্ষ্যই করলেন না। সিসিকে বললেন, ‘ এসো মা, ঘরে বসবে এসো।’ সিসি বললে, ‘ সময় নেই, কেবল খবর নিতে এসেছি অমি এসেছে কিনা।’ যোগমায়া বললেন, ‘এখনো আসে নি।’ ‘ কখন আসবেন জানেন?’ ‘ ঠিক বলতে পারি নে। আচ্ছা, আমি জিজ্ঞাসা করে আসি গে।’ কেটি তার স্বস’ানে বসেই তীব্রস্বরে বলে উঠল, ‘ যে মাষ্টারনী এখানে বসে পড়াচ্ছিল সে তো ভান করলে আমিটাকে সে কোনোকালে জানেই না।’ যোগমায়া বাঁধা লেগে গেল। বুঝলেন কোথাও একটা গোল আছে। এও বুঝলেন এদের কাছে মান রাখা শক্ত হবে। ্‌ক মুহুর্তে মাসিত্ব পরিহার করে বললেন, ‘ শুনেছি অমিতবাবু আপনাদের হোটেলেই থাকেন, তার খবর আপনাদেরই জানা আছে।’ কেটি বেশ একটু স্পষ্ট করে ই হাসলে। তাকে ভাষায় বললে বোঝায়, লুকোতে পারো, ফাঁকি দিতে পরাবে না। আসল কথা, গোড়াতেই লাবণ্যকে দেখে এবং অমিকে সে চেনে না শুনে কেটি মনে মনে আগুন হয়ে আছে। কিন’ সিসির মনে আশঙ্কা আছে মাত্র, জ্বালা নেই; যোগমায়ার সুন্দর মুখের গাম্ভীর্য তার মনকে টেনেছিল। তাই, যখন দেখলে কেটি তাকে স্পষ্ট আবজ্ঞা দেখিয়ে চৌকি ছাড়লে না, তার মনে কেমন সংকোচ লাগল। অথচ কোন বিষয়ে কেটির বিরুদ্ধে যেতে সাহস হয় না। কেননা, কেটি সিডিশন দমন করতে ক্ষিপ্রহস- -একটু সে বিরোধ সয় না কর্কশ ব্যবহারে তার কোন সংকোচ নেই। অধিকাংশ মানুষই ভীরু, অকুন্ঠিত দুর্ব্যবহারের কাছে তারা হার মানে। নিজের অজস্র কঠোরতায় কেটির একটা গর্ব আছে; যাকে সে মিষ্টিমুখো ভালোমানুষি বলে, বন্ধুদের মধ্যে তার কোন লক্ষণ দেখলে তাকে সে অসি’র করে তোলে। রূঢ়তাকে সে অকপটতা বলে বড়াই করে, এই রূঢ়তার আঘাতে যারা সংকুচিত তারা কোনোমতে কেটিকে প্রসন্ন রাখতে পারলে আরাম পায়। সিসি সেই দলের-সে কেটিকে মনে মনে যতই ভয় করে ততই তার নকল করে; দেখাতে যা সে দুর্বল নয়। সব সময় পেরে ওঠে না। কেটি আজ বুঝেছিল যে, তার ব্যবহারের বিরুদ্ধে সিসির মনের কোণে একটা মুখচোরা আপত্তি লুকিয়ে ছিল। তাই সে ঠিক করেছিল, যোগমায়ার সামনে সিসির এই সংকোচ কড়া করে ভাঙতে হবে। চৌকি থেকে উঠল, একটা সিগারেট নিয়ে সিসির মুখে বসিয়ে দিলে, নিজের ধরানো সিগারেট মুখে করেই সিসির সিগারেট ধরাবার জন্যে মুখ এগিয়ে নিয়ে এল। প্রত্যাখান করতে সিসি সাহস করলে না। কানের ডড়াটা একটুখানি লাল হয়ে উঠল। তবু জোর করে এমনি একটা ভাব দেখালে যেন তাদের হাল পাশ্চাত্যিকতায় যাদের ভ্রূ এতটুকু কুঞ্চিত হবে তাদের মুখর উপর ও তুড়ি মারতে প্রস’ত-ঃযধঃ সঁপয ভড়ৎ রঃ! ঠিক সেই সময়টাতে অমিত এসে উপসি’ত। মেয়েরা তো অবাক। হোটেল থেকে যখন সে বেরিয়ে এল মাথায় ছিল ফেল্ট হ্যাট, গায়ে ছিল বিলিতি কোর্তা। এখানে দেখা যাচ্ছে, পরনে তার ধুতি আর শাল। এই বেশান-রের আড্ডা ছিল তার সেই কুটিরে। সেখানে আছে একটি বইয়ের শেল্‌ফ, একটি কাপড়ের তোরঙ্গ, আর যোগমায়ার দেওয়া একটি আরাম-কেদারা। হোটেল থেকে মধ্যাহ্নভোজন সেরে এই খানে সে আশ্রয় নেয়। আজকাল লাবন্যর শাসন কড়া, সরমাকে পড়ানোর সময়ের মাঝখানটাতে জলপ্রপাত বা কমলালেবুর সন্ধানে কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। সেইজন্য বিকেলে সাড়ে চারটে বেলা চা-পান সভার পূর্বে এ বাড়িতে দৈহিক মানসিক কোনো প্রকার তৃষ্ণা নিবারণের সৌজন্য সম্মত সুযোগ অমিতর ছিল না। এই সময়টা কোনোমতে কাটিয়ে কাপড় ছেড়ে যথা নির্দিষ্ট সময়ে এখানে যে আসত। আজ হোটেল থেকে বেরোবার আগেই কোলকাতা থেকে এসেছে তার আংটি। কেমন করে সে সেই আংটি লাবন্যকে পরাবে তার সমস- অনুষ্ঠানটা সে বসে বসে কল্পনা করেছে। আজ হল ওর একটা বিশেষ দিন। এ দিনকে দেউড়িতে বসিয়ে রাখা চলবে না। আজ সব কাজ বন্ধ করা চাই। মনে মনে ঠিক করে রেখেছে লাবণ্য যেখানে পড়াচ্ছে সেইখানে গিয়ে বলবে, ‘একদিন হাতিতে চড়ে বাদশা এসেচিল, কিন’ তোরণ ছোটো, পাছে মাথা হেট করতে হয় তাই সে ফিরে গেছে, নতুন-তৈরি তুমি খাটো করে রেখেছ-সেটাকে ভাঙো, রাজা মাথা তুলেই তোমার ঘরে প্রবেশ করুন।’ অমিত এ কথাও মনে করে এসেছিল যে ওকে বলবে, ‘ঠিক সময়টাতে আসাকেই বলে পাঙ্কচুয়ালিটি; কিন’ ঘড়ির সময় ঠিক সময় নয়; ঘড়ি সময়ের নম্বর জানে, তার মুল্য জানবে কী করে?’ অমিত বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখলে, মেঘে আকাশটা ম্লান, আলোর চেহারাটা বেলা পাঁচটা ছটার মতো। অমিত ঘড়ি দেখলে না, পাছে ঘড়িটা তার অভদ্র ইশারায় আকাশের প্রতিবাদ করে যেমন বহুদিনের জ্বোরো রোগীর মা ছেলের গা একটু ঠান্ডা দেখে আর থার্মোমিটার মিলিয়ে দেখতে সাহস করে না। আজ অমিত এসেছিল নির্দিষ্ট সময়ের যথেষ্ট আগে। কারণ, দুরাশা নির্লজ্জ। বারান্দার যে কোনাটায় বসে লাবণ্য তার ছাত্রীকে পড়ায়, রাস-া দিয়ে আসতে সেটা চোখে পড়ে। আজ দেখলে সে জায়গাটা খালি। মন আনন্দে লাফিয়ে উঠল। এতক্ষণ পরে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলে। এখনো তিনটে বেজে বিশ মিনিট। সেদিন ও লাবণ্যকে বলেছিল, ‘ নিয়মপালনটা মানুষের, অনিয়মটা দেবতার; মর্তে আমরা নিয়মের সাধনা করি স্বর্গে অনিয়ম-অমৃতে অধিকার পাব বলেই। সেই স্বর্গে মাঝে মাঝে মর্তেই দেখা দেয়, তখন নিয়ম ভেঙে তাকে সেলাম করে নিতে হয়।’ আশা হল, লাবণ্য নিয়ম-ভাঙার গৌরব বুঝেছে বা; লাবণ্যর মনের মধ্যে হঠাৎ আজ বুঝি কেমন করে বিশেষ দিনের স্পর্শ লেগেছে, সাধারণ দিনের বেড়া গেছে ভেঙে। নিকটে এসে দেখে, যোগমায়া তাঁর ঘরের বাইরে স-ম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে, আর সিসি তার মুখের সিগারেট কেটির মুখের সিগারেট থেকে জ্বালিয়ে নিচ্ছে। অসম্মান যে ইচ্ছাকৃত তা বুঝতে বাকি রইল না। ট্যাবি-কুকুরটা তার প্রথম মৈত্রীর উচ্ছাসে বাধা পেয়ে কেটির পায়ের কাছে শুয়ে একটু নিদ্রার চেষ্টা করছিল। অমিতর আগমনে তাকে সম্বর্ধনা করবার জন্যে আবার অসংযত হয়ে উঠ। সিনি আবার তাকে শাসনের দ্বারা বুঝিয়ে দিলে যে এই সদভাবে প্রকাশের প্রণালীটা এখানে সমাদৃত হবে না। দুই সখীর প্রতি দৃকপাত মাত্র না করে ‘ মাসি’ বলে দুর থেকে ডেকেই অমিত যোগমায়ার পায়ের কাছে পড়ে তার পায়ের ধুলো নিলে। এ সময়ে এমন করে প্রণাম করা তার প্রথার মধ্যে ছিল না। জিজ্ঞাসা করলে, ‘ মাসিমা, লাবণ্য কোথায়?’ ‘ কী জানি বাছা, ‘ মাসিমা, লাবণ্য কোথায় আছে?’ ‘ এখনো তো তার পড়াবার সময় শেষ হয় নি।’ ‘ বোধ হয় এঁরা আসাতে ছুটি নিয়ে ঘরে গেছে।’ ‘ চলো, একবার দেখে আসি সে কী করছে।’ যোগমায়াকে নিয়ে অমিত ঘরে গেল। সম্মুখে যে আর কোনো সজীব পদার্থ আছে সেটা সম্পূর্ণই অস্বীকার করলে। সিসি একটু ঁেচচিয়ে বলে উঠল, ‘ অপমান! চলো কেটি, ঘরে যাই।’ কেটিও কম জ্বলে নি। কিন’ শেষ পর্যন- না দেখে সে যেতে চায় না। সিসি বললে, ‘কোনো ফল হবে না।’ কেটির বড়ো বড়ো চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠল; বললে, ‘হতেই হবে ফল।’ আরো খানিকটা সময় গেল। সিসি আবার বললে, ‘চলো ভাই, আর একটুও থাকতে ইচ্ছে করছে না।’ কেটি বারান্দায় ধন্না দিয়ে বসে রইল। বললে, ‘ এইখানে দিয়ে তাকে বোরোতেই তো হবে।’ অবশেষে বেরিয়ে এল অমিত, সঙ্গে নিয়ে এল লাবণ্যকে। লাবণ্যর মুখে একটি নির্লিপ্ত শানি- তাতে একটুও রাগ নেই, স্পর্ধা নেই, অভিমান নেই। যোগমায়া পিছনের ঘরেই ছিলেন, তাঁর বেরোবার ইচ্ছা ছিল না। অমিত তাঁকে ধরে নিয়ে এল এক মুহুর্তের মধ্যেই কেটির চোখে পড়ল, লাবণ্যর হাতে আংটি। মাথায় রক্ত চন্‌ করে উঠল, লাল হয়ে উঠল দুই চোখ, পৃথিবীটাকে লাথি মারতে ইচ্ছে করল। অমিত বললে, ‘ মাসি, এই আমার বোন শমিতা, বাবা বোধ হয় আমার নামের সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে নাম রেখিছিলেন কিন- রয়ে গেল অমিত্রাক্ষর। ইনি কেতকী, আমার বোনের বন্ধু।’ ইতিমধ্যে আর-এক উপদ্রব। সুরমার এক পোষা বিড়াল ঘর থেকে বেরিয়ে আসাতেই ট্যাবির কুক্কুরীয় নীতিতে সে এই স্পর্ধাটাকে যুদ্ধঘোষণার বৈধ কারণ বলেই গণ্য করলে। একবার অগ্রসর হয়ে তাকে ভৎসনা করে, আবার বিড়ালের উদ্যত নখর ও ফোঁসফোঁসানিতে যুদ্ধের আশু ফল সম্বন্ধে সংশয়াপন্ন হয়ে ফিরে আসে; এমন অবস’ায় কিঞ্চিৎ দূর হতেই অহিংস্র গর্জননীতিই নিরাপদ বীরত্ব প্রকাশের উপায় মনে করে অপরিমিত চীৎকার শুরু করে দিলে। বিড়ালটা তার কোনো প্রতিবাদ না করে পিঠ ফলিয়ে চলে গেল। এইবার কেটি সহ্য করতে পারলে না। প্রবল আক্রোশে কুকুরটাকে কান-মলা দিতে লাগল। এই কাল-মলার অনেকটা অংশই নিজের ভাগ্যের উদ্দেশে। কুকুরটা কেই কেই স্বরে অসদ্‌ব্যবহার সম্বন্ধে তীব্র অভিমত জানালে। ভাগ্য নিঃশব্দে হাসল। এই গোলমালটা একটু থামলে পর অমিত সিসিকে লক্ষ্য করে বললে, ‘সিসি, এরই নাম লাবণ্য। আমার কাছ থেকে এঁর নাম কখনো শোন নি, কিন’ বোধ হচ্ছে আর-দশজনের কাছ থেকে শুনেছে। এঁর সঙ্গে আমার বিবাহ সি’র হয়ে গেছে, কলকাতায়, অঘ্রান মাসে।’ কেটি মুখে হাসি টেনে আনতে দেরি করলে না। বললে,‘আই কন্‌গ্যাচুলেট। কমলালেবুর মধু পেতে বিশেষ বাধা হয় নি বলেই ঠেকছে; রাস-া কঠিন নয়, মধু লাফ দিয়ে আপনি এগিয়ে এসেছে মুখের কাছে’। সিসি তার স্বাভাবিক অভ্যাসমত হী হী করে হেসে উঠল। লাবণ্য বুঝলে, কথাটায় খোঁচা আছে, কিন’ মানেটা সম্পূর্ণ বুঝলে না। অমিত তাকে বললে, ‘আজ বেরোবার সময । এরা আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল‘কোথায় যাচ্ছ’। আমি বলেছিলুম ‘বন্য মধুর সন্ধানে’। তাই এরা হাসছে। ওটা আমারই দোষ; আমার কোন কথাটা যে হাসির নয় লোক সেটা ঠাওরাতে পারে না। কেটি শাস- স্বরেই বললে, ‘কমলালেবুর মধু নিয়ে তোমার তো জিত হল, এবার আমারও যাতে হার না হয় সেটা করো।’ ‘কী করতে হবে বলো’ ‘নরেনের সঙ্গে আমার একটা বাজি আছে। সে বলেছিল, জেন্টলম্যানরা যেখানে যায় কেউ সেখানে তোমাকে রেসে নিয়ে যাবই। এ দেশে যত ঝর্ণা, যত মধুর দোকান আছে, সব সন্ধান করে শেষকালে এখানে এসে তোমার দেখা পেলুম। বলো-না ভাই সিসি, কত ফিরতে হয়েছে বুনো হাঁস শিকারের চেষ্টায়, ইংরেজিতে যাকে বলে রিষফ মড়ড়ংব. সিসি কোনা কথা না বলে হাসতে লাগল। কেটি বললে,‘মনে পড়ছে সেই গল্পটা, একদিন তোমার কাছেই শুনেছি অমিট। কোন্‌ পার্সিয়ান ফিলজফার তার পাগড়িচোরের সন্ধান না পেয়ে শেষে গোরস’ানে এসে বসেছিল। বলেছিল পালাবে কোথায়? মিস্‌ লাবণ্য যখন বলেছিলেন ওকে চেনেন না, আমাকে ধোঁকা লাগিয়ে দিয়েছিল; কিন’ আমার মন বললে ঘুরে ফিরে ওকে ওর এই গোরস’ানে আসতেই হবে।’ সিসি উচ্চেস্বরে হেসে উঠল। কেটি লাবণ্যকে বললে,‘অমিট আপনার নাম মুখে আনলে না, মধুর ভাষাতে ঘুরিয়ে বললে কমলালেবুর মধু; আপনার বুদ্ধি খুবই বেশি সরল, ঘুরিয়ে বলবার কৌশল মুখে জোগায় না, ফস করে বলে ফেললেন অমিটকে জানেনই না। তবু সান্‌ডে স্কুলের বিধানমত ফল ফলল না, দন্ডদাতা আপনাদের কোনো দন্ডই দিলেন না, শক্ত পথের মধুও একজন এক চুমুকেই খেয়ে নিলেন, আর অজানাকে একজন এক দৃষ্টিতে জানলেন- এখন কেবল আমার ভাগ্যেই হার হবে? দেখো তো সিসি, কী অন্যায়। সিসির আমার সেই উচ্চহাসি।ট্যাবি কুকুরটা এই উচ্ছ্বাসে যোগ দেওয়া তার সামাজিক কর্তব্য মনে করে বিচলিত হবার লক্ষণ দেখালো। তৃতীয়বার তাকে দমন করা হল। কেটি বললে, অমিট তুমি জান, এই হীরের যদি হারি জগতে আমার সান-্বনা থাকবে না। এ আংকটি একদিন তুমিই দিয়েছিল। এক মূহূর্ত হাত থেকে খুলি নি, এ আমার দেহের সঙ্গে এক হয়ে গেছে। শেষকালে আজ এই শিলঙ পাহাড়ে কি একে বাজিতে খোওয়াতে হবে? সিসি বললে, বাজি রাখাত গেলে কেন ভাই। ‘মনে মনে নিজের উপর অহংকার ছিল, আর মানুষের উপর ছিল বিশ্বাস। অহংকার ভাঙল, এবারকার মতো আমার রেস ফুরোল, আমারই হার। মনে হচ্ছে অমিটকে আর রাজি করতে পারব না। ত, এমন অদ্ভূত করেই যদি হারাবে সেদিন এত আদরে আংকটি দিয়েছিলে কেন? সে দেওয়ার মধ্যে কি কোন বাঁধন ছিল না? এই দেওয়ার মধ্যে কি কথা ছিল না যে, আমার অপমান কোনোদিন তুমি ঘটাতে দেবে না?’ বলতে বলতে কেটির গলা ভার হয়ে এল, অনেক কষ্টে চোখের জল সামলে নিলে। আজ সাত বৎসর হয়ে গেল, কেটির বয়স তখন আঠারো। সেদিন এই আংটি অমিত নিজের আঙুল থেকে খুলে ওকে পরিয়ে দিয়েছিল। তখন ওরা দুজনেই ছিল ইংল্যান্ডে। আকসফোর্ডে একজন পাঞ্জাবি যুবক ছিল কেটির প্রণয়মুগ্ধ। সেদিন আপসে অমিত সেই পাঞ্জাবির সঙ্গে নদীতে বাচ খেলেছিল। অমিতরই হল জিত। জুন মাসের জ্যোৎস্নায় সমস- আকাশ যেন কথা বলে উঠেছিল, মাটে মাঠে ফুলের প্রচুর বৈচিত্রের ধরনী তার ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলেছে। সেই ক্ষনে অমিত কেটির হাতে আংটি পরিয়ে দিলে; তার মধ্যে অনেক কথাই উহ্য ছিল, কিন’ কোনো কথাই গোপন ছিল না। সেদিন কোটির মুখে প্রসাধনের প্রলেপ লাগে নি, তার হাসিটি সহজ ছিল, ভাবের আবেগে তার মুখ রক্তিম হতে বাধা পেত না। আংটি হাতে পরা হলে অমিত তার কানে বলেছিল- ঞবহফবৎ রং ঃযব হরমযঃ অহফ যধষঢ়ু ঃযব য়ঁববহ সড়ড়হ রং ড়হ যবৎ ঃযৎড়হব. কেটি তখন বেশি কথা বলতে শেখে নি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে কেবল যেন মনে মনে বলেছিল ‘মনআমী’, ফরাসি ভাষায়, যার নাম হচ্ছে ‘বধু’। কেটি বললে, বাজিতে যদিই হারলুম তবে আমার এই চিরদিনের হারের চিহ্ন তোমার কাছেই থাক্‌ অমিট। আমার হাতে রেখে একে আমি মিথ্যে কথা বলতে দেব না।’ ব’লে আংটি খুলে টেবিলটার উপরে রেখেই দ্রুতবেগে চলে গেল। এনামেল করা মুখের উপর দিয়ে দর দর করে চোখের জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। শেষের কবিতা – অধ্যায় ১৬ ১৬ মুক্তি একটি ছোটো চিঠি এল লাবণ্যের হাতে, শোভনলালের লেখা- শিলঙ কাল রাত্রে এসেছি। যদি দেখা করতে অনুমতি দাও তবে দেখতে যাব। না যদি দাও কালই ফিরব। তোমার কাছে শাসি- পেয়েছি, কিন’ কবে কী অপরাধ করেছি আজ পর্যন- স্পষ্ট করে বুঝতে পারি নি। আজ এসছি তোমার কাছে সেই কথাটি শোনবার জন্যে, নইলে মনে শানি- পাই নে। ভয় কোরো না। আমার আর-কোনো প্রার্থনা নেই। লাবণ্যর চোখে জলে ভরে এল। মুছে ফেললে; চুপ করে বসে ফিরে তাকিয়ে রইল নিজের অতীতের দিকে। যে অঙ্কুরটা বড়ো হয়ে উঠতে পারত, অথচ যেটাকে চেপে দিয়েছে, বাড়তে দেয় নি, তার সেই কচিবেলাকার করুণ ভীরুতা ওর মনে এল। এতদিনে সে ওর সমস- জীবনকে অধিকার করে তাকে সফল করতে পারত। কিন’ সেদিন ওর ছিল জ্ঞানের গর্ব, বিদ্যার একনিষ্ঠ সাধনা, উদ্ধত স্বতন্ত্র্যবোধ। সেদিন আপন বাপের মুগ্ধতা দেখে ভালোবাসাকে দুর্বলতা বলে মনে মনে ধিককার দিয়েছে। ভালোবাসা আজ তার শোধ নিলে, অভিমান হল ধুলিসাৎ। সেদিন যা সহজে হতে পারত নিশ্বাসের মতো, সরল হাসির মতো, আজ তা কঠিন হয়ে উঠল; সেদিনকার জীবনের সেই অতিথিকে দু হাত বাড়িয়ে গ্রহণ করতে আজ বাধা পড়ে, তাকে ত্যাগ করতে বুক ফেটে যায়। মনে পড়ল অপমানিত শোভনলালের সেই কুন্ঠিত ব্যথিত মুর্তি। তার পরে কতদিন গেছে, যুবকের সেই প্রত্যাখাত ভালোবাসা এতদিন কোন্‌ অমৃতে বেঁচে রইল? আপনারই আন-রিক মাহাত্ন্যে। লাবণ্য চিঠিতে লিখলে- তুমি আমার সকলের বড়ো বন্ধু। এ বন্ধুত্বের দাম দিতে পারি এমন ধন আজ আমার হাতে নেই। তুমি কোনোদিন দাম চাও নি; আজও তোমার যা দেবার জিনিস তাই দিতে এসেছ কিছুই দাবি না করে! চাই নে বলে ফিরিয়ে দিতে পারি এমন শক্তি নেই আমার, এমন অহংকারও নেই। চিঠিটা লিখে পাঠিয়ে দিয়েছে এমন সময় অমিত এসে বললে, ‘ বন্যা, চলো আজ দুজনে একবার বেড়িয়ে আসি গে।’ অমিত ভয়ে-ভয়েই বলেছিল; ভেবেছিল লাবণ্য আজ হয়তো যেতে রাজি হবে না। লাবণ্য সহজেই বললে, ‘ চলো।’ দুজনে বেরোল। অমিত কিছু দ্বিধার সঙ্গেই লাবণ্যর হাতটিকে হাতের মধ্যে নেবার চেষ্টা করলে। লাবণ্য একটুও বাধা না দিয়ে হাত ধরতে দিলে। অমিত হাতটি একটু জোরে চেপে ধরলে, তাতেই মনের কথা যেটুকু ব্যক্ত হয় তার বেশি কিছু মুখে এল না। চলতে চলতে সেদিনকার সেই জায়গাতে এল যেখানে বনের মধ্যে হঠাৎ একটুখানি ফাঁক। একটি তরুশূন্য পাহাড়ের শিখরের উপর সূর্য আপনার শেষ স্পর্শ ঠেকিয়ে নেমে গেল। অতি সুকুমার সবুজের আভা আসে- আসে- সুকোমল নীলে গেল মিলিয়ে। দুজনে থেমে সে দিকে মুখ করে দাড়িয়ে রইল। লাবণ্য আসে- আসে- বললে, ‘ একদিন একজনকে যে আংটি পরিয়েছিল, আমাকে দিয়ে আজ সে আংটি খোলালে কেন?’ অমিত ব্যথিত হয়ে বললে, ‘ তোমাকে সব কথা বোঝার কেমন করে বন্যা? সেদিন যাকে আংটি পরিয়েছিলুম আর যে আজ সেটা খুলে দিলে তারা দুজনে কি একই মানুষ? লাবণ্য বললে, ‘ তাদের মধ্যে একজন সৃষ্টিকর্তার আদরে তৈরি, আর-একজন তোমার অনাদরে গড়া।’ অমিত বললে, কথাটা সম্পূর্ণ ঠিক নয়। যে আঘাতে আজকের কেটি তৈরি, তার দায়িত্ব কেবল আমার একলার নয়।’ ‘ কিন’ মিতা, নিজেকে যে একদিন সম্পূর্ণ তোমার হাতে উৎসর্গ করেছিল তাকে তুমি আপনার করে রাখলে না কেন? যে কারণেই হোক, আগে তোমার মুঠো আলগা হয়েছে, তার পরে দশের মুঠোর চাপ পড়েছে ওর উপরে, ওর মুর্তি গেছে বদলে। তোমার মন একদিন হারিয়েছে বলেই দশের মনের মতো করে নিজেকে সাজাতে বসল। আজ তো দেখি ও বিলিতি দোকানের পুতুলের মতো; সেটা সম্ভব হত না যদি ওর হৃদয় বেঁচে থাকত। থাক গে ও সব কথা। তোমার কাছে আমার একটা প্রার্থনা আছে। রাখতে হবে।’ ‘বলো, নিশ্চয় রাখব।’ ‘ অন-ত হপ্তাখানকের জন্যে তোমার দলকে নিয়ে তুমি চেরাপুঞ্জিতে বেরিয়ে এসো। ওকে আনন্দ দিতে নাও যদি পারো, ওকে আমোদ দিতে পারবে।’ অমিত একটুখানি চুপ করে থেকে বললে, ‘ আচ্ছা।’ তার পরে লাবণ্য অমিতর বুকে মাথা রেখে বললে, একটা কথা তোমাকে বলি মিতা, আর কোনোদিন বলব না। তোমার সঙ্গে আমার যে সম্বন্ধ তা নিয়ে তোমার লেশমাত্র দায় নেই। আমি রাগ করে বলছি নে, আমার সমস- ভালোবাসা দিয়েই বলছি, আমাকে তুমি আংটি দিয়ো না, কোনো চিহ্ন রাখবার কিছু দরকার নেই। আমার প্রেম থাক্‌ নিরঞ্জন বাইরের রেখা, বাইরের ছায়া তাতে পড়বে না।, এই বলে নিজের আঙুলের থেকে আংটি খুলে অমিতর আঙুলে আসে- আসে- পরিয়ে দিলে। অমিত তাতে কোন বাধা দিলে না। সায়াহ্নের এই পৃথিবী যেমন অন-রশ্মি উদ্ভাসিত আকাশের দিকে নিঃশব্দে আপন মুখ তুলে ধরেছে, তেমনি নীরবে, তেমনি শান- দীপ্তিতে লাবণ্য আপন আপন মুখ তুলে ধরলে, অমিতর নত মুখের দিকে। সাত দিন যেতেই অমিত ফিরে যোগমায়ার সেই বাসায় গেল। ঘর বন্ধ, ক সবাই চলে গেছে। কোথায় গেছে তার কোনো ঠিকানা রেখে যায় নি। সেই য়ুক্যালিপটাস তলায় অমিত এসে দাড়ালম খানিকক্ষণ ধরে শূণ্যমনে সেইখানে ঘুরে বেড়ালে। পরিচিত মালী এসে সেলাম করে জিজ্ঞাসা করলে, ‘ ঘরে খুলে দেব কি? ভিতরে বসবেন?’ অমিত একটু দ্বিধা করে বললে, ‘ হ্যা।’ ভিতরে গিয়ে লাবণ্যর বসবার ঘরে গেল। চৌকি টেবিল শেলফ আছে, সেই বইগুলি নেই। মেজের উপর দুই একটা ছেঁড়া শুন্য লেফাফা, তার উপরে অজানা হাতের অক্ষরে লাবণ্যের নাম ও ঠিকানা লেখা; দু-চারটে ব্যবহার করা পরিত্যক্ত নিব এবং ক্ষয়প্রাপ্ত একটি অতি ছোটো পেনসিল টেবিলের উপরে। পেনসিলটি পকেটে নিলে। এর পাশেই শোবার ঘর। লোহার ঘাটে কেবল একটা গদি, আর আয়নার টেবিলে একটা শূন্য তেলের শিশি। দুই হাতে মাথা রেখে অমিত সেই গদির উপর শুয়ে পড়ল, লোহার খাটটা শব্দ করে উঠল। সেই ঘরটার মধ্যে বোবা একটা শূন্যতা। তাকে প্রশ্ন করলে কোনো কথাই বলতে পারে না। সে একটা মূর্ছা, যে মুর্ছা কোনোদিনই আর ভাঙবে না। তার পরে শরীরে মনের উপর একটা নিরুদ্যমের বোঝা বহন করে অমিত গেল নিজের কুটিরে যা যেমন রেখে গিয়েছিল তেমনিই সব আছে। এমন কি, যোগমায়া তাঁর কেদারাটিও ফিরিয়ে নিয়ে যান নি। বুঝলে, তিনি স্নেহ করেই এই চৌকিটি তাকে দিয়ে গেছেন; মনে হল যেন শুনতে পেলে শান- মধুর স্বরে তাঁর আহবান-‘বাছা!’ সেই চৌকির সামনে মাথা লুটিয়ে অমিত প্রণাম করলে। সমস- শিলঙ পাহাড়ের শ্রী আজ চলে গেছে। অমিত কোথাও আর সান-্বনা পেল না। শেষের কবিতা – অধ্যায় ১৭ ১৭ শেষের কবিতা কোলকাতার কলেজে পড়ে যতিশংকর। থাকে কলুটোলা প্রেসিডেনসি কলেজের মেসে। অমিত তাকে প্রায় বাড়িতে নিআয়ে আসে, খাওয়ায়, তার সঙ্গে না না বই পড়ে, না না অদ্ভুত কথায় তার মনটাকে চমকিয়ে দেয়, মোটরে করে তাকে বেড়িয়ে নিয়ে আসে। তার পর কিছুকাল যতিশংকর অমিতর কোনো নিশ্চিত খবর পায় না। কখনো শোনে সে নৈনিতালে, কখনো উটকামন্ডে। একদিন শুনলে, অমিতর এক বন্ধু ঠাট্টা করে বলছে, সে আজকাল কেটি মিত্তিরের বাইরেকার রঙটা ঘোচাতে উঠেপড়ে লেগেছে। কাজ পেয়েছে মনের মতো, বর্ণান-র করা। এতদিন অমিত মুর্তি গড়বার শখ মেটাত কথা দিয়, আজ পেয়েছে সজীব মানুষ। সে মানুষটিও একে একে আপন উপকার রঙিন পাপড়িগুলো খসাতে রাজি, চরমে ফল ধরবে আশা করে। অমিতর বোন লিসি নাকি বলছে যে, কেটিকে একেবারে চেনাই যায় না, অর্থাৎ তাকে নাকি বডডো বেশি স্বাভাবিক দেখাচ্ছে । বন্ধুদের সে বলে দিয়েছে তাকে কেতকী বলে ডাকতে এটা তার পক্ষে নির্লজ্জতা, যে মেয়ে একদা ফিনফিনে শানি-পুরে শাড়ি পরত সেই লজ্জাবতীর পক্ষে জামা শেমিজ পরারই মতো। অমিত তাকে নাকি নিভৃতে ডাকে কেয়া বলে। এ কথাও লোকে কানাকানি করছে যে, নৈনিতালের সরোবরে নৌকো ভাসিয়ে কেটি তার হাল ধরেছে, আর অমিত তাকে পড়ে শোনাচ্ছে রবি ঠাকুরের ‘ নিরুদ্দেশ যাত্রা’। কিন’, লোকে কী না বলে? যতিশংকর বুঝে নিলে, অমিতর মনটা পাল তুলে চলে গেছে ছুটিতত্ত্বের মাঝদরিয়ায়। অবশেষে অমিত ফিরে এল। শহরে রাষ্ট্র, কেতকীর সঙ্গে তার বিয়ে। অথচ অমিতর নিজে মুখে একদিন ও যতি এ প্রসঙ্গে শোনে নি। অমিতর ব্যবহারেও অনেকখানি বদল ঘটেছে। পূর্বের মতোই যতিকে অমিত ইংরেজী বই কিনে উপহার দেয়, কিন’ তাকে নিয়ে সন্ধেবেলায় সে সব বইয়ের আলোচনা করে না; যদি বুঝতে পারে আলোচনার ধারাটা এখন বইছে এক নতুন খাদে। আজকাল মোটরে বেড়াতে সে যতিকে ডাক পাড়ে না। যতির বয়সে এ কথা বোঝা কঠিন নয় যে, অমিতর ‘ নিরুদ্দেশ যাত্রার পার্টিতে তৃতীয় ব্যক্তির জায়গা হওয়া অসম্ভব। যতি আর থাকতে পারলে না। অমিতকে নিজেই গায়ে পড়ে জিজ্ঞাসা করলে, ‘ অমিতদা, শুনলুম মিস্‌ মিত্রের সঙ্গে তোমার বিয়ে।’ অমিত একটু খানি চুপ করে থেকে বললে, ‘ লাবণ্য কি এ খবর জেনেছে?’ ‘না, আমি তাকে লিখি নি। তোমার মুখে পাকা খবর পাই নি বলে চুপ করে আছি।’ খবরটা সত্যি, কিন’ লাবণ্য হয়তো বা ভুল বুঝবে।’ যতি হেসে বললে, ‘ এর মধ্যে ভুল বোঝবার জায়গা কোথায়? বিয়ে কর যদি তো বিয়েই করবে, সোজা কথা।’ ‘দেখো যতি, মানুষের কোনো কথাটাই সোজা নয়। আমরা ডিক্‌শনারিতে যে কথার এক মানে বেঁধে দিই মানব জীবনের মধ্যে মানেটা সাতখানা হয়ে যায় সমুদ্রের কাছে এসে গঙ্গার মতো।’ যতি বললে, ‘অর্থাৎ তুমি বলছ বিবাহ মানে বিবাহ নয়?’ ‘ আমি বলছি বিবাহের হাজারখানা মানে। মানুষের সঙ্গে মিশে তার মানে হয়, মানুষকে বাদ দিয়ে তার মানে বের করতে গেলইে ধাঁধা লাগে।’ ‘ তোমার বিশেষ মানেটাই বলো-না।’ ‘ সংজ্ঞা দিয়ে বলা যায় না, জীবন দিয়ে বলতে হয়। যদি বলি ওর মুল মানেটা ভালোবাসা তা হলেও আর একটা কথায় গিয়ে পড়ব; ভালোবাসা কথাটা বিবাহ কথার চেয়ে আরো বেশি জ্যান-।’ ‘ তা হলে, অমিতদা, কথা বন্ধ করতে হয়ে যে। কথা কাঁধে নিয়ে মানের পিছন পিছন ছুটব, আর মানেটা বাঁয়ে তাড়া করলে ডাইনে আর ডাইনে তাড়া করলে বাঁয়ে মারবে দৌড়, এমন হলে তো কাজ বুজে কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়।’ ‘ তবে কি আজকের কথাটাকে একেবারে খতম করতে হবে।’ ‘ এই আলোচনাটা যদি নিতান-ই জ্ঞানের গরজে হয়, প্রাণের গরজে না হয়, তা হলে খতম করতে দোষ নেই।’ ‘ ধরে নাও-না প্রাণের গরজেই।’ ‘ শাবাশ, তবে শোনো।’ এই খানে একটু পাদটীকা লাগলে দোষ নেই। অমিতর ছোটো বোন লিসির স্বহসে- ঢালা চা যতি আজকাল মাঝে মাঝে প্রায়ই পান করে আসছে। অনুমান করা যেতে পারে যে, সেই কারনেই ওর মনে কিছুমাত্র ক্ষোভ নেই যে, অমিত ওর সঙ্গে অপরাহ্নে সাহিত্যলোচনা এবং সায়াহ্নে মোটরে করে বেড়ানো বন্ধ করেছে। অমিতকে ও সর্বন-ঃকরণের ক্ষমা করেছে। অমিত বললে, ‘ অক্সিজেন এক ভাবে বয় হাওয়ায় অদৃশ্য থেকে, সে না হলে প্রাণ বাঁচে না, আবার অক্সিজেন আর-এক ভাবে কয়লার সঙ্গে যোগে জ্বলতে থাকে, সেই আগুন জীবনের নানা কাজে দরকার-দুটোর কোনোটাকেই বাদ দেওয়া চলে না। এখন বুঝতে পেরেছ?’ ‘ সম্পূর্ণ না, তবে কিনা বোঝা বার ইচ্ছে আছে।’ ‘ যে ভালোবাসা ব্যাপ্তভাবে আকাশে মুক্ত থাকে অন-রের মধ্যে সে দেয় সঙ্গ; যে ভালোবাসা বিশেষ ভাবে প্রতিদিনের সব-কিছুতে যুক্ত হয়ে থাকে সংসারে সে দেয় আসঙ্গ। দুটোই আমি চাই।’ ‘ তোমার কথা ঠিক বুঝছি কি না সেইটেই বুঝতে পারি নে। আর-একটু স্পষ্ট করে বলো অমিতদা।’ অমিত বললে, ‘ একদিন আমার সমস- ডানা মেলে পেয়েছিলুম আমার ওড়ার আকাশ; আজ আমি পেয়েছি আমার ছোট্টো বাসা, ডানা গুটিয়ে বসেছি। কিন’ আমার আকাশও রইল।’ ‘ কিন’ বিবাহে তোমার ঐ সঙ্গ-আসঙ্গ কি একত্রেই মিলতে পারে না?’ ‘ জীবনে অনেক সুযোগ ঘটতে পারে, কিন’ ঘটে না। যে মানুষ অর্ধেক রাজত্ব আর রাজকন্যা একসঙ্গেই মিলিয়ে পায় তার ভাগ্য ভালো; যে তা না পায়, দৈবক্রমে তার যদি ডান দিক থেকে মেলে রাজত্ব আর বাঁ দিকে থেকে মেলে রাজকন্যা, সেও বড়ো কম সৌভাগ্য নয়।’ ‘ কিন’-’ ‘ কিন’ তুমি যাকে মনে কর রোমানস্‌ সেইটেতে কমতি পড়ে! একটুও না। গল্পের বই থেকেই রোম্যানসের বাঁধা বরাদ্দ ছাঁচে ঢালাই করে জোগাতে হবে নাকি? কিছুতেই না। আমার রোমানস আমিই সৃষ্টি করব। আমার স্বর্গেও রয়ে ঘেল রোম্যানস, আমার মর্তেও ঘটাব রোম্যানস। যারা ওর একটাকে বাঁচাতে গিয়ে আর একটাকে দেউলে করে দেয় তাদেরই তুমি বল রোম্যান্টিক! তার হয় মাছের মতো জলে সাঁতার দেয়, নয় বেড়ালের মতো ডাঙায় বেড়ায়, নয় বাদুড়ের মতো আকাশে ফেরে। আমি রোম্যানসের পরমহংস। ভালোবাসার সত্যকে আমি একই শক্তিতে জলে স’লেও উপলব্ধি করব, আবার আকাশেও। নদীর চরে রইল আমার পাকা দখল, আবার মানসের দিকে যখন যাত্রা করব সেটা হবে আকাশের ফাঁকা রাস-ায়। জয় হোক আমার লাবণ্যর, জয় হোক আমার কেতকীর, আর সব দিক থেকেই ধন্য হোক অমিত রায়।’ যতি স-ব্ধ হয়ে বসে রইল, বোধ করি কথাটা তার ঠিক লাগনা। অমিত তার মুখ দেখেই ঈষৎ হেসে বললে, ‘ দেখো ভাই, সব কথা সকলের নয়। আমি যা বলছি হয়তো সেটা আমারই কথা। সেটাকে তোমার কথা বলে বুঝতে গেলেই ভুল বুঝবে, আমাকে গাল দিয়ে বসবে। একের কথার উপর আরের মানে চাপিয়েই পৃথিবীতে মারামারি খুনোখুনি হয়। এবার আমার নিজের কথাটা স্পষ্ট করেই না হয় তোমাকে বলি। রূপক দিয়েই বলতে হবে, নইলে এ-সব কথার রূপ চলে যায়, কথাগুলো লজ্জিত হয়ে ওঠে। কেতকীর সঙ্গে আমার সম্বন্ধ ভালোবাসারই; কিন’ সে যেন ঘড়ায় তোলা জল প্রতিদিন তুলব, প্রতিদিন ব্যবহার করব। আর লাবণ্যর সঙ্গে আমার ভালোবাসা সে রইল দিঘি; সে ঘরে আনবার নয়, আমার মন তাতে সাঁতার দেবে।’ যতি একটু কুন্ঠিত হয়ে বললে, ‘ কিন’ অমিতদা, দুটোর মধ্যে একটাকেই বেছে নিতে হয় না?’ ‘ যার হয় তারই হয়, আমার হয় না।’ ‘ কিন’ শ্রীমতী কেতকী যদি-’ ‘ তিনি সব জানেন। সম্পূর্ণ বোঝেন কি না বলতে পারি নে। কিন’ সমস- জীবন দিয়ে এইটেই তাঁকে বোঝাব যে, তাঁকে কোথাও ফাঁকি দিচ্ছে নে। এও তাঁকে বুঝতে হবে যে লাবণ্যর কাছে তিনি ঋণী।’ ‘ তা হোক, শ্রীমতী লাবণ্যকে তো তোমার বিয়ের খবর জানাতে হবে।’ ‘ নিশ্চয় জানাব। কিন’ তার আগে একটি চিঠি দিতে চাই, সেটি তুমি পৌছিয়ে দেবে?’ ‘ দেব।’ অমিতর এই চিঠি- সেদিন সন্ধেবেলায় রাস-ায় শেষে এসে যখন দাঁড়ালুম, কবিতা দিয়ে যাত্রা শেষ করেছি। আজও এসে থামলুম একটা রাস-ার শেষে। এই মুহুর্তটির উপর একটি কবিতা রেখে যেতে চাই। আর- কোনো কথার ভার সইবে না। হতভাগা নিবারণ চক্রবর্তীটা যেদিন ধরা পড়ছে সেদিন মরেছে, অতি শৌখিন জলচর মাছের মতো। তাই উপায় না দেখে তোমারই কবির উপর ভার দিলুম আমার শেষ কথাটা তোমাকে জানাবার জন্যে- তব অন-র্ধানপটে হেরি তব রূপ চিরন-ন, অন-রে অলক্ষ্যলোকে তোমার অনি-ম আগমন। লভিয়াছি চিরস্পর্শমণি, আমার শূন্যতা তুমি পূর্ণ করি গিয়েছ আপনি। জীবন আঁধার হলে সেইক্ষনে পাইনু সন্ধান সন্ধ্যার দেউলদীপ চিত্তের মন্দিরে তব দান। বিচ্ছেদের হোমবহ্নি হতে পূজামুর্তি ধরি প্রেম দেখা দিল দুঃখের আলোতে। –মিতা তার পরেও আরো কিছুকাল গেল। সেদিন কেতকী গেছে তার বোনের মেয়ের অন্নপ্রাশনে। অমিত গেল না। আরাম-কেদারায় বসে সামনে চৌকিতে পা-দুটো তুলে দিয়ে বিলিয়ম জেমসের পত্রাবলী পড়ছে। এমন সময় যতিশংকর লাবণ্যর লেখা এক চিঠি তার হাতে দিলে। চিঠির এক পাতে শোভনলালের সঙ্গে লাবণ্যর বিবাহের খবর। বিবাহ হবে ছ মাস পরে, জৈষ্ঠ্য মাসে, রামগড়পর্বতের শিখরে। অপর পাতে- কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও? তারি রথ নিত্যই উধাও জাগাইছে অন-রীক্ষে হৃদয়স্পন্দন- চক্রে পিষ্ট আঁধারের বক্ষ ফাটা তারার ক্রন্দন। ওগো বন্ধু, সেই ধাবমান কাল জড়ায়ে ধরিল মোরে ফেলি তার জাল- তুলে নিল দ্রুত রথে দুঃসাহসী ভ্রমনের পথে তোমা হতে বহু দূরে। মনে হয় অজস্র মৃত্যুরে পার হয়ে আসিলাম আজি নব প্রভাতের শিখরচুড়ায়; রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায় আমার পুরানো নাম। ফিরিবার পথ নাহি; দুর হতে যদি দেখ চাহি পারিবে না চিনিতে আমায়। হে বন্ধু বিদায়। কোনোদিন কর্মহীন পূর্ণ অবকাশে বসন-বাতাসে অতীতের তীর হতে যে রাত্রে বহিবে দীর্ঘশ্বাস, ঝরা বকুলের কান্না ব্যতিবে আকাশ, সেই ক্ষনে খুঁজে দেখো, কিছু মোর পিছে রহিল সে তোমার প্রাণের প্রানে-; বিস্মৃতি প্রদোষে হয়তো দিবে সে জ্যোতি, হয়তো ধরিবে কভু নামহারা স্বপ্নের মুরতি। তবু সে তো স্বপ্ন নয়, সব চেয়ে সত্য মোর, সেই মৃত্যুঞ্জয়- সে আমার প্রেম, তারে আমি রাখিয়া এলেম অপরিবর্তন অর্ঘ্য তোমার উদ্দেশ্যে। পরিবর্তনের স্রোতে আমি যাই ভেসে কালের যাত্রায়। হে বন্ধু, বিদায়। তোমার হয় নি কোনো ক্ষতি। মর্তের মৃত্তিকা মোর, তাই দিয়ে অমৃতমুরতি যদি সৃষ্টি করে থাক, তাহারি আরতি হোক তব সন্ধ্যাবেলা- পুজার সে খেলা ব্যাঘাত পাবে না মোর প্রত্যহের ম্লানস্পর্শ লেগে; তৃষার্ত আবেগবেগে ভ্রষ্ট নাহি হবে তার কোনো ফুল নৈবেদ্যের থালে। তোমার মানস ভোজে সযত্নে সাজালে যে ভাবরসের পাত্র বাণীর তৃষায় তার সাথে দিব না মিশায়ে যা মোর ধুলির ধন, যা মোর চক্ষের জলে ভিজে। আজও তুমি নিজে হয়তো বা করিবে রচন মোর স্মৃতিটুকু দিয়ে স্বপ্নবিষ্ট তোমার বচন। ভার তার না রহিবে, না রহিবে দায়। হে বন্ধু, বিদায়। মোর লাগি করিয়ো না শোক- আমার রয়েছে কর্ম, আমার রয়েছে বিশ্বলোক। মোর পাত্র রিক্ত হয় নাই, শূন্যের করিব পূর্ণ, এই ব্রত বহিব সদাই। উৎকন্ঠ আমার লাগি কেহ যদি প্রতীক্ষিয়া থাকে সেই ধন্য করিবে আমাকে। শুক্লপক্ষ হতে আনি রজনীগন্ধার বৃন-খানি যে পারে সাজাতে অর্ঘ্যথালা কৃষ্ণপক্ষ রাতে, যে আমারে দেখিবারে পায় অসীম ক্ষমায় ভালোমন্দ মিলায়ে সকলি, এবার পূজায় তারি আপনারে দিতে চাই বলি। তোমারে যা দিয়েছিনু তার পেয়েছে নিঃশেষ অধিকার। হেথা মোর তিলে তিলে দান, করুণ মুহুর্তগুলি গন্ডুষ ভরিয়া করে পান হৃদয় অঞ্জলি হতে মম। ওমো তুমি নিরুপম, হে ঐশ্বর্য্যবান, তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান; গ্রহন করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়। হে বন্ধু ২৫


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন